প্রত্ননিদর্শন প্রাপ্তির আলোকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল বাগেরহাট। বাগেরহাট প্রধানত পনেরো শতকের সাধক সেনাপতি খান জাহান আলীর স্মৃতিবিজড়িত। পনেরো শতকের মাঝপর্বে এই মহান সেনাপতি সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদের সময় (১৪৪২-১৪৫৯ খ্রি.) খুলনা-যশোহর অঞ্চলে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার মহান ব্রত নিয়ে আগমন করেন। তাঁর অবস্থান ও প্রশাসনের মুখ্য অঞ্চল হিসেবে বেছে নেন আজকের বাগেরহাটকে। মুদ্রা ও লিপি প্রমাণে সুলতানি যুগে খান জাহান আলীর বিস্তৃত শাসন অঞ্চল তখন ‘খলিফাতাবাদ’ নামে পরিচিত। বাগেরহাট জেলায় খলিফাতাবাদ টাঁকশালের অবস্থান ছিল। খান জাহান আলী তাঁর প্রধান প্রশাসনিক অঞ্চল বাগেরহাটে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মসজিদ নির্মাণ করেন এবং পুকুর ও দীঘি খনন করেন। তবে বাগেরহাটের ঐতিহাসিক গুরুত্ব মধ্যযুগের এ পর্ব থেকেই যে সূচিত হযেছে, তা বলা যাবে না। বৃহত্তর খুলনা-যশোহর অঞ্চলে মানববসতির প্রাচীন ধারা গবেষকরা চিহ্নিত করতে পেরেছেন।
প্রত্ননিদর্শনের ভিত্তিতে বলা যায়, যশোহর-খুলনা অঞ্চলে প্রাচীনকালে সমৃদ্ধ জনপদের অস্তিত্ব ছিল। ১৮৮২ সাল পর্যন্ত খুলনা ও বাগেরহাট ছিল যশোহরের অন্তর্গত। ভারতের চব্বিশ পরগনা জেলার চন্দ্রকেতুগড় ও হরিনারায়ণপুর প্রত্নস্থল থেকে এ অঞ্চল খুব দূরে নয়। এদিকে আমরা যদি বাগেরহাটে খান জাহান আলীর স্মৃতিবিজড়িত মসজিদ, স্থাপনা এবং পুকুর ও দীঘিগুলোর দিকে যদি তাকাই, তবে এ বিষয়টি নিশ্চিত হবে যে, কোনো নির্জন বা পরিত্যক্ত ভূমিতে খান জাহান আলী তাঁর প্রশাসন কেন্দ্র গড়ে তোলেননি। মধ্যযুগে, বিশেষ করে সুলতানি পর্বে নির্মাণসামগ্রী অপ্রতুল ছিল। তাই মসজিদ নির্মাণকে দেয়া হয়েছিল অগ্রাধিকার। স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা যায়, মুসলিম সমাজের স্মারক ছিল মসজিদ। খান জাহান আলী এবং তাঁর অনুগামীদের জন্য হলে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে এত বেশি সংখ্যক মসজিদ নির্মাণের প্রয়োজন হতো না। স্বাভাবিকভাবেই অনুমান করা চলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এ সময় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। তাছাড়া স্থানীয় মানুষদের কল্যাণ চিন্তায়ই বিপুল সংখ্যক পুকুর খনন করা হয়েছিল। খান জাহান আলী শুধু একজন বিজয়ী সেনাপতিই ছিলেন না, তিনি একজন সাধকও ছিলেন। সুলতানি বাংলার সুফি তত্পরতা ও জনজীবনে সুফি প্রভাব সম্পর্কিত ইতিহাস থেকে জানা যায়, সুফিরা জনকল্যাণমুখী কাজে নিজেদের যুক্ত রাখতেন। সমুদ্র সন্নিকটে হওয়ায় বাগেরহাট অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট থাকা স্বাভাবিক। তাই খান জাহান আলী সে যুগের সুফি ও প্রশাসকের দায়িত্ব বিবেচনাতেই নিজের সৈন্যসামন্ত ও অনুগামী ছাড়াও স্থানীয় মানুষের কল্যাণ সাধনে প্রচুর জলাধার খনন করান।
