খান জাহান আলীর বাগেরহাট আর বাগেরহাটের খান জাহান আলী— এ দুটো কথা একই সূত্রে গাঁথা। তিনি ছিলেন বাগেরহাটের স্রষ্টা-শিল্পী, বাগেরহাটের প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে তাঁর পুণ্যস্মৃতি। যশোর-খুলনায় তিনি খাঞ্জেলি নামেই সুপরিচিত।
এ দুই জেলার গ্রামে-প্রান্তরে ছড়িয়ে আছে, খাঞ্জেলির দীঘি, পুকুর, রাস্তাঘাট, খাঞ্জেলির প্রাসাদ, অস্ত্রাগার, সরাইখানা ইত্যাদির ধ্বংসাবশেষ। জনশ্রুতি আছে, তিনি সেকালে এ এলাকার লবণাক্তের পরিবর্তে সুপেয় পানির বন্দোবস্ত করার জন্য ৩৬০টি দীঘি-পুকুর খনন করিয়েছিলেন। আর নির্মাণ করেছিলেন ৩৬০টি মসজিদ। জনবসতিহীন সুন্দর ধনাকঃ বসতি স্থাপনকারীদের নিকট আকর্ষণীয় করার জন্য তিনি অনাবাদি জমিতে লুকিয়ে রাখতেন স্বর্ণ-রৌপ্য, যাতে নতুন বসতি স্থাপনকারীরা জমি আবাদকালে ওই লুকানো সম্পদ পেয়ে বসতি স্থাপন করতে আগ্রহী হয়।
কিন্তু দুর্ভাগ্য যে মানবপ্রেমিক খান জাহান আলীর পরিচয় আজো তিমিরাচ্ছন্ন। তাঁর পরিচয় নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদের অন্ত নেই। বিভিন্ন মত থেকে এখানে দুজন পণ্ডিতের মত উদ্ধৃত করা হলো। খ্যাতনামা ঐতিহাসিক ডক্টর আবদুল করিম এমএ পিএইচডি সাহেব বলেন, খান জাহান আলী ছিলেন গৌড়ের সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের (১৪৩৬-১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দ) কর্মচারী। সুলতান তাঁকে সুন্দর বন এলাকার শাসকরূপে নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি বরাবর বঙ্গদেশে ছিলেন, দিল্লি থেকে আগত নন। বাংলার ইতিহাসের ২০০ বছর স্বাধীন সুলতানি আমলের লেখক ঐতিহাসিক সুখময় মুখার্জিও এই মত সমর্থন করেন। আর সুন্দরবনের ইতিহাসের লেখক এএফএম আবদুল জলিল এমএবিএল বলেন, ‘তিনি ছিলেন দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের তুর্কি উলুখ বংশীয় মন্ত্রী খান জাহান মকবুলের পৌত্র।’
ফিরোজ শাহ তুঘলক তাঁর এ প্রিয় মন্ত্রীকে বংশানুক্রমিক খান জাহান উপাধি প্রদান করেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর তত্পুত্র জুনা শাহ খান জাহান উপাধি গ্রহণ করে মন্ত্রীরূপে পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। এ দ্বিতীয় খান জাহান স্বীয় প্রতিভা বলে রাজ্যের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন, এ সময় দিল্লির সিংহাসন নিয়ে তুঘলক পরিবারে শুরু হয় দ্বন্দ্ব, রাজধানীতে শুরু হয় বিদ্রোহ, অরাজকতা। ১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দে এক ষড়যন্ত্রের দায়ে দ্বিতীয় খান জাহানকে প্রাণদণ্ড দেয়া হয়। রাজধানীর অরাজকতার সুযোগে তাঁর পুত্র দুপুরুষের সজ্জিত ধনরত্ন ও বহু সংখ্যক অনুগত সৈন্য নিয়ে বঙ্গদেশে আগমন করেন। তখন তিনি নিজেকে পারিবারিক উপাধি উলুখ খান জাহান নামে পরিচিত করেন। তাঁর সমাধির শিলালিপিতে এ নাম উত্কীর্ণ থাকলেও তিনি খান জাহান আলী নামে বাংলাদেশে সুপরিচিত। তিনি গৌড়ের সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের (১৪৩৬-১৪৫৯ খ্রি.) আনুগত্য স্বীকার ও তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন এবং সুন্দরবন এলাকার শাসনকর্তারূপে স্বীকৃতি লাভ করেন। খানজাহান আলীর বাবা আকস্মিকভাবে নিহত হওয়ায়, তিনি সংসারের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়েছিলেন। সম্ভবত তাই তিনি ধর্ম প্রচার ও মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করার উদ্দেশ্যেই জনবসতি বিরল অনুন্নত সুন্দরবন এলাকাকে তাঁর কর্মক্ষেত্র রূপে বেছে নিয়েছিলেন। বিপুল সংখ্যক সৈন্যসেনা ও ১১ জন দরবেশসহ তিনি সুন্দরবন অঞ্চলের যে স্থানটিতে প্রথম আগমন করেন, সেটি পরবর্তীকালে বারবাজার নামে খ্যাত হয়, বর্তমান যশোর শহরের ১১ মাইল উত্তর-পশ্চিমে এ স্থানটি অবস্থিত। এ বারবাজার ছিল খ্রিস্টীয় পূর্ববঙ্গের শৌর্য-বীর্যশালী গঙ্গা রিডি রাজ্যের রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ।
তিনি এখানে বহু দীঘি, পুকুর ও মসজিদ নির্মাণ করেন। বিপুল সংখ্যক স্থানীয় লোককে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেন, অতঃপর তিনি এখান থেকে মুরলী গমন করেন এবং এর নতুন নাম করেন মুরলী কসবা; তাঁর দুজন শিষ্য বাহরাম শাহ ও গরীব শাহকে এখানে রেখে তিনি তাঁর সেনাদলকে দুই দলে বিভক্ত করেন। প্রথম দল কপোতাক্ষ নদীর তীর ধরে খানপুর, কেশবপুর, বিদ্যানন্দ কাটি, মাগুরা গুণা, ডাঙান লতা, বারো, তালা, কপিলমুণী, সরল, আবাদীও মসজিদ কুড়ে প্রভৃতি এলাকা হয়ে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে বেদকালী পর্যন্ত গমন করেন। এই যাত্রার সময় তার সিপাহি লস্করেরা রাস্তা এবং রাস্তার পাশে দীঘি-পুকুর খনন ও মসজিদ নির্মাণ করে বিদ্যানন্দকাটির সুবৃহত্ দীঘিটি দৈর্ঘ্যে ৮০০ গজ, প্রস্থে ৩৫০ গজ ওই অভিযাত্রী বাহিনী খনন করেছিল। এখানে একটি শাসককেন্দ্রও স্থাপন করা হয়েছিল। সুন্দরবনের অভ্যন্তরের বেদকাণীর পানীয়জলের অভাব দূরীকরণার্থে একটি প্রকাণ্ড দীঘি খনন করে, যার পানি সুন্দরবনের বাসিন্দারা আজো পান করে থাকে।
দ্বিতীয় দল খান জাহান আলীর নেতৃত্বে মুরলী কসবা থেকে পয়গ্রাম কসবা যায়। এখানে যশোরের গোবিন্দ লাল রায় নামক একজন ব্রাহ্মণ খান জাহান আলীর নিকট ইসলাম গ্রহণ করে তাঁর শিষ্য হন। তাঁর ইসলামী নাম হয় মোহাম্মদ তাহের। কিন্তু তার স্ত্রী-পুত্র হিন্দু থেকে যায়। হিন্দুরা তাকে ঠাট্টা করে পীর অলি বলত। এই সময় থেকে যশোর-খুলনার ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী হিন্দুরা পীরালি মুসলমান নামে খ্যাত হন। আর তাদের হিন্দু আত্মীয়স্বজনরা পীরালি হিন্দু নামে আখ্যায়িত হন। তত্কালীন হিন্দু সমাজে একঘরে হয়ে যায়। মোহাম্মদ তাহের পীরালি খানজাহান