সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে ভারতবর্ষে জাঁকিয়ে বসে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। নতুন আর সম্পদশালী জীবনের খোঁজে কিংবা লোভে কোম্পানির অনেক কর্মকর্তা ভারতে হাজির হতে থাকেন। স্বভাবতই নতুন দেশ, তার ভূমি, উদ্ভিদ, প্রাণী, মানুষ, প্রাচীন সব স্থাপনা, ভিন্ন সংস্কৃতি তাদের অনেকের মধ্যে কৌতূহলের জন্ম দিয়েছিল। অনেকের মাঝে ছিল গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধিৎসা। তাই তারা এসবের চিত্রধারণ করতে চেয়েছেন, নিজের সংগ্রহের কিংবা কখনো কখনো বিলেতে পরিবার-বন্ধুদের কাছে পাঠানোর জন্য। এখন যেমনটা করেন পর্যটকরা। নতুন কোথাও ভ্রমণে গেলে সেখানকার ছবি তোলাটা কেউই মিস করতে চান না। আধুনিক যুগে পর্যটকদের ভরসা ক্যামেরায়। আর সে যুগে কোম্পানির কর্মকর্তারা বেছে নিয়েছিলেন দেশীয় চিত্রকরদের। এ ভারতীয় শিল্পীরা ইউরোপীয় শৈলী ও প্যালেটে যেসব চিত্রকর্ম তৈরি করেছিলেন, সেগুলোকে সাধারণভাবে ‘কোম্পানি পেইন্টিং’ নামে আখ্যা দেয়া হয়। এসব চিত্রকর্মের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল জলরঙ ব্যবহার। এসব চিত্রকর্মে ছিল রৈখিক প্রেক্ষিত এবং শেডের ব্যবহার। নন্দনতাত্ত্বিকভাবে এগুলো ছিল ব্রিটিশ ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টার থমাস ও উইলিয়াম ড্যানিয়েলের আঁকা ওরিয়েন্টাল চিত্রকর্মের উত্তরাধিকার।

তত্কালীন ভারতবর্ষের বিভিন্ন শহরে বিকশিত হয়েছিল কোম্পানি পেইন্টিংয়ের বিভিন্ন স্টাইল। প্রত্যেক শহরের তৈরি চিত্রকর্মগুলো তাদের স্বতন্ত্র স্টাইলের কারণে চিহ্নিত করা যেত। এসব স্টাইল আবার স্থানীয় ঐতিহ্য দিয়ে গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল।

কোম্পানি আর্টের অন্যতম কেন্দ্র ছিল কলকাতা। এখানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সবচেয়ে পুরনো ট্রেড হাউজও ছিল। ১৭৭৭ থেকে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন লর্ড ইম্পে। তিনি ছিলেন শহরের সবচেয়ে উৎসাহী শিল্প পৃষ্ঠপোষক। আরো একজন ছিলেন গভর্নর-জেনারেল মার্কুয়েজ ওয়েলেসলি। তিনি দায়িত্বে ছিলেন ১৭৯৮ থেকে ১৮০৫ সাল। তাদের দুজনেরই ছিল পশু-পাখির বিরাট সংগ্রহ। তারা ভারতীয় শিল্পীদের নিয়োগ করেন তাদের সংগ্রহের প্রতিটি পশু-পাখির চিত্রকর্ম তৈরির জন্য।


কিছু সময়ের জন্য চিত্রকর্ম থেকে ঘুরে আসা যাক কলকাতার কাছে হুগলি নদীর তীরে হাওড়ার শিবপুরে স্থাপিত এক সময়কার রয়্যাল বোটানিক গার্ডেন থেকে। ১৭৮৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ উদ্ভিদ সংরক্ষাণাগার প্রতিষ্ঠা করে। শুরুতে এটি স্থাপনের উদ্দেশ্য ছিল পুরোপুরি বাণিজ্যিক। এটি যার হাতে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তিনি কর্নেল রবার্ট কিড। বোটানিক গার্ডেন প্রতিষ্ঠার জন্য যে অর্থ প্রয়োজন তার জন্য যখন কর্নেল রবার্ট কোম্পানির কাছে আবেদন করেন, তখন তিনি এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিষয়টি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন—