সাংস্কৃতিক গুরুত্ব আমলে নিয়ে ১৯৮৫ সালের দিকে ইউনেস্কো বাগেরহাট প্রত্ন অঞ্চলকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এতে বাগেরহাটের ঐতিহ্যিক গুরুত্ব জাতীয় পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত হয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বাগেরহাটের প্রত্ননিদর্শনগুলো বিশেষ তাত্পর্য বহন করছে। বাগেরহাটে সংরক্ষিত স্থাপনার মধ্যে মসজিদ ও সমাধিই প্রধান। এসব নিদর্শন থেকে মুসলিম-পূর্ব যুগ সম্পর্কে খুব বেশি ধারণা নেয়া সম্ভব নয়। মধ্যযুগের প্রথম পর্ব অর্থাত্ স্বাধীন সুলতানি যুগের আঞ্চলিক ইতিহাস নির্মাণই শুধু নয়, বরং বাগেরহাট অঞ্চলের স্থাপত্যগুলো তার শৈলী বিচারে সুলতানি যুগ পর্বেরই প্রতিনিধিত্ব করছে। একজন প্রশাসক ও নির্মাতা হিসেবে খান জাহান আলীর অবস্থান বিশ্লেষণের জন্য এ স্থাপত্যগুলোর বিশ্লেষণ ও ঐতিহ্যিক গুরুত্ব নিরূপণ বেশ কার্যকর বলে প্রমাণিত।
স্থাপত্যকলার বিবেচনায় খান জাহানের সময়ে গড়া ইমারতগুলোর বিশেষত্ব রয়েছে। এর মূল ধারণায় দিল্লির তুঘলক স্থাপত্যের প্রভাব থাকলেও সম্পূর্ণ নির্মাণশৈলীতে একটি স্বতন্ত্র রীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। যে কারণে অধ্যাপক দানী শৈলী বিবেচনায় বাগেরহাটের মধ্যযুগের ইমারতগুলোকে ‘খানজাহানী রীতি’ বলে উল্লেখ করেছেন। বাংলার সুলতানি ইমারতের সাধারণ বৈশিষ্ট্য যেমন এখানে পাওয়া যায়, পাশাপাশি একটি নিজস্ব ঘরানারও বিকাশ ঘটতে দেখা যায়। এ কারণে বাগেরহাটের স্থাপত্য মূল্যায়ন করতে গেলে সুলতানি বাংলার স্থাপত্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্যের পরিচয় উপস্থাপন করতে হয়। এ যুগের ইমারত সাধারণত ইটে তৈরি। দেয়াল গড়া হয় দেড় থেকে চার মিটার পর্যন্ত পুরু করে। স্তম্ভ বা দেয়ালের প্লিন্থে কখনো কখনো পাথর বসানো হয়। কখনো কখনো ভেতরের খিলান বসানো হয় পাথরের স্তম্ভের ওপর। বহির্দেয়ালের চার কোণে থাকে চারটি বুরুজ। এগুলোর বেশির ভাগই অষ্টভুজাকৃতির হয়ে থাকে। বুরুজগুলো ছাদের সমান্তরালে গিয়ে শেষ হয়। এক বুরুজ থেকে অন্য বুরুজ পর্যন্ত টানা ছাদ ধনুকের মতো বাঁকা। গম্বুজগুলো একেবারেই স্থানীয় অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। অনেকটা উল্টানো পাত্রের মতো এবং নিরাভরণ। গম্বুজের বেশির ভাগই ত্রিকোণী পেন্ডেন্টিভের ওপর এবং কখনো কখনো স্কুইঞ্চের ওপর বসানো।
ষাটগম্বুজের মতো বড় বড় ইমারতের অভ্যন্তরভাগে দ্বিকেন্দ্রিক সূচাগ্র খিলান বহনের জন্য পাথরের স্তম্ভ সারিবদ্ধভাবে বসানো হয়েছে। ফলে ভেতরটা খোলামেলা রাখা সম্ভব হয়। ইমারতের ভেতরে ও বাইরে আলঙ্কারিক বন্ধনী ও পোড়ামাটির অলঙ্করণ থাকে। মসজিদগুলোয় পূর্বদিকের প্রবেশপথ বরাবর পশ্চিমে সমসংখ্যক মিহরাব থাকে। খিলানাকৃতির মিহরাবে আয়তাকার ফ্রেম করে তা কারুকার্যমণ্ডিত করা হয়। এসব রীতির অনেকটাই ধারণ করেছে বাগেরহাটের ইমারতগুলো। আবার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যও যুক্ত হয়েছে। যেমন— খান জাহানি রীতির কর্নার টাওয়ার বা কোণের বুরুজ অষ্টভুজাকৃতি না হয়ে হয় গোলাকৃতি। অনুমান করা যায়, কুঁড়েঘরে বাঁশের খুঁটি ব্যবহারের ধারণার মিশ্রণ আছে এই গোলাকার বুরুজ ব্যবহারে। বাঁশের খুঁটিতে যেমন