ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ ১০ জানুয়ারি ২০১৭ প্রমাণ করলেন তিনি অমর নন। হংকংয়ে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। যখন ১০ অক্টোবর ২০১১ সহাস্যে জীবনের ১০০ বছর পূর্ণ করলেন একাত্তরের যুদ্ধদিনে বাংলাদেশের বন্ধু ব্রিটিশ সাংবাদিক ও লেখক ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ, কেউ কেউ বললেন, অমরত্বের দিকে এগোচ্ছেন ক্লেয়ার। হংকং ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের একটি টেবিল বরাবরই তাঁর জন্য চিহ্নিত থাকত। ব্যাগ পাসপোর্ট, টাইপরাইটার, কিছু বাড়তি ফিল্ম, পায়ে প্রয়োজনে দৌড়াবার মতো জুতো— বরাবর রণাঙ্গনের জন্য প্রস্তুত থাকতেন ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ।

 ক্লেয়ার ডেইলি টেলিগ্রাফের সাংবাদিক; বন্ধু ও স্বজনরা বলেন, ওয়ার হর্স— রণাঙ্গনের এই অশ্ব যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের ভেতরে ও বাইরে থেকে বাংলাদেশের তথ্য পৃথিবীকে জানিয়েছেন, স্বাধীনতার পক্ষে জনমত সৃষ্ট করেছেন।

বাংলাদেশের জন্মের সময় ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালই ছিল বিদেশী সাংবাদিকদের ঠিকানা। একাত্তরের ২৭ মার্চ এই হোটেলে জমায়েত করে ৩৫ জন বিদেশী সাংবাদিককে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহিষ্কার করা হয়।

একাত্তরের আগস্টে যখন ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বোমাবর্ষণ করা হয়, হোলিংওয়ার্থ তখন হোটেলে। তিনি নেমে এসে অন্যান্য বিদেশীকে অনুরোধ করলেন, ‘শিগগিরই হোটেল ছাড়ুন। দ্বিতীয় বোমাটি বিস্ফোরিত হলো বলে। ১৯৪৭ সালে কিং ডেভিড হোটেলে বোমাবর্ষণের কথা আমার মনে আছে।’

প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটরি অথরিটির আওতাধীন এলাকায় কিং ডেভিড হোটেলে প্যালেস্টাইনি ইহুদি সংগঠন জাগানাহর দ্বিতীয় বোমা বিস্ফোরণ ঘটালে ৯১ জনের মৃত্যু ঘটে, ৪৬ জন আহত হন। ক্লেয়ার তারই সাক্ষী। প্রথম বোমাটি বিস্ফোরণের সময় ক্লেয়ার কিং ডেভিড হোটেলেই ছিলেন। ঢাকায় দ্বিতীয় বোমাটি আর নিক্ষিপ্ত হয়নি।

ক্লেয়ার লিখছেন, ‘ধোঁয়া ও ধুলো (ঢাকার) আকাশ ছেয়ে ফেলল। ঝনঝনে কাচের ওড়াওড়ি বন্ধ হতেই আগুন লাগার ঘণ্টাধ্বনি শুরু হয়ে গেল। হোটেলের অতিথিদের আতঙ্ক আরো বাড়িয়ে দিল। আমি জরুরি সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে দেখি, যেখানটায় বইয়ের দোকান সেখানে পানি পড়ছে। স্টাফ কোয়ার্টারে আটকে পড়া জখমিদের তীব্র চিত্কার শোনা যাচ্ছে।’

 

দুর্বিনীত রণাঙ্গন প্রতিনিধি

ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থের জন্ম ১০ অক্টোবর ১৯১১। ইংল্যান্ডের  লেস্টারের দক্ষিণ নাইটন নামের আধা-শহরে। তাঁর বয়স যখন তিন বছর, তখন প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হয়। ক্লেয়ারকে চলে যেতে হয় বাবার জুতো ও বুটের ফ্যাক্টরিতে। যুদ্ধ যে ইতিহাস ও জীবনের অংশ— শৈশব থেকেই ক্লেয়ারকে তা উপলব্ধি করতে হয়েছে— আমরা যে খামারবাড়িতে থাকতাম, মনে আছে সেখানে আমাদের মাথার ওপর জার্মান বোমারু বিমান উড়ে গেছে এবং লাফবরোতে বোমা ফেলেছে। পরদিন সকালে আমার টাট্টুঘোড়া নিয়ে বোমার ক্ষয়ক্ষতি দেখতে চলে গেলাম। সেখানে এত কম ক্ষতি হয়েছে দেখে অবাক হয়ে গেলাম।

তাঁর বাবা যদিও সৈনিক ছিলেন না, স্কুলে পড়া মেয়েটিকে যুদ্ধক্ষেত্র দেখাতে নিয়ে গেছেন— নেসবি, বসওয়ার্থ, ক্রেসি, পয়টার্স ও এজিনকোর্ট। বাবার পীড়াপীড়িতে লেস্টার কলেজে গার্হস্থ্যবিজ্ঞান পড়লেন এবং অচিরেই গার্হস্থ্য সব বিষয়ে উত্সাহ হারালেন। এক যুবকের সঙ্গে প্রেম হলেও তিনি বুঝতে পারলেন, এসব পানসে বিষয় তাঁর জন্য নয়। শিগগিরই সম্পর্কটি ভেঙে যায়। তার পরও ২৪ বছর বয়সে ভ্যান্ডেলু রবিনসন নামের একজন সহকর্মীকে বিয়ে করেন।

