বাংলাদেশে বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে স্বকীয় সত্তা বজায় রেখে সহাবস্থানকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হচ্ছে মণিপুরি মুসলিম (পাঙাল)। মাতা মণিপুরি ও পিতা মুসলিমের সমন্বয়ে সৃষ্ট নতুন সম্প্রদায় হলো মণিপুরি মুসলিম।
অবস্থান
অধিকাংশ মণিপুরি মুসলিমের বসবাস মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায়। এর বাইরে অনেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও মৌলভীবাজার সদর ও শ্রীমঙ্গল উপজেলায় বসবাস করছেন।
পাঙালদের গ্রাম
মৌলভীবাজার: কমলগঞ্জ উপজেলায় মোকাবিল, রাতাবাড়ি, গোলেরহাওর, কালারায়বিল, নোয়াগাঁও, কানাইদেশী, কেওয়ালীঘাট, হকতিয়ারখোলা, পশ্চিম জালালপুর, পূর্ব জালালপুর, জালালপুর, কোনাগাঁও, নয়াপত্তন, তেতইগাঁও, আদমপুর বাজার, কান্দিগাঁও, ঘোড়ামারা, বন্দরগাঁও, নাজাতকোনা, তিলকপুর, দক্ষিণ তিলকপুর, হোমেরজান, রানীর বাজার, শুকুরউল্লারগাঁও, পুরানবাড়ি, পাত্রখোলা, ফুলতলী, জামিরকোনা, দক্ষিণ কুমড়াকাপন।
শ্রীমঙ্গল উপজেলায়—দিলবরনগর
মৌলভীবাজার সদর—সোনাপুর
সিলেট জেলা
খাদিমনগর উপজেলায়—খাদিমপাড়া
ছাতক উপজেলায়—বাঁশতোলা
জনসংখ্যা
বাংলাদেশ মণিপুরি মুসলিম ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (বামডো) ২০১৯ সালের জরিপ অনুযায়ী মণিপুরি মুসলিমদের মোট জনসংখ্যা ১০ হাজার ৯৪৭। এর মধ্যে পুরুষ ৫ হাজার ৬৩৮ ও নারী ৫ হাজার ৩০৯ জন। মোট পরিবার ১ হাজার ৯২১টি এবং গ্রাম ৩৩টি।
শিক্ষা
মণিপুরি মুসলিমদের শিশুদের স্কুল গমন প্রায় শতভাগ কিন্তু উচ্চশিক্ষার হার খুবই কম। আবার মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগের অভাব পাঙাল শিশুদের শিক্ষাগ্রহণে বাড়তি চাপের সৃষ্টি করে। পারিবারিক পরিসরে তারা মণিপুরি ভাষাতে লালিত-পালিত হয়। তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাংলা ভাষায় শিক্ষাগ্রহণ করতে গিয়ে অনেকেই মানসিক টানাপোড়েনের মুখোমুখি হয়।
২০১৯ সালের বামডোর শিক্ষার্থী জরিপে পাঙালদের উচ্চশিক্ষার যে চিত্র পাওয়া যায়—
মেডিকেল: ৩
বিশ্ববিদ্যালয়: ২৬২
কলেজ: ৮৪৬
ডিপ্লোমা: ৩৪
উচ্চবিদ্যালয়: ৮৮৩
প্রাথমিক বিদ্যালয়: ৯৬৫
অর্থাৎ উচ্চশিক্ষায় মোট ২ হাজার ৯৯৩ মণিপুরী মুসলিম শিক্ষার্থী ছিলেন।
পেশা
মণিপুরি মুসলিম নারীদের প্রধান পেশা বস্ত্র বুনন। পুরুষদের প্রধান পেশা কৃষিকাজ। আর পুরুষদের নিত্যসঙ্গী ছিল হুক্কা। Quazi
Hamid Ali তার Manipuri
Muslim গ্রন্থে উল্লেখ করেন, “The
people of Bengal used to smoke Tobacco with ‘Hukka’ as they were accustomed in
smoking Tobacco ‘Hukka’ they might introduce it in Manipur. In course of time
smoking Tobacco with ‘Hukka’ prevailed in Manipur.
বামডোর পেশাগত জরিপ ২০১৯
চাকরি: ৭৭২
প্রবাসী: ৩৭৭
কৃষি: ৮৫০
অন্যান্য: ৭০৪
মোট: ২ হাজার ৭০৩
মণিপুরি মুসলিমদের মধ্যে বর্তমান ক্যাডার সার্ভিসে কর্মরত আছেন—
স্বাস্থ্য: ১১; শিক্ষা: ২; পুলিশ: ২; প্রশাসন: ১; পররাষ্ট্র: ১
অর্থনৈতিক অবস্থা
মণিপুরি মুসলিম সমাজে খুব বেশি ধনাঢ্য ব্যক্তি যেমন নেই ঠিক তেমনি হতদরিদ্র লোকও নগণ্য। প্রায় সবাই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর। মণিপুরি মুসলিম সমাজে কোনো ভিক্ষুক নেই।
ধর্ম
মণিপুরি মুসলিম সম্প্রদায় সুন্নি ধর্মাবলম্বী।
ভাষা
মণিপুরি মুসলিমদের মাতৃভাষা মণিপুরি ভাষা। মণিপুরি ভাষার পাশাপাশি তারা বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষ।
সংস্থা
বর্তমানে বাংলাদেশের মণিপুরি মুসলিম সমাজে সক্রিয় সংস্থাগুলো নিম্নরূপ:
মিলন সংসদ (১৯৭৩), বাংলাদেশ মণিপুরি মুসলিম এডুকেশন ট্রাস্ট (১৯৮৫), মণিপুরি সমাজকল্যাণ পরিষদ (১৯৮৫), বাংলাদেশ মণিপুরি মুসলিম ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (১৯৯৮), মণিপুরি মুসলিম টিচার্স ফোরাম (২০১০), বাংলাদেশ মণিপুরি মুসলিম ছাত্রকল্যাণ পরিষদ (১৯৮৫), বাংলাদেশ মণিপুরি মুসলিম উইমেন্স প্রগ্রেস (২০১৮) ইত্যাদি।
তথ্যসূত্র
মণিপুরি মুসলিম, সাজ্জাদুল হক স্বপন, ২০২০
মো. খুরশেদ আলী: শিক্ষক ও সংগঠক