কিছু পর পর গাঁট থাকে, এসব বুরুজেও সমান বিরতিতে রয়েছে ব্যান্ড। চৌচালা আকৃতির গম্বুজও বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদে দেখা যায়। বিস্তারিতভাবে না হলেও সীমিতভাবে পোড়ামাটির অলঙ্করণ দেখা যায় এ অঞ্চলের প্রত্ন ইমারতে। অলঙ্করণে শিকলঘণ্টা, জাফরি, গোলাপ, পদ্ম ইত্যাদি সাধারণ মোটিফের পাশাপাশি স্থানীয় উদ্ভিদের উপস্থাপনও বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। কোথাও দেখা গেছে মেঝেতে রঙিন মোজাইকের ব্যবহার।
বাগেরহাটের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য নিদর্শনের বর্তমান অবস্থা ও সংস্কার সংরক্ষণের সাধারণ চিত্র বিশ্লেষণ করতে গেলে মসজিদের কথা উঠে আসে সবার আগে। তবে বর্তমানে টিকে থাকা মসজিদের অধিকাংশই সরকারি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পুনর্নির্মাণ করেছে। এসব নির্মাণে স্থাপত্যগুলো সুলতানি স্থাপত্যের একটি আদল পেয়েছে ঠিকই, তবে অনেক ক্ষেত্রে স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ না করায় এবং ঐতিহাসিকতাকে গুরুত্ব না দেয়ায় একদিকে যেমন তা সঠিকভাবে ইতিহাসকে উপস্থাপন করতে পারছে না, অন্যদিকে সংস্কার সংরক্ষণ কাজ সহজ করার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ অলঙ্করণশৈলীর বিলুপ্তি ঘটানো হয়েছে। কোথাও কোথাও সংস্কার দুর্বলতার কারণে ইমারত হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। সুখের কথা, সরকারি পদক্ষেপে ষাটগম্বুজ মসজিদের বিকৃত রূপ আদি অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য একটি প্রকল্পের আওতায় এখন সংস্কার-সংরক্ষণের কাজ চলছে। হয়তো সম্পূর্ণ ক্ষতির পুনরানয়ন সম্ভব নয়। তবুও মন্দের ভালো, কিছু হবে। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
নির্মাতা ও প্রশাসক খান জাহান আলীকে পরিচয় করিয়ে দিতে গেলে প্রত্ন-ঐতিহ্য হিসেবে সবার আগে যে স্থাপনার নাম আসে তা হচ্ছে— ষাটগম্বুজ মসজিদ। বাগেরহাটের খান জাহানী ইমারতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গৌরবের এবং তাত্পর্যপূর্ণ ইমারত ষাটগম্বুজ মসজিদ। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ইতিহাস অস্বীকার করে এবং সংরক্ষণ আইনকে গুরুত্বে না এনে এর সংস্কার করা হয়েছে। বেশি ইতিহাস বিকৃত হয়েছে মসজিদের অভ্যন্তরে। বালি-সিমেন্টের পুরু আস্তরণ দিয়ে চুনকামে উজ্জ্বল করা হয়েছে অভ্যন্তর দেয়াল ও পাথরের স্তম্ভগুলো। এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই অপসৃত হয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মূল্যবান পোড়ামাটির অলঙ্করণ। নকশা কাটা পাথরের স্তম্ভগুলো সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে গেছে বালি-সিমেন্টের প্লাস্টারে। কর্তৃপক্ষ অদ্ভুত এক ঔদার্যে দর্শনার্থীদের জন্য ভেতরে একটি সাইনবোর্ড রেখেছে। জানানো হয়েছে, আপাত ইটের স্তম্ভ মনে হলেও তারা যেন নিজগুণে মেনে নেন এগুলো আসলে পাথরের। বহির্দেয়ালের সংস্কার নিয়ম মেনে করা হয়েছে বলে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে মনে হয়। তবে গভীর পর্যবেক্ষণে মননশীল দর্শনার্থী ও গবেষকের হতাশ হওয়ার কারণ আছে।