কিন্তু নিজের নামের সঙ্গে স্বামীর নাম জুড়ে দিতে রাজি হলেন না— সেকালের বিচারে এটাকেই গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহ হিসেবে গণ্য করা হয়। শিগগিরই রবিনসনকে ফেলে পোল্যান্ড চলে যান এবং ২৭ বছর বয়সে হয়ে ওঠেন দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফের মতো পত্রিকার রণাঙ্গন সংবাদদাতা।

ঘটনাবহুল তাঁর জীবন। বয়স তখন ২৭ বছর, টেলিগ্রাফে চাকরিজীবনের এক সপ্তাহও পুরো হয়নি। তাঁর অবস্থান পোল্যান্ড-জার্মান সীমান্তে ক্যাটোউইসে। সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, তবে পতাকাবাহী গাড়ি সীমান্ত অতিক্রম করে দুদিকেই যাবার অনুমতি পাচ্ছে।

পোল্যান্ড প্রান্তে ক্লেয়ারের কাছাকাছি পতাকাবাহী গাড়ি একটি— ব্রিটিশ কনসাল জেনারেলের। তিনি সেই গাড়িটাই ধার নিয়ে ছুটলেন জার্মানিতে। তাঁর পরিচিত একটি উপত্যকা ধরে ফেরার পথে রাস্তার পাশে ত্রিপলঘেরা একটি বিশাল এলাকায় হঠাৎ বাতাসের তোড়ে ত্রিপলের একটি অংশ উড়ে গেলে বিস্মিত হয়ে তিনি দেখলেন সারি সারি ট্যাংকের বহর সব পোল্যান্ডমুখী। হঠাৎ দেখা এই দৃশ্যপট তাঁর হাতে তুলে দিল বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভয়াবহ খবর— ‘জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।’

বিচিত্র ও অসনাতন সাংবাদিক জীবনের সক্রিয় ৭০টি বছর তাঁর কেটেছে রণাঙ্গন ও সংকটপূর্ণ স্থানে— মহাযুদ্ধকালের পূর্ব ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা, রক্তাক্ত প্যালেস্টাইন, সাম্যবাদী চীন, আলজেরিয়া, এডেন, ভিয়েতনাম— তাঁর জীবনের ঘাম ও রক্তবিন্দু মিশে আছে এসব জায়গার মানুষের হাহাকারের সঙ্গে। ওয়ার্কোহোলিক ক্লেয়ার হয়ে ওঠেন ওয়ার হর্স। ‘আমি খুব সাহসী ছিলাম বলব না, তাই বলে আমি একেবারেই সরল ছিলাম, তাও নয়। কিন্তু আমি মনে করেছি একটা কিছু দেখা, সাক্ষী হিসেবে থাকা এবং কিছু একটা করা জরুরি— আমি কমবেশি দুশ্চিন্তামুক্তই থেকেছি। রাস্তায় থাকতাম, গাড়িতে ঘুমাতাম, একটা বিস্কুট খেয়ে একটুখানি ওয়াইন মুখে দিয়ে আবার ছুটতাম— সেই সব দিনগুলোয় আমরা বলতাম, যেখানে ইচ্ছে দুটো ‘T’ সঙ্গে নিয়ে যাও— একটি টাইপরাইটার এবং একটি টুথব্রাশ।’—  নিজের সম্পর্কে ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তাঁর পছন্দের ও শ্রদ্ধার দুজন জেনারেল ছিলেন— ওয়াভেল এবং অশিনলেক; কিন্তু মন্টগোমারির জন্য তাঁর তেমন সময়ই ছিল না— অবশ্য মন্টগোমারিও বিশ্বাস করতেন নারী-সাংবাদিকদের রণাঙ্গন থেকে দূরে রাখা উচিত। জার্মানঘেঁষা— এই অভিযোগ এনে টেলিগ্রাফ ক্লেয়ারকে সরিয়ে দিলে তিনি তখন ডেইলি নিউজের হয়ে কাজ করছিলেন। মন্টগোমারি ত্রিপোলি বিজয়ের পর তাকে এবং অন্য সাংবাদিকদের ব্যাগ গুছিয়ে বিদায় নেয়ার নির্দেশ দিলেন— তিনি মনে করতেন সাংবাদিকরা তাকে খাটো করে লিখছে, প্রাপ্য মর্যাদা দিচ্ছে না। ক্লেয়ার চলে গেলেন আলজিয়ার্সে আইজেনহাওয়ারের মার্কিন বাহিনীর কাছে, অন্যরা গেলেন কায়রো।

