মার্গারেট মেকপিস

অনুবাদ: হাসান তানভীর

মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের জন্য উপহার বহনকারী জাহাজটি ১৬১৩ সালে ইংল্যান্ড থেকে যাত্রা করেছিল। আমরা আপনাকে যে ‘নববর্ষের উপহার’ দিচ্ছি তা কাগজ ও ফিতা দিয়ে মোড়ানো নয়। এটি একটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজ, যা ১৬১৩ সালে ইংল্যান্ড থেকে সুরাট ও বান্টামের উদ্দেশে হেক্টর, হোপ ও সলোমনের সঙ্গে যাত্রা করেছিল। যাই হোক, বহরটি এশিয়ার শাসকদের জন্য অনেক উপহার বহন করছিল, যেন তারা ব্যবসায়ের সুযোগ-সুবিধা প্রদানের জন্য উৎসাহিত হন।

মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের জন্য প্রদত্ত উপহারগুলোর মধ্যে ছিল রৌপ্য দ্বারা সজ্জিত একটি লাল রঙের পোশাক, মখমলের কাপড়ে আবৃত গরম পানির বোতলের একটি বাক্স এবং কয়েকটি ছবি। ছবিগুলো ছিল রাজা জেমস, তাঁর স্ত্রী রানী অ্যানি, তৈমুর লং, স্বয়ং সম্রাট, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর স্যার টমাস স্মিথ ও তিনজন ইংরেজ নারীর।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দীর্ঘ ভ্রমণের কারণে পেইন্টিংগুলোতে কী প্রভাব পড়ে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। কারণ এগুলোর রঙ বিবর্ণ হয়ে যেতে পারত বা অন্য কোনো ক্ষতি হতে পারত। তারা শিল্পকর্মগুলো সংরক্ষণ ও মেরামতের জন্য বিস্তারিত নির্দেশনা সরবরাহ করেছিল। নববর্ষের উপহারের পেইন্টার এডওয়ার্ড গলকে মেরামতকরণ এবং ফ্রেম তৈরির প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।

জাহাজ বহরটি এশিয়ায় চশমাও নিয়ে যাচ্ছিল। কোম্পানি আশঙ্কা করেছিল যে এগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই রবার্ট ইয়ংকে এগুলো রক্ষা করার প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো হয়েছিল। ইয়ং তার চার বা পাঁচজন সহকর্মীকে এ কৌশল শিখিয়ে দিয়েছিলেন যেন তিনি মারা গেলে তারা মেরামত করতে পারে।

সমুদ্রযাত্রায় মৃত্যু

রবার্ট ইয়ং ১৬১৪ সালের নভেম্বরে ভারতে মারা যান। এডওয়ার্ড গলও মারা গিয়েছিলেন এবং লন্ডনে তাঁর স্ত্রী ইলিয়েনরকে সবকিছু দিয়ে যাওয়ার উইল আদালতে প্রমাণিত হয়েছিল। ন্যাশনাল আর্কাইভে অনেক উইল রয়েছে যেগুলো ১৬১৩-১৬১৬ সালের মধ্যে মারা যাওয়া সমুদ্র অভিযাত্রীদের উইল বলে ক্যানটারবেরির বিশেষায়িত আাাদালতে প্রমাণিত হয়েছে।

যারা ‘নববর্ষের উপহার’ বহনকারী জাহাজে মারা গিয়েছিল তাদের অনেকেই এশিয়ায় প্রাপ্ত জিনিসপত্র উইল করে গিয়েছিল। যেমন চীনা কোমরবন্ধনী, চীনামাটির বাসন, সিল্কের কাপড়, মরিচ, জয়ত্রি ও জায়ফলের মতো মসলা। কোয়ার্টার গানার উইলিয়াম ক্র্যান্ডল মারা যাওয়ার সময় ১৫৯ পাউন্ড মরিচ নিয়ে আসছিলেন। নাবিক অ্যান্থনি ওয়েনের কাছে ছিল ১০০ পাউন্ড জয়ত্রি।

পোশাক ও বিছানাপত্রের মতো ব্যক্তিগত জিনিসগুলো প্রায়ই ক্রুদের কাউকে দিয়ে যাওয়া হতো। অন্যথায় এগুলো মাস্তুলের সামনে রেখে বিক্রি করে দেয়া হতো এবং তার অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করা হতো। প্রকৌশলী ক্রিস্টোফার টারপিন তার একটি গাউন, একটি ডোরাকাটা চাদর এবং যন্ত্রপাতি তার সঙ্গী রিচার্ড ডিকসনের কাছে রেখে গিয়েছিলেন। এ কাপড়টি সম্ভবত একটি স্যুটের অবশিষ্টাংশ ছিল, যা টারপিন রিচার্ড ব্র্যাবসনের হাতে দিয়েছিলেন। টারপিনের কাছে আরো তিনটি নকশা করা কোট এবং একটি লেসযুক্ত স্যুট ছিল।

কখনো কখনো অসুস্থতার সময় যত্ন নেয়ার জন্য কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সহকর্মী নাবিকদের জন্য উইল করা হতো। জাহাজের সহকর্মীদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হয়ে যেত, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমুদ্রযাত্রার আগে থেকেই বন্ধুত্ব থাকত। উইলিয়াম ক্র্যান্ডল তার কাছের বন্ধু ক্যাপ্টেন মার্টিন প্রিংকে বলে গিয়েছিলেন যেন সে ক্র্যান্ডলের মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য ২০ পাউন্ড ব্যয় করে। ক্যাপ্টেনের সঙ্গী লরেন্স স্পুনার ৩০ পিস সাটিন কাপড় বিক্রি করার জন্য বলেছিলেন এবং প্রাপ্ত অর্থ প্রিংয়ের পাঁচ সন্তানের সুবিধার জন্য ব্যয় করতে বলেছিলেন। স্পুনার তার তরবাবি, ইউক্লিডস এলিমেন্টস (বই), পোশাক এবং লিনেন প্রিংকে দিয়ে গিয়েছিলেন। প্রিংয়ের স্ত্রী জোয়ান চীনামাটির বাসন এবং একটি কোট এবং তার মা একটি রিংয়ের জন্য ২০ শিলিং পেয়েছিলেন।

লরেন্স স্পুনার তামওয়ার্থে তার স্ত্রী ও কন্যার কবর পুনর্নির্মাণ করতে অর্থ বরাদ্দ করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন তার স্ত্রীর স্মৃতিস্তম্ভের ওপরে তার একটি প্রতিমূর্তি তৈরি করতে, যার হাতে একটি বাটি বা চামচ থাকবে এবং লাতিন অক্ষরে শিলালিপি থাকবে—‘পথিক আপনি যেই হোন, পড়ুন এবং কাঁদুন।’

 

মার্গারেট মেকপিস: লিড কিউরেটর, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রেকর্ডস