আলীর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। এবং তাঁর দক্ষিণ হস্তরূপে শাসনকার্যে সহায়তা করতেন। খান জাহান আলী পয়গ্রাম কসবা সুন্দরবন এলাকাকে সাময়িক রাজধানী করে তথাকার শাসনভার মোহাম্মদ তাহের পীরালির হস্তে ন্যস্ত করেন। অতঃপর তিনি বাণুচর পূর্বদিকে যাত্রা করেন। চলতি পথে রাস্তা নির্মাণ, দীঘি-পুকুর খনন ও মসজিদ নির্মাণ করে অগ্রসর হতে থাকেন। ভৈরব নদী পার হয়ে বাসুরী গ্রামে ৭২ বিঘা পরিমিত জমির একটি দীঘি খনন করান। অতঃপর বাগেরহাট এলাকায় পৌঁছান।
তিনি এখানে সর্বপ্রথম যে দীঘিটি খনন করান, তাঁর নাম ঘোড়া দীঘি। এর দৈর্ঘ্য ৫০০ গজ, প্রস্থ ৩০০ গজ। প্রকাশ যে, খান জাহান আলীর ঘোড়া এক দৌড়ে যদ্দুর গিয়েছিল, তদ্দুর দীর্ঘ করে এ দীঘি পূর্ব-পশ্চিম লম্বা। এ দীঘির পানি আজো সুপেয়/বাগের হাট শহরের পানীয়জল এ দীঘি থেকে সরবরাহ করা হয়। খান জাহান আলী যখন বাগের হাট এলাকায় আগমন করেন, তখন এ এলাকা ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। তিনি এ স্থানে আবাদ করে বসতি স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেন। ভৈরব নদীর তীরে খান জাহান আলী আপন প্রাসাদ নির্মাণ করান। এর দেয়ালের উচ্চতা ছিল ১৬ ফুট, চওড়া ১০ ফুট। বিরাট ছিল অস্ত্রাগার কোতোয়ালি ও একটি ছোট মসজিদ ও নারীদের ব্যবহারের পুকুর। ওই এলাকার চারদিকে সুগভীর গড় দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। ভৈরব নদে ছিল পাকা ঘাট। নদের তীরে ছিল বিরাট আকারের পাকা তোরণ। এখন আর কিছু অবশিষ্ট নেই। সব ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
প্রস্তরহীন সুন্দরবন এলাকায় ঘোড়া দীঘির পূর্বপাড়ে প্রস্তর নির্মিত ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মাণ করাই হলো খান জাহান আলীর জীবনের শ্রেষ্ঠতম কীর্তি। এ প্রস্তর আনয়ন করা হয়েছিল চট্টগ্রাম ও রাজমহল থেকে। ষাটগম্বুজ মসজিদ দৈর্ঘ্যে ১৬০ ফুট, প্রস্থে ১০৮ ফুট। এর অভ্যন্তরে গম্বুজের উচ্চতা ২২ ফুট। এ সুবিশাল ভবনের সামনের দিকের মধ্যস্থলে একটি সুবৃহত্ খিলানের দু’পাশে পাঁচটি করে ছোট ছোট ১০টি খিলান আছে। দেয়াল প্রস্থে ৯ ফুট। গম্বুজের অভ্যন্তরের ও বাইরের দিকে ত্রিভুজাকার অংশে পোড়া মাটির লতাপাতার কারুকার্যে সজ্জিত। দেয়ালে পদ্ম ফুলের কাজও দেখা যায়। মধ্যে মধ্যে মিনা করা টালির ব্যবহার করা হয়েছে। সারা বাংলাদেশের মধ্যে এটিই সর্ববৃহত্ মসজিদ। ৬০টি প্রস্তর নির্মিত স্তম্ভের ওপর প্রতি সারিতে সাতটি করে ১১ সারিতে মোট ৭৭টি গম্বুজে ভবনটি আচ্ছাদিত, তন্মধ্যে ৭০টি গম্বুজের উপরিভাগ গোলাকার। মধ্যের সারির সাতটি গম্বুজের উপরিভাগ চৌকানো বিশিষ্ট, গ্রামবাংলার ছনের ছাউনি চৌচালা ঘরের আকৃতিতে নির্মিত। ষাটগম্বুজ মসজিদের পূর্বদিকে আছে ২৫টি দরজা আর পশ্চিম দিকে আছে ছোট একখানা বিশেষ দরজা; এটা মসজিদ ও খানজাহান আলীর দরবার গৃহরূপে ব্যবহার করা হতো। নামাজ বা দরবারের সময় ষাটগম্বুজ লোকে পরিপূর্ণ হয়ে গেলে পশ্চিম দিকের ছোট দরজা দিয়ে তিনি ও পাত্রমিত্ররা এখানে প্রবেশ করতেন। এর চার কোণে চারটি উঁচু মিনার আছে। পূর্ব পাশের মিনার দুটিতে ষাটগম্বুজের ছাদে ওঠার দুখানি ঘুরানো সিঁড়ি আছে। একটি আঁধার কোটা, অন্যটি রওসন কোটা নামে খ্যাত হয়। এটাকে ষাটগম্বুজ বলা হলেও মিনারের গম্বুজ চারটিসহ এর মোট গম্বুজ সংখ্যা ৮১টি। এর গম্বুজগুলো ৬০টি স্তম্ভের ওপর স্থাপিত বলে সম্ভবত এর নাম ষাটগম্বুজ হয়ে থাকবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন যে, ষাটগম্বুজ মসজিদ তুঘলকীয় ও গৌড়ীয় স্থাপত্য শিল্প রীতির সংমিশ্রণে নির্মিত। ঊনবিংশ শতকে ষাটগম্বুজ এলাকা বনজঙ্গলে আবৃত হয়ে গিয়েছিল। এর ছাদও আগাছা-লতাপাতায় আবৃত ছিল। ১৯০৪ ইংরেজিতে সরকারি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ষাটগম্বুজ মসজিদের সংরক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন ওই এলাকা পরিষ্কার ও এর আগাগোড়া মেরামত করা হয়। তাই কালের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে খান জাহান আলীর ষাটগম্বুজ সাড়ে ৫০০ বছর ধরে অটুট অবস্থায় রয়েছে। বাগের হাট শহরের চার মাইল দূরে ষাটগম্বুজ অবস্থিত।
খান জাহান আলী বাগেরহাটে নানা সৌধাবলি নির্মাণের পর এর নামকরণ করেন খলিফাতে আবাদ বা প্রতিনিধির শহর। সেকালে সাত মাইলব্যাপী এলাকা নিয়ে এ শহর প্রতিষ্ঠিত ছিল। খলিফাতাবাদ ছিল খান জাহান আলী শাসিত সুন্দরবন সুবায় রাজধানী। তিনি এখানে তাঁর জীবনের শেষ ৪০ বছর অতিবাহিত করেন। তিনি মৃত্যুর ১০ বছর আগে বাগেরহাটের ঘাডেলের দীঘিটি খনন করান। এ দীঘি দৈর্ঘ্য-প্রস্থে সমান সাড়ে ৫০০ গজ। এ দীঘির চারপাড়ে ৬০ ফুট দীর্ঘ ২৮ ধাপবিশিষ্ট চারখানা ঘাট ছিল। এর উত্তর পাড়ে খানজাহান আলীর শেষ নিবাস সমাধি ভবন অবস্থিত। এ দরগাহ ভবন এক গম্বুজবিশিষ্ট। এর ভিত্তি প্রস্তরে নির্মিত। অভ্যন্তরে গম্বুজটির উচ্চতা ২৪ ফুট, ভেতরে লতাপাতার কারুকার্য খচিত দরবারের প্রবেশপথে একটি বিরাট তোরণ আছে। খান জাহান আলীর দুজন পত্নী ছিলেন। কিন্তু তিনি নিঃসন্তান ছিলেন, ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২৩ অক্টোবর তিনি পরলোকগমন করেন। তাঁর দরগায় প্রতি বছর চৈত্রের পূর্ণিমায় খাতেলি মেলা নামে তিনদিন স্থায়ী একটি বিরাট জাঁকজমকপূর্ণ মেলা বসে। আর ২৫ অগ্রহায়ণ তারিখে তাঁর মৃত্যু দিবস উপলক্ষে মিলাদ, কোরআনখানি প্রভৃতি ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়। প্রতি মাসে পূর্ণিমার দিন ছোট মেলা উত্সব অনুষ্ঠিত হয়। তাছাড়া যশোর-খুলনার নানা স্থানে তার স্মৃতিতে বহু বাঙেলী মেলা বসে থাকে। ২৩ অক্টোবর মানবপ্রেমিক খান জাহান আলীর মৃত্যুর ৫১৫তম বছর পূর্ণ হয়।
(১৯/১১/১৯৭৪ তারিখে চট্টগ্রাম বেতারে একটি কথিকা প্রচার হয়েছিল। বর্তমান প্রবন্ধটি তারই পরিবর্ধিত রূপ)