তিনি বললেন, আমি সবই করতে পারি, পুরুষ যা পারে আমিও তা পারি। পুরুষের টয়লেট ব্যবহার করতে পারি, ফ্লোরে ঘুমোতে পারি। ...তাঁর মূল কর্মক্ষেত্র কায়রো থেকে চলে এলেন প্যালেস্টাইন, ইরাক এবং ইরান। তেহরানে ২১ বছর বয়সী ইরানের রেজা শাহ পাহলভির প্রথম সাক্ষাত্কারটি গ্রহণ করেন। (ফরেন অ্যাফেয়ার্স থেকে উদ্ধৃত) ইহুদি সন্ত্রাসীরা কিং ডেভিড হোটেল উড়িয়ে দেয়ার জন্য বোমাবর্ষণ করলে তিনি বেঁচে যান কিন্তু তার চোখের সামনে ৯১ জনের মরদেহ। এ কারণেই তিনি ইহুদি নেতা মেনাচিম বেগিনের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতে অস্বীকার করেন, এমনকি বেগিন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও নয়।

&dquote;&dquote;অবিবেচক মেয়ের ওপর মা ক্ষেপে তার উইল পরিবর্তন করেন— যে হোটেল উড়িয়ে দেয়া হতে পারে এমন জায়গায় যে মেয়ে ঘুমোবে এমন দায়িত্বহীন (!) মেয়েকে মা কেন টাকা দেবেন? সুতরাং ক্লেয়ার মাতৃসূত্রে প্রাপ্য সম্পত্তি থেকে সেই ১৯৪৮ সালেই বঞ্চিত হলেন।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর জিপে তিনি রণাঙ্গনের দিকে যাওয়ার পথে একটি সেতুর ওপর পাকিস্তানি গোলা এসে পড়ল। ভারতীয় অফিসার বললেন, আরো একটা গোলা এসে পড়ুক, তার পর আমরা দ্রুত পার হয়ে যাব। আরো একটা গোলার জন্য প্রতীক্ষায় ক্লেয়ারের চোখের তারা তখন নাচছে। মহাযুদ্ধ শুরুর ব্রেকিং নিউজ যেমন তাঁর, গত শতাব্দীর কলঙ্কজনক ভিয়েতনাম যুদ্ধ সমাপ্তির ও আমেরিকান সেনা প্রত্যাহারের গোপন সিদ্ধান্তের ব্রেকিং নিউজটিও তাঁরই।

১৯৮০-এর দশক থেকে প্রায় স্থায়ীভাবেই তিনি হংকংয়ে অবস্থান করছেন। এর মধ্যে হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন, সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজে গবেষণা করেছেন এবং বয়স ৯০ ছাড়িয়ে ভেবেছেন, একটি স্টোরি করার কাজ পেলে এখনো ছুটবেন পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে, সবচেয়ে দুর্গম ও ভয়ঙ্কর স্থানে।

২৯ আগস্ট ১৯৩৯ টেলিগ্রাফের শিরোনাম : ‘পোলিশ সীমান্তে ১০০০ ট্যাংক আক্রমণ, চালানোর জন্য ১০ ডিভিশন প্রস্তুত।’ এত সব বাঘা সাংবাদিক থাকতে সদ্য যোগ দেয়া ক্লেয়ারই হয়ে গেলেন রণাঙ্গনের সেলিব্রিটি। ক্লেয়ার আরো একবার বিয়ে করেন। টেকেনি, সন্তান ধারণ না-করার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বললেন, রণক্ষেত্র ও কাজ তাঁর কাছে এমনই গুরুত্বপূর্ণ যে সন্তান অনাদরে থাকবে, উপেক্ষিত হবে, এই আশঙ্কায় আর এগোননি।

মা সাংবাদিকের কাজ কেবল অপছন্দ করতেন তা নয়, এটিকে হীন একটি কাজ বলে মনে করতেন। এদিকে যুদ্ধের প্রকৃত স্বাদ নেয়ার জন্য তিনি পাইলট লাইসেন্স করলেন, বিমান থেকে প্যারাসুট জাম্প প্রশিক্ষণ নিলেন। ইকোনমিস্ট, অবজারভার ও মানচেস্টার গার্ডিয়ানের হয়েও কাজ করলেন। ১৯৬৩ সালে ডেইলি টেলিগ্রাফ তাকে রণাঙ্গন সংবাদদাতার বদলে প্রতিরক্ষা প্রতিনিধি করতে চাইলে উঁচু পদ হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলেন— তাঁর চাই রণক্ষেত্র, মন্ত্রণালয়ের প্রতিরক্ষানীতি তাঁকে আকৃষ্ট করবে না।

১৯৭৩ সালে টেলিগ্রাফ তাঁকে পাঠিয়ে দিল বেইজিংয়ে আবাসিক প্রতিনিধি হিসেবে। বেইজিং তখন লৌহ-পর্দার আড়ালে। কিন্তু তিনি সবার আগে সম্পর্ক স্থাপন করলেন চাইনিজ জেনারেশনের সঙ্গে। তার কাজ সহজ হয়ে গেল।