‘আমি বোর্ডকে একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দিচ্ছি নিছক কৌতূহল মেটাতে দুর্লভ গাছপালা সংগ্রহ কিংবা বিলাসিতার জন্য নয়। বরং ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন গাছপালাকে এক জায়গায় জড়ো করাটা স্থানীয় (ভারতীয়) ও গ্রেট ব্রিটেনের অধিবাসীদের জন্য উপকারী হবে। শেষমেশ এর মাধ্যমে ব্রিটেনের জাতীয় বাণিজ্য ও সম্পদ বৃদ্ধি পাবে। জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত শিল্পকে সহায়তা করতে এ নতুন বাগানে সেগুনের প্লানটেশন করা যেতে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য হবে দূর প্রান্তের বিভিন্ন উদ্ভিদকে পরিচয় করিয়ে দেয়া এবং উদ্ভিদগুলোকে নতুন আবহাওয়ায় অভিযোজিত করা। এরপর ভারতজুড়ে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোয় গাছগুলোকে ছড়িয়ে দেয়া হবে।’

কোম্পানির এসব ফায়দা ছাড়াও বোটানিক গার্ডেন স্থাপনের জন্য কর্নেল রবার্ট কিড শক্ত মানবিক যুক্তিও তুলে ধরেন। তিনি যুক্তি দেন এ উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন শস্যজাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে দুর্ভিক্ষ, মহামারীজনিত বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা যাবে।

১৭৯৩ সালে গার্ডেনের দায়িত্ব নেন উদ্ভিদবিদ উইলিয়াম রোক্সবার্গ। তিনি গার্ডেনের মূলনীতিতে পরিবর্তন আনেন। বাণিজ্যিক লক্ষ্যের পরিবর্তে তিনি গুরুত্ব দেন গবেষণাকে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উদ্ভিদ সংগ্রহ করে সমৃদ্ধ হার্বেরিয়াম তৈরি করা হয়।

রয়্যাল বোটানিক গার্ডেন কর্তৃপক্ষ তাদের সংগ্রহের সব গাছপালার চিত্র আঁকতে নিয়োগ করেছিল ভারতীয় শিল্পীদের। এ চিত্রকর্মগুলো ছিল কলকাতা স্কুলের।

কোম্পানি পেইন্টিংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল বারনসী। হিন্দুদের অন্যতম তীর্থকেন্দ্র। বেনারস নামে পরিচিত এ শহরে বহু পর্যটকেরও আবির্ভাব ঘটে। ১৭৯৮ থেকে ১৮০৪ সময়কালে লর্ড ও লেডি ক্লাইভ এখানে অবস্থান করেছেন। ১৮০৩ সালে ব্রিটিশরা শহরের নিয়ন্ত্রণ নিলে দিল্লির বাজারও সম্প্রসারিত হয়। শহরের অনবদ্য মোগল স্থাপত্যগুলো ছিল শিল্পীদের জনপ্রিয় বিষয়। এখানকার শিল্পীরা একটি অনন্য কাজ করেছিলেন, তারা হাতির দাঁতকে ব্যবহার করেছিলেন ক্যানভাস হিসেবে। এছাড়া অন্যান্য সাধারণ বিষয়গুলো ছিল—চাকর, নগরের বাসিন্দা, ক্যারিজ, ঘোড়া। লেডি ইম্পে এমন অনেক চিত্রকর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন।


পাটনা ছিল কোম্পানি আর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কারণ এখানে ছিল কোম্পানির একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টরি ও প্রাদেশিক কমিটির দপ্তর। এখানকার বিখ্যাত আঁকিয়ে ছিলেন সেবক রাম ও গুলাম আলী খানের পরিবারের বেশ কয়েক জন সদস্য। ১৭৯০-এর দশকে কাজের খোঁজে পাটনায় হাজির হন সেবক রাম। ভারতীয় বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানের ছবি আঁকতেন তিনি। ১৮২০-এর দশক নাগাদ তার অনেক ছবি সংগ্রহ করেন লর্ড মিন্টো, লর্ড আর্মহার্স্ট—এরা দুজনই ছিলেন গভর্নর জেনারেল।