২০০১-০২ অর্থবছরে সংস্কারের আগেও পূর্বদিকের কেন্দ্রীয় প্রবেশ দরজার খিলানের ওপর ত্রিকোণাকৃতি চমত্কার পেডিমেন্ট ছিল। স্থাপত্য ও স্থাপত্যিক অলঙ্করণের ক্ষেত্রে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বাংলার নিজস্ব ঘরানার পরিচায়ক চালা আকৃতির ছাদের ধারণার একটি তাত্পর্যপূর্ণ সমর্থন ছিল এ পেডিমেন্টে। একই সঙ্গে গ্রিক স্থাপত্যশৈলীর প্রভাবের কথাও ভাবা যায়। ষাটের দশকে অধ্যাপক দানীর করা মন্তব্য থেকে আমরা এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারি। তিনি লিখেছেন, ‘...on the eastern side over the central arched doorway, which is larger than others, is peculiarly seen a triangular pediment, from which the cornice bands slope down towards the corner towers. The pediment is a unique decoration, and may have been derived from the gable ends of the Do-Chala hut roof of Bengal.’ ইতিহাসকে অস্বীকার করে কী কারণে এ পেডিমেন্ট অপসারণ করতে হলো, তা আমাদের বোধগম্য নয়। সংস্কারে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কতটুকু গ্রহণ করা হয়েছিল, তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়; তবে আমরা বাস্তব পর্যবেক্ষণে বিস্মিত হয়েছি এই দেখে যে, অল্প সময়ের ব্যবধানে পশ্চিম দেয়ালের বাইরের দিকটি শেওলাক্রান্ত হয়ে পড়েছে এবং উত্তরের বহির্দেয়ালের অনেকটা নোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উত্খনন রিপোর্ট প্রকাশের আগে কী করে এবং কিসের ভিত্তিতে বর্তমান আকারের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ হলো, তাও আমাদের বোধগম্য নয়। উত্তর-পূর্বদিকের সীমানাপ্রাচীরের সঙ্গে আধুনিক দেয়াল যুক্ত করে মূল স্থাপত্যিক ভারসাম্য ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। এ বিষয়টিও নজরে আসা প্রয়োজন ছিল।
এদিকে বাগেরহাটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থাপনা সিঙ্গাইর মসজিদ। বাইরে থেকে দাঁড়ালে মসজিদটির গাঠনিক অবস্থা ভালো বলে মনে হয়। কিন্তু ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলে এবং মসজিদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে মনে হবে বহুকাল ধরে মসজিদটি সংস্কারে হাত দেয়া হয়নি। ভেতরের দেয়াল, স্কুইঞ্চ ক্ষতিগ্রস্ত, উত্তর দেয়ালে সৃষ্টি হয়েছে ফাটল, মুসল্লিদের অভিযোগ ছাদ চুইয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। অভিযোগের সমর্থনে দেখা যায় কেন্দ্রীয় মিহরাবসহ পশ্চিম দেয়ালে ঘন শেওলা জমে আছে। পশ্চিমের বহির্দেয়ালও নোনায় আক্রান্ত। এর বাইরে সোনাতলা মৌজায় অবস্থিত অ-উন্মোচিত বারো আজিনা প্রত্নস্থলটি বাস্তব পর্যবেক্ষণকালে আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। সুপারি ও কাঁঠালবাগানের ভেতরে জনবসতিহীন অনুচ্চ একটি ঢিবি না জানা ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঢিবিটি উত্তর-দক্ষিণে আনুমানিক ১৮০ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১১০ ফুট। ঢিবির মাঝ বরাবর পূর্ব-পশ্চিমে মানুষ পায়ে চলা পথ তৈরি করে নিয়েছে। দীর্ঘদিন পথ চলায় প্রায় ৬০ ফুট জায়গা সমতল হয়ে গেছে। এ কারণে পাশাপাশি দুটো ঢিবি বলে ভুল হয়। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই সমতল অংশেও মাটির নিচে অসংখ্য ইট অন্তরীণ রয়েছে। ঢিবিজুড়ে পাথরের স্তম্ভের খণ্ডাংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। চারদিকে ইটের কাঠামোর আভাসও স্পষ্ট। এখনো প্রত্নস্থলটির রহস্য উন্মোচন হয়নি বলে জনশ্রুতি এবং অবৈজ্ঞানিক অনুমান জায়গা করে নিচ্ছে। যেমন— কখনো বলা হচ্ছে ‘ত্রিশ গম্বুজ বড় আজিনা মসজিদ’, কখনো অনুমান করা হচ্ছে খান জাহানের জীবিতাবস্থায় নির্মিত একটি মুসাফিরখানা।
খান জাহান আলীর মাজার ইমারতটি মোটামুটি ভালো অবস্থায় টিকে আছে। তবে ছাদের কার্নিশ সংস্কার করা প্রয়োজন। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, মাজারের বহির্দেয়ালে ও ফটকে চোখ পীড়াদায়ক মেটে লাল রঙের ব্যবহার, যা সুলতানি যুগের মূল সুরকে ব্যাহত করছে। তবে মাজারসংলগ্ন মসজিদও এর ঐতিহ্যিক গুরুত্ব বিচারে বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে। এখানে সংস্কার সংরক্ষণ করতে গিয়ে নানাভাবে এ মসজিদের ঐতিহাসিকতাকে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। মূল গম্বুজ ছিল এ অঞ্চলের সমকালীন প্রচলিত গম্বুজ রীতির ব্যতিক্রম। গম্বুজের উপরিভাগ ছিল জায়গায় জায়গায় এক সারি করে ইট বের করা, অনেকটা যেন কর্বেল পদ্ধতির মতো করে নির্মিত। সংস্কারের সময় গম্বুজটির অভিনবত্ব নিশ্চিহ্ন করে সাধারণ গম্বুজে পরিণত করা হয়েছে। বর্তমানে মসজিদটির নিচের দিকের ইট নোনায় আক্রান্ত। প্লিন্থের পর কর্নার টাওয়ারের ব্যান্ডগুলোর অলঙ্কৃত বরফি মোটিফ অধিকাংশই ভেঙে গেছে। মসজিদ সম্প্রসারণ করতে গিয়ে ক. পূর্ব-দক্ষিণ দিকের কর্নার টাওয়ারের ভেতর সম্প্রসারিত দেয়াল ও ছাদ ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে, খ. পূর্ব-উত্তর ও পূর্ব-দক্ষিণ দিকের কর্নার টাওয়ারের প্লিন্থে আধুনিক মোজাইক করা হয়েছে, গ. মূল মসজিদের ভেতরের দেয়াল ও মিহরাব রঙিন টাইলস দিয়ে আবৃত করা হয়েছে।
ঠাকুরদীঘি বা খাঞ্জেলী দীঘির ঘাট খান জাহানের সমাধির পাশে দক্ষিণে অবস্থিত। এ দীঘিটির একটি স্থাপত্যিক গুরুত্ব রয়েছে। দীঘির উত্তর পাড়ে রয়েছে বহুধাপবিশিষ্ট ইটে বাঁধানো প্রশস্ত ঘাট। সুলতানি যুগের ইট বাঁধানো পুকুরঘাটের অনন্য উদাহরণ হিসেবে এটি অবিকৃত অবস্থায় সংরক্ষিত থাকা অপরিহার্য ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে ঘাটটির আর কোনো ঐতিহাসিক তাত্পর্য নেই। পাথরে বাঁধানো উজ্জ্বল ঝকঝকে আধুনিক ঘাটে রূপান্তর হয়েছে। পাশে বাঁধানো প্রস্তরলিপি পাঠে জানা যায়, জনৈক জননেতা তাঁর পিতার স্মৃতির উদ্দেশে এ ঘাট ‘নবরূপায়ণ’ করেছেন।