এ সময় পা অপারেশনের পর চেতনানাশকের ঘোর কাটতেই তিনি বললেন, কালই যদি আমার পা ভালো হয়ে যায়, কালই কোথাও না কোথাও যুদ্ধ লাগবে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ দিয়েই তাঁর শুরু। তিনি এর পর পৃথিবীর প্রায় সব যুদ্ধই সাহসের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেছেন। প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন।

অ্যাকশন জার্নালিজম তাঁর রক্তে মিশে আছে। ১০ অক্টোবর ২০১১ হংকংস্থ বিদেশী সাংবাদিক সমিতি তাঁর শততম জন্মদিনের উত্সব করে আর তিনি জানিয়ে দেন, এখনো রণক্ষেত্রে যেতে প্রস্তুত রয়েছেন। তিনি প্রায় তিন দশক ধরে হংকংয়ে বসবাস করছেন।

ক্লেয়ারের লালিত পদবি ওয়ার করেসপনডেন্ট—রণাঙ্গন সংবাদদাতা। তিনি জবাব দিলেন দিনের সব সংবাদপত্র ঘেঁটে বের করব সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা কোনটি। আমি সেখানেই যাব।

ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থের চারটি বহুল সমাদৃত গ্রন্থ: পোল্যান্ড’স থ্রি উইকস’ ওয়ার (১৯৪০), দেয়ার ইজ এ জার্মান রাইট বিহাইন্ড মি (১৯৪৫), দ্য আরাবস অ্যান্ড দ্য ওয়েস্ট (১৯৫০), মাও অ্যান্ড দ্য মেন অ্যাগেইনস্ট হিম (১৯৮৪), তার স্মরণীয় স্মৃতিকথা ‘ফ্রন্ট লাইন’ প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯০ সালে। রণাঙ্গন সংবাদদাতাদের যথার্থ গুরু ক্লেয়ার পূর্ব ইউরোপ, আলজেরিয়া, ভিয়েতনাম ও মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রগুলোয় আগে পৌঁছেছেন, এবং সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নিয়ে রণাঙ্গনের সংবাদ পাঠিয়েছেন। স্বামী ও সংসারের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন কাজ ও রণক্ষেত্রকে— ‘আমি সারাক্ষণই কাজ করতাম, দিনে পাঠাতাম প্রতিবেদন, রাতে লিখতাম বই...অন্য সাংবাদিকদের অধিকাংশের গার্লফ্রেন্ড ছিল, আমার বলতে গেলে কোনো ব্যক্তিগত জীবনই ছিল না’— যুদ্ধই হয়ে ওঠে তার ভালোবাসা। বয়স যখন তাঁর নিরানব্বই ছুঁইছুঁই, তিনি জানালেন, তিনি অবসরপ্রাপ্ত কেউ নন, তিনি সাংবাদিক।

ক্লেয়ার অন্তত এক ডজন মৃত্যুঝুঁকি মোকাবেলা করেছেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় রোমানিয়া অবস্থানকালে তাঁকে গ্রেফতার করার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আসেন। গ্রেফতার প্রক্রিয়াটাকে দেরি করানোর জন্য তিনি দরজা না খুলে বলে দেন যে, তিনি নগ্ন অবস্থায় আছেন। একজন নগ্ন নারীকে টানাহেঁচড়া করলে তারাও বিপদে পড়বেন।

ক্লেয়ার বাস্তবিকই হাতের কাছে পাসপোর্ট রেখে ঘুমাতেন, এক বস্ত্রে কখন কোন রণাঙ্গনে ছুটতে হয়। ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ ‘নারী নিষিদ্ধ’ যুগেও পুরুষদের ডিঙিয়ে ফ্রন্টলাইনে ছিলেন, তাঁর সময়কার সমবয়সী আর কোনো রণক্ষেত্র সংবাদদাতা বেঁচে নেই। তিনি এখানেও ডিঙিয়েছেন সবাইকে।

 

ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থের একটি সাক্ষ্য ও দুটি টেলিগ্রাফ প্রতিবেদন, ড্যানিয়েল স্পিভাকের একটি টেলিগ্রাম

একাত্তরের দুঃসহ সংকটের দিনগুলোয় বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ। অক্সফাম যখন ৬০ জনের সাক্ষ্য প্রকাশ করে, অন্যতম প্রধান সাক্ষী হিসেবে নিজের জবানবন্দি লেখেন তিনি। কী ছিল তাঁর লেখায়?

আজ পূর্ব পাকিস্তানের ভেতরেই ৮০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত— পুরুষ, নারী ও শিশু ক্ষুধার্ত এবং গৃহহারা, তারা নিজ দেশে শরণার্থী।

দলে দলে গ্রামবাসী এদিক ওদিক ঘুরে মরছে, তারা ভারতে যাবে। কিন্তু প্রায়ই ভুল পথে পা বাড়াচ্ছে হতবুদ্ধি ও বিমূঢ় এই মানুষগুলো। কিন্তু তেমন কোনো সন্দেহ নেই যে দুর্দশাগ্রস্ত এই জনসমষ্টির একটি বড় অংশই শরণার্থী শিবিরের খাবার ও আশ্রয়ের আশায় সীমান্ত পাড়ি দেবে।

বাংলাদেশ লিবারেশন আর্মি— মুক্তি ফৌজের আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ডের জবাব দিতে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনারা যখন গ্রামে আগুন লাগিয়ে দিল— এই মানুষগুলোর একটি বড় অংশ বন্দুকের গোলাগুলির শব্দ শুনে এবং পাশের গ্রাম আগুনে জ্বলতে দেখে অন্ধ আতঙ্কে বাড়ি ছেড়েছে।

নিরাপদ জলাভূমির দিকে ছুটে যাওয়ার সময় মহিলাদের কেউ কেউ সহজাতভাবে কিছু কৌটা, কড়াই বা চালের বস্তা তুলে নেয়। ভাগ্য ভালো হলে পুরুষদের কারো কারো পকেটে কিছু টাকাও থেকে যায়, যা দ্রুত ফুরিয়ে আসে। ভ্রাম্যমাণ এই মানুষগুলো সেনাবাহিনী চলাচল করে এমন সড়ক সতর্কভাবে এড়িয়ে চলে। প্রকৃতপক্ষে জিপের শব্দ শোনামাত্র সমর্থ লোকজন নিকটতম নিচু জমিতে লাফিয়ে পড়ে। কখনো কখনো এসব চলমান মানুষ বিরান গ্রামে ঠাঁই নেয়, কিন্তু তারা এতই আতঙ্কিত যে, খাবারের জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাতেও পারে না। তারা বিশ্বাস করে, সমস্ত ক্ষমতা সেনাবাহিনীর এবং সাহায্যের জন্য কাউকে অনুরোধ করলে তা বরং কিছু যুবক ও যুবতীর গ্রেফতারের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

বন্যার কারণে নৌকার লাগাতার অভাব আর মুক্তিফৌজের ধ্বংসযজ্ঞের কারণে রেলওয়ে ও সড়কের অচলাবস্থায় এই ঘরছাড়া মানুষগুলো কোথায় আছে, তাও শনাক্ত করা যায় না, ব্যতিক্রম কেবল সেখানে, যেখানে খ্রিস্টান মিশনারি কিংবা ইউরোপীয় কর্মীরা কাজ করছেন। ভারতে পৌঁছানো পর্যন্ত এদের কয়জন মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তার হিসাব পাওয়া মুশকিল। তবে কোনো কোনো ডাক্তারের মতে, কমপক্ষে পাঁচ ভাগের এক ভাগ। যে দলটি আমি দেখেছি, তাদের অপুষ্টির আগাম নমুনা দেখা গেছে। এই বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোর জরুরি প্রয়োজন কাপড়-চোপড়, ওষুধপথ্যের, কিন্তু ভারতে পৌঁছার আগে কেমন করে এসবের ব্যবস্থা করা যায়, তা ধারণা করা সম্ভব নয়।

যে মিশন এখনো পূর্ব পাকিস্তানে কাজ করছে তাদের কাছে     সাহায্য-সামগ্রী পাঠিয়ে এবং জাতিসংঘের মাধ্যমে পাকিস্তানকে ত্রাণকর্মীদের খাদ্য বিতরণ ও ত্রাণ তত্পরতা চালানোর অনুমতির জন্য চাপ দিয়েই কেবল সেই মানুষগুলোর কাছে পৌঁছা যেতে পারে। এ মুহূর্তে পাকিস্তান সরকার কয়েকজন পর্যবেক্ষককে থাকার অনুমতি দিয়েছে, যাতে তারা দেখতে পান ত্রাণের খাবার সঠিক মুখেই পৌঁছেছে। খাদ্য একটি রাজনৈতিক অস্ত্র এবং খাদ্য যতটা দুর্লভ হতে থাকবে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে তৈরি শান্তি কমিটির ‘ভালো মানুষ’ সদস্যরা তাদের রাজনৈতিক সমর্থকদের খাওয়াতে শুরু করবে।

‘খারাপ মানুষ’ যারা একতাবদ্ধ পাকিস্তানের জন্য বিক্ষোভ করেনি, তাদের নিশ্চয়ই বাংলাদেশের ব্যাপারে সহানুভূতি রয়েছে, যেসব জায়গায় সেনাবাহিনী কার্যকরী বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, তার বাইরে সর্বত্রই তাদের খারাপ আচরণই প্রাপ্য হবে।

নিকটবর্তী বাজারে প্রচুর চাল থাকার পরও শত-সহস্র মানুষ নিজ বাড়িতেই ক্ষুধার যন্ত্রণায় ভুগতে শুরু করেছে, আর্থিক জীবন ভেঙে পড়ায় তাদের ক্রয়ক্ষমতাও নেই। পাট উত্পাদনকারীরা তাদের উত্পন্ন পাট বাজারে বেচতে পারেননি। গণযুদ্ধের কারণে উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানুষ কর্মচ্যুত হয়েছে। আবার ত্রাণের পক্ষপাতহীন বিতরণ অত্যন্ত জরুরি, নতুন হাজার হাজার দুর্গত মানুষ তাদের পরিচিত আশ্রয়স্থল ছেড়ে ভারতের পথ ধরবে।