দুই ভাই উইলিয়াম ও জেমস ফ্রেজারকে কোম্পানি উত্তর ভারতে পাঠিয়েছিল ১৮১৫-১৬ সালে। তারা দিল্লি থেকে কয়েক জন শিল্পীকে নিয়ে গিয়েছিলেন। এখানেই সম্ভবত গুলাম আলী খানের সঙ্গে তাদের পরিচয়। তিনি গ্রামীণ সমাজের ছবি আঁকার জন্য বিখ্যাত। তার পরিবারের অন্য শিল্পীরা ছিলেন মূলত প্রতিকৃতি আঁকিয়ে। ১৮৪০-এর দশকে ভারতে হাজির হয় ক্যামেরা এবং স্বাভাবিকভাবেই ভাটা পড়ে যায় কোম্পানি পেইন্টিংয়ে।

কোম্পানি স্টাইল, কোম্পানি আর্ট কিংবা কোম্পানি পেইন্টিংস—যে পরিচয়েই শনাক্ত করা হোক না কেন, তার গুরুত্বটা কোথায়? ভারতীয় আর্ট কিউরেটর শিল্পা শাহের মতে, রাজা-রানীদের সাজসজ্জা কিংবা দরবারের চেহারা দেখতে আমাদের কাছে মিনিয়েচার চিত্রকর্ম আছে। কিন্তু ২০০ বছর আগে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা কেমন ছিল, সেটা দেখতে হলে আমরা কোথায় যাব? এজন্য আমাদের প্রয়োজন কোম্পানি পেইন্টিংস! ফটোগ্রাফির আগে ব্রিটিশদের (ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির) পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি চিত্রকর্মগুলোই ভারতের অতীতের নির্ভরযোগ্য এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী উপস্থাপক।

সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবন, পেশা নিয়ে আগ্রহ ছিল ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের। তাই তৈরি হয়েছে মুর্শিদাবাদের এক পানশালা, কুচের ভোজ কিংবা পাটনায় এক অভিজাতের নাচ দেখার মতো কৌতূহলোদ্দীপক চিত্রকর্ম।


সেকালে অনেক পেশার (যেগুলো পরবর্তীকালে হারিয়ে গেছে) মানুষের প্রতিকৃতি পাওয়া যায় কোম্পানি চিত্রকর্মে। আবার কোম্পানি আমলে সৃষ্টি হওয়া নতুন পেশাগুলোর খোঁজ মেলে এসব ছবিতে। আছে কলকাতার কোচম্যান, পানিবাহক; লক্ষেৗয়ের সিপাহি, অন্ধ্র উপকূলের বাহারি ডিজাইনের কাপড় ব্যবসায়ী কিংবা মাদ্রাজের পাংখাওয়ালা।

ভারতীয় সংস্কৃতি, ধর্মীয় বা প্রথাগত উৎসব নিয়ে ইংরেজদের গভীর আগ্রহ ছিল। এ কারণে কোম্পানির শিল্প পৃষ্ঠপোষকদের কাছে ভারতীয় উৎসবের চিত্রকর্মের চাহিদা ছিল। এক্ষেত্রে তানজোরের এক মন্দিরের শোভাযাত্রা ও ত্রিচিনোপোলিতে মহররমের মিছিলের চিত্রকর্ম উল্লেখযোগ্য।

চিত্রকর্মের পাশাপাশি ব্রিটিশরা মাটির তৈরি ভাস্কর্যও তৈরি করাতেন। বিষয়বস্তু ছিল চিত্রকর্মের মতোই। এখানে শুধু মাটির তৈরি ত্রিমাত্রিক ফিগার। মুম্বাইয়ের কাছে পুনেতে এমন মাটির পুতুল তৈরির বড় কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। এগুলো ব্রিটিশদের কাছে জনপ্রিয় স্যুভেনির ছিল।

ফটোগ্রাফির আবির্ভাব এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতন ভারতে কোম্পানি স্টাইলেরও সমাপ্তি টানে। এক্ষেত্রে অজ্ঞাত শিল্পীর শিল্পকর্মের যুগেরও সমাপ্তি ঘটে। এ কারণে কোম্পানি স্টাইলে অনেক শিল্পকর্মই তৈরি হতো চাহিদার ভিত্তিতে বিভিন্ন ওয়ার্কশপে। সেখানে শিল্পীর পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

 

এসএম রশিদ: লেখক