ঠাকুরদীঘির পশ্চিমে খান জাহান আলীর সমাধি সৌধের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে নয় গম্বুজ মসজিদটির অবস্থান। আপাতদৃষ্টিতে বাইরে থেকে মসজিদটি সুন্দরভাবে সংস্কারকৃত এবং ভালো অবস্থায় রয়েছে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু পর্যবেক্ষণে ভিন্ন চিত্র বেরিয়ে আসবে। দক্ষিণের দেয়াল কোথাও কোথাও নোনা আক্রান্ত। মিহরাব বরাবর বহির্দেয়ালের উদ্গত অংশ (Projected) ভাঙা এবং পশ্চিম দেয়ালের কোনো কোনো অংশের ইট খুলে নেয়া হয়েছে। যত্রতত্র শেওলা আক্রান্ত। সংস্কারের সময় উত্তর দিকের বহির্দেয়ালের অধিকাংশ অলঙ্করণই ফেলে দেয়া হয়েছে বলে স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ। সংস্কারের পরও মসজিদের ভেতরের অংশ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে, তাই ভেতরের দেয়াল অত্যন্ত নাজুক। কেন্দ্রীয় মিহরাবের ইটে ভগ্নদশা। চারদিকে জমে আছে শেওলা। তবে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় হলেও ভেতরের অলঙ্করণ অনেকটাই দৃশ্যমান।
চুনাখোলা মসজিদকে স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় এগিয়ে রাখতে হবে অনেক। কারাপাড়া ইউনিয়নে চুনাখোলা গ্রামের এক খোলা মাঠে অনেকটা নিঃসঙ্গ অবস্থায় যেন মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে। নিঃসঙ্গ বলেই এর প্রতি দায়িত্বশীলদের নজর কম। যেহেতু বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ এ মসজিদটি এখনো ভালোভাবে দাঁড়িয়ে আছে, তাই সংস্কারে মনোযোগ দিলে একে রক্ষা করা সম্ভব। বর্তমান দশা সাধারণভাবে এরূপ— পূর্বদিকের দেয়াল বিশেষ করে কেন্দ্রীয় দরজার খিলানের আশপাশে নোনায় ইট ও অলঙ্কণের ভগ্নদশা। পশ্চিম দেয়ালের কর্নার টাওয়ারের কোনো কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত। বহির্দেয়ালের চমত্কার অলঙ্করণগুলোর অধিকাংশই ক্ষতিগ্রস্ত। ভেতরের দেয়াল অলঙ্করণও প্রায় নিশ্চিহ্ন। দক্ষিণের খিলানের মাঝখানে বৃষ্টির পানি জমে শেওলা তৈরি করেছে। সংস্কারের সময় কেন্দ্রীয় মিহরাবে কিছুটা কাজ করা হয়েছে, তবে নির্মাণ দুর্বলতা চোখে পড়ে।
বিবি বেগনী মসজিদটি তুলনামূলক ভালো অবস্থায় রয়েছে। তবে কর্নার টাওয়ার এবং এর সংলগ্ন দেয়াল ভেজা বলে শেওলা জমে আছে। সংস্কারের সময় সম্ভবত অলঙ্করণ নষ্ট করা হয়েছে। গম্বুজ বরাবর বৃষ্টির পানি চুইয়ে ভেতরে পড়ে তাই স্থানীয় মুসুল্লিরা চুন-সুরকির প্রলেপ দিয়ে পানি বন্ধের চেষ্টা করেছেন। এদিকে ফকিরবাড়ী মসজিদ বা রণবিজয়পুর মসজিদটি ষাটগম্বুজ মসজিদ থেকে আনুমানিক দুই কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে রণবিজয়পুর গ্রামে অবস্থিত। মসজিদটির বহিরাঙ্গ উত্তমরূপে সংস্কার করা হয়েছে। তবে ভেতরে ঢুকলে থমকে যেতে হয়। ষাটগম্বুজ মসজিদের অনুরূপ প্লাস্টার ও চুনকাম করে সুলতানি ইমারতের বৈশিষ্ট্য ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। এদিকে রণবিজয়পুর চিল্লাখানার ধ্বংসপ্রাপ্ত কাঠামো দেখে মনে হয়, একসময় এখানে এক গম্বুজ স্থাপনা ছিল। দুটি প্রাচীন সমাধি শনাক্ত করা হয়েছে। সম্ভবত স্থানীয় মানুষ সিমেন্ট-বালির ব্যবহারে একটিকে আধুনিক বাঁধানো কবরে রূপান্তর করেছে। অন্যটিও সংস্কারে হাত দেয়া হয়েছে।