হাজার হাজার, সম্ভবত লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচাতে ত্রাণ তত্পরতাই হচ্ছে একমাত্র পথ। শরতের চাল খাওয়া শেষ হলে দুর্ভিক্ষ এড়ানো যাবে না। যে পরিমাণ চাল এখন পাওয়া যাচ্ছে, প্রতি মাসে তার চেয়ে ২০ লাখ টন বেশি চাল ও অন্যান্য শস্য খাওয়া হচ্ছে। এখন প্রধান সমস্যা হচ্ছে পরিবহনের— প্রধান প্রধান বন্দরের খাদ্যের মজুদ গড়ে তোলা হচ্ছে, এসব খাদ্যসামগ্রী বিতরণের কোনো ট্রেন নেই, জাহাজ ও লরির সংখ্যাও অত্যন্ত কম। এখন যা জরুরি ভিত্তিতে দরকার, তা হচ্ছে যন্ত্রচালিত নৌকা এবং ট্রাক যার কর্তৃত্ব থাকবে রাজধানীর বাইরে স্বল্প পরিচিত রুটে খাদ্যশস্য পৌঁছে দেয়ায়।

এ মুহূর্তে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর। খাদ্যশস্য বোঝাই লরি কোনো না কোনো ফেরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকবে। এটি বলা ন্যায্যই হবে যে, মুক্তিফৌজের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো বিচ্ছিন্ন করে বাঙালিদের ভোগান্তিকে বাড়িয়ে দিয়েছে।

এ বছরের শেষ দিকে যখন দুর্ভিক্ষ শুরু হবে, তখন মানুষের জীবন বাঁচাতে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে এয়ার লিফট বা এয়ার ড্রপ— বিমান থেকে খাদ্য ফেলার নাটকীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার হবে। কিন্তু পাঁচ থেকে সাত কোটি মানুষকে বাঁচাতে এটি কোনো বাস্তবোচিত পদক্ষেপ নয়।

দুঃখের ব্যাপার হলেও এটি সত্য, অনেক পরিবার বিভক্ত হয়ে আছে— যে লোক তার দোকান ঢাকা বা চট্টগ্রামে খোলা রাখতে বাধ্য হচ্ছে, তার স্ত্রী-সন্তানদের পাঠিয়ে দিচ্ছে আত্মীয়দের কাছে; সেখানে যে বিপদ আরো বেশি হতে পারে, তা বিবেচনায় না এনেই। বাস্তবিকই হিসাব করে দেখা গেছে শহরে লোকসংখ্যা কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে।

কিন্তু এটি সংখ্যার প্রশ্ন নয়। আমি বেশ মনে করতে পারছি, ঢাকা থেকে ১০ মাইল দূরে বন্যাপ্লাবিত এলাকায় অর্ধনগ্ন মানুষের বিশাল একটি লাইন ছনের ঘরের সামনে অপেক্ষমাণ— কিছু কাপড় পাবে এবং ক্যাথলিক ধর্মযাজকের কাছ থেকে দৈনিক চালের একটি টিকিট নেবে। আমি একজন মহিলার সঙ্গে কথা বলি, তার পাঁচটি ক্ষুধার্ত সন্তান। আমাকে বলল, যুদ্ধের প্রথম দিকেই তার স্বামী নিহত হয়েছেন। তার বাসা ছনের, পাকিস্তানি সেনারা পুড়িয়ে দিয়েছে। আগুন গোটা ঘর ছেয়ে ফেলার আগে কেবল তার সন্তানদের বের করে আনার সময় পেয়েছে। সেজন্যই তার কাপড়-চোপড় কিছুই নেই। তার এই গল্প হাজারবার পুনরাবৃত্তি করা যেতে পারে।

পাকিস্তান সরকারের কোনো সাহায্য-সহায়তা ছিল না, যদিও এখান থেকে এক মাইলের মধ্যে চালু রেললাইন ছিল, যদি এই ধর্মযাজক না থাকতেন, এই বিধবা ও তার পাঁচ সন্তান সম্ভবত মৃতই পড়ে থাকত। পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে যে ৩০ হাজার মানুষ বার্মা সীমান্ত পাড়ি দিয়েছে, তাদের জন্যও ত্রাণ প্রয়োজন। সেখানে কোনো বিদেশীকে ঢুকতে দেয়া হয় না। কিন্তু একজন বার্মিজ ডাক্তার আমাকে বলেছেন, তাদের দুর্গতিও ভয়াবহ।

 

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্ব বাংলায় ত্রাসের রাজস্ব চালাচ্ছে

(ঢাকা থেকে ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ)

একটি ব্রিটিশ সংসদীয় প্রতিনিধি দল পূর্ব বাংলা ঘুরে এসে গতকাল কলকাতার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছে। প্রতিনিধি দলের নেতা মিডলসবারা পূর্ব থেকে নির্বাচিত শ্রমিকদলীয় এমপি আর্থার বটমলেকে হতাশ ও বিষণ্ন দেখাচ্ছিল। ঢাকা থেকে ১৫ মাইল উত্তরে বলিয়াদি যাওয়ার যে পরিকল্পনা নিয়েছিলেন, কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর তা ব্যর্থ হয়ে যায়। রোববার ভোরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এলাকাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফেলে।

ছোট শিল্প শহর টঙ্গী থেকে উত্তরের এই এলাকার ছয়টি গ্রাম কেন জ্বালিয়ে দেয়া হলো, কেন গুলি চালানো হলো, এখন পর্যন্ত তার কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি।

প্রতিনিধি দলের সদস্য টুইকেনহাম থেকে নির্বাচিত রক্ষণশীল দলের টবি জেসেল এমপি ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘এখানে যে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে, তাতে মানুষের অর্থনীতিক জীবন পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।’

চারদিন ধরে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন মিশনে তার অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, স্থানীয় জনগণের নিরুদ্দিষ্ট হওয়া এবং সেনাবাহিনীর গ্রাম তছনছ করে ফেলা বরং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতি আতঙ্ক বাড়িয়ে তুলবে।

গুলি চালানোতেই আনন্দ

টবি জেসেল বলেন, ‘জেনারেলদের খামখেয়ালিপূর্ণ ট্রিগার-হ্যান্ডি আচরণ এবং বিভিন্ন ইউনিটের স্বৈরাচারী কার্যক্রম অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি বুকে হাত রেখে কাউকে বিশেষ করে তিনি যদি হিন্দু কিংবা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্কিত হন, বলতে পারব না— আপনারা পাকিস্তানে ফিরে যান।

এখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যে মানসিক প্রস্তুতি— ভারত থেকে যে কারো পাকিস্তানে ফিরে আসা নিরাপদ হবে কিনা, সে বিষয়ে আমি সন্দিহান।’

টবি জেসেল বলেন, ‘জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে একটি পদক্ষেপ হবে গভর্নরের পদ থেকে জেনারেল টিক্কাকে সরিয়ে বাঙালিদের হূদয়-মন জয় করতে সক্ষম হবেন— এমন কোনো সেনা কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়া।’

টবি জেসেল বলেছেন, পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ আবেগময় বক্তৃতা দিয়ে দ্বিমুখী কাজ করে চলেছে। তারা একদিকে বলছে সীমান্ত পেরিয়ে আসা ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তারা ঢাকা ও চট্টগ্রামের মাঝখানে ফেনী সেতু ধ্বংস করে ফেলেছে, আবার একই সঙ্গে তারাই সেতুসংলগ্ন গ্রামগুলো আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে। কারণ এ গ্রামগুলোতে গেরিলা যোদ্ধাদের আশ্রয় দেয়া হচ্ছে। আরো একজন সদস্য ইস্টহ্যাম উত্তরের শ্রমিক দলের এমপি রেজিল্যান্ড প্রেন্টিস পরোক্ষভাবে যা বলেছেন, তার মানে দাঁড়ায় বঙ্গীয় বদ্বীপের বরিশাল এলাকা সফর করে বুঝতে পেরেছেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সেখানে এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেনি। বরং আশপাশের গ্রামে সেনাবাহিনীর নির্যাতনের খবর তার কাছে পৌঁছেছে।

ব্রিটিশ সংসদীয় প্রতিনিধি দলের নেতা আর্থার বটমলে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, তারা সফরকালে ভয়াবহ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন।

রয়াল এয়ারফোর্সের উড়োজাহাজ হার্কিওলিস প্রতিনিধি দলকে ফিরিয়ে নিতে এলে প্রথমে ভারতীয় আকাশসীমায় প্রবেশে বাধা দেয়া হয়। পরে ১৫ মিনিট ধরে উড়োজাহাজের ক্রু ও কলকাতায় গ্রাউন্ড কন্ট্রোলের মধ্যে কথাবার্তা হওয়ার পর এটি অবতরণের অনুমতি দেয়া হয়।

চট্টগ্রামে মৃত্যু ও ঘৃণার রাজত্ব

সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর চট্টগ্রামে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে।

বাঙালি ও বিহারিদের মধ্যে বেশ কয়েক দফা সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সামরিক কর্তৃপক্ষ আগুন জ্বালিয়ে, কামানের গোলা মেরে এবং বুলডোজার চালিয়ে গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করে দিয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে চাপা ঘৃণা, অবিশ্বাস ও আতঙ্ক এখনো রয়ে গেছে। এবং তা বেশ তীব্র বলে মনে হচ্ছে।

আসলে সামরিক বাহিনী স্বীকারই করেছে যে, শ্রমজীবী মানুষের এক-তৃতীয়াংশ এখনো গ্রামাঞ্চলে লুকিয়ে আছে। রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা খুব কম, দোকানপাট বন্ধ। যদিও রাতের বেলা কারফিউ কিছুটা শিথিল করা হয়, রাতভরই গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়।