খান জাহানের বসতবাড়ি আবিষ্কারের পর একজন প্রশাসক ও নির্মাতা হিসেবে তাঁর গুরুত্ব নিরূপণের কাজ বেশ সহজ হয়ে গেছে। ষাটগম্বুজ ইউনিয়নের বাজেয়াপ্তি-সুন্দরঘোনা এলাকায় পাশাপাশি তিনটি ঢিবি খান জাহানের বসতবাটি বলে কথিত। ১৯১৪-এর দিকে সতীশ চন্দ্র মিত্র ঢিবির আশপাশে অনেক সাংস্কৃতিক নিদর্শন দেখেছিলেন। এখনো পাথর খণ্ড, মৃত্পাত্রের ভাঙা টুকরা, সুলতানি যুগের ইট দৃশ্যমান। ২০০০ সালে ঢিবির কিছু অংশ খনন করা হলে ৩ দশমিক ৬৬ গভীরতা পর্যন্ত তিনটি সাংস্কৃতিক স্তর বেরিয়ে এসেছে। অসম্পূর্ণ উত্খননের পর পুরোপুরি ঢেকে না দেয়ায় এখন খাদগুলো দৃশ্যমান। অন্যদিকে মগরা খালের তীরে জাহাজঘাটা অথবা পাথরঘাটা প্রত্নস্থলে একমাত্র প্রত্ননিদর্শন মহিষমর্দিনী মূর্তি খোদিত মাটিতে প্রথিত পাথর খণ্ড। এ পাথর খণ্ডটি সংরক্ষণের উদ্যোগ কখনো নেয়া হয়েছিল বলে আমাদের জানা নেই। ফলে ধীরে ধীরে ক্ষয় পেয়ে যাচ্ছে পাথর ও উত্কীর্ণ মূর্তি।
জিন্দাপীরের ইমারতগুচ্ছ বাগেরহাটের ঐতিহ্যিক বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। বিশেষ করে খান জাহানের সমাধির আনুমানিক ৭০০ মিটার পশ্চিমে কথিত জিন্দাপীরের মাজার, মসজিদ, ধ্বংসপ্রায় ইমারতের কাঠামো এবং কয়েকটি পাকা কবর আছে। জিন্দাপীরের মাজারের বহির্দেয়াল মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। ভেতরে আধুনিক ছাদ দিয়ে মাজার সুরক্ষিত করার প্রয়াস নেয়া হয়েছে। এ কারণেই সম্ভবত বহির্দেয়াল সংস্কার চিন্তায় গুরুত্ব হারিয়েছে। জিন্দাপীরের চিল্লাখানা বা মসজিদ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে। কর্নার টাওয়ারে কপুলা বা অণুগম্বুজ যুক্ত করা হয়েছে। সংস্কারের অল্পকাল পরেই দেয়াল নোনায় ধরেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জিন্দাপীরের মাজারের পশ্চিম পাশে দুই সারি এবং উত্তর পাশে এক সারি পাকা কবর আছে। উত্তর পাশের সারিতে রয়েছে পাঁচটি কবর এবং পশ্চিম পাশের দুই সারিতে রয়েছে চারটি কবর। স্থানীয় জনগণ কবরগুলো বাঁধাতে গিয়ে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নষ্ট করে ফেলছে। মাজার এলাকার উত্তর-দক্ষিণে ইমারতের ভগ্নাবশেষ রয়েছে। যদিও অধিদপ্তরের সংস্কার কার্যক্রমে এগুলো গুরুত্ব পায়নি। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে আমরা ভগ্ন ইমারতের কাঠামোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় এনেছি। এ প্রসঙ্গে পরে আলোকপাত করা হবে। এর বাইরে সুন্দরঘোনা মৌজায় অবস্থিত ছয় গম্বুজবিশিষ্ট রেজাখোদা মসজিদটি সম্পূর্ণ ভগ্ন অবস্থায় রয়েছে। এখন যেটুকু দৃশ্যমান তা হচ্ছে— উত্তর দেয়াল, অষ্টকোণাকৃতি কর্নার টাওয়ার, কেন্দ্রীয় মিহরাবসহ তিনটি মিহরাব এবং পশ্চিম দেয়ালের কিছু অংশ। মিহরাবগুলোয় পোড়ামাটির অলঙ্করণ এখনো দৃশ্যমান। এ ধরনের প্রত্ন-ঐতিহ্যের ধ্বংসাবশেষ এবং তার স্থানিক বিন্যাস থেকে একজন প্রশাসক ও নির্মাতা হিসেবে খান জাহান আলীর অবস্থানকে সহজেই চিহ্নিত করা যায়।
লেখক: অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়