এ বিষয়ে একজন কর্নেল এভাবে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন: ‘আমাদের গোলাগুলির শক্তি তাদের চেয়ে অনেক বেশি। যখনই কোথাও কোনো প্রতিরোধ সৃষ্টি হয়, আমরা সেখানে বাড়িঘর ধ্বংস করে দেই। আশপাশের এলাকাও রেহাই পায় না। বাংলাদেশের গেরিলাদের আশ্রয় দিলে এর পরিণতি কী হবে— আমরা এভাবে তা দেখিয়ে দিতে চাই।’

৫ জুলাইয়ের মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে ৬৫ মাইল উত্তর-পশ্চিমে গুরুত্বপূর্ণ ফেনী সেতু মেরামত সম্পন্ন হবে বলে সেনাবাহিনী আশা করছে। তখন চট্টগ্রামে আটকে পড়া দ্রব্যসামগ্রীর জট কেটে যাবে এবং বিতরণ করা সম্ভব হবে। কিন্তু বিদেশী বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে সন্দিহান। তারা মনে করেন, বাংলাদেশের গেরিলা কিংবা তাদের ভারতীয় সহযোগীরা সেতুর ওপর রেলওয়ে ক্রসিং এমনই দক্ষতার সঙ্গে নষ্ট করেছে যে, তা চালু করতে এখনো অনেক কাজই বাকি রয়ে গেছে। সামরিক আইন কর্তৃপক্ষের দাবি মাত্র এক হাজার স্থানীয় নাগরিক বর্তমানে আটক আছে। কিন্তু বাঙালি নেতাদের সঙ্গে একান্তে কথা বলার সময় জানা যায়, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রতি রাতেই তারা শতাধিক মানুষ ধরে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে মাত্র পাঁচ-ছয়জন গ্রামে ফিরে যাওয়ার অনুমতি পায়।

এখানে অবস্থানরত ব্রিটিশ নন, এমন বিদেশীরা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তারা আরো বলেছেন, সেনাবাহিনী স্থানীয় জনগণকে সার্বক্ষণিক হুমকির মুখে রেখেছে, তাদের দোকান খুলতে এবং অফিসে যোগ দিতে বাধ্য করছে— আর জনগণ এতই আতঙ্কিত যে, তারা সেনাবাহিনীকে অমান্য করার সাহস পাচ্ছে না। তবে হুমকি কিংবা জিজ্ঞাসাবাদের পর প্রথম সুযোগেই বাঙালিরা সীমান্ত পেরিয়ে ভারত চলে যাচ্ছে। সন্দেহ নেই, এই বঙ্গীয় বদ্বীপে সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা হিমশিম খাচ্ছে; যেকোনো শহর করায়ত্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৈন্যরা লুটপাট করছে, সবকিছু তছনছ করে ফেলছে। এদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কট্টর সমর্থকরা উদ্বিগ্ন। এখানকার ব্রিটিশ নাগরিকরা মনে করেন, পাকিস্তানকে আর্থিক সাহায্য প্রদান আবার চালু করা প্রয়োজন। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারে তারা সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে। কিন্তু তাদের সঙ্গে অন্য কোনো বিদেশী একমত নন, বাঙালিরা তো নয়ই।

(২৯ জুন ১৯৭১; দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ)

 

মুজিব পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন

তাঁর গাল বেয়ে তখন অশ্রু ঝরছিল, গতকাল ১০ জানুয়ারি ঢাকা রেসকোর্সে শেখ মুজিবুর রহমান লক্ষ বাঙালির সামনে উল্লেখ করেন, তাঁর নতুন দেশ বাংলা দেশ (তখনো বাংলাদেশ দুই শব্দে লেখা হতো) স্বাধীন হয়েছে, ‘চিরদিন’ স্বাধীনতা বজায় রাখবে।

প্রেসিডেন্ট সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি পান। লন্ডন থেকে দিল্লি হয়ে স্বদেশে ফিরে তিনি অভাবনীয় সংবর্ধনা লাভ করেন। লাখো জনতার মধ্য দিয়ে তাঁকে এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি রেসকোর্সে আনা হয়।

স্পষ্টতই তিনি খুব ক্লান্ত ছিলেন, তাঁর ৪০ মিনিটের ভাষণের সময় তিনি বেশ কয়েকবার কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, জাতিসত্তার জন্য পৃথিবীর ইতিহাসে আগে কখনো এত লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়নি। তিনি আরো বলেন, পৃথিবীর সকল দেশের উচিত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া। পাকিস্তানের প্রসিডেন্ট ভুট্টো যে বিশেষ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার কথা বলেছেন, তা কখনো হবার নয়।

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যে অসম বন্ধন ছিল, তা চিরদিনের মতো ছিন্ন হয়ে গেছে।

শেখ মুজিব ঘোষণা করেছেন, বাংলা দেশের জাতীয়ভিত্তিক রাজনৈতিক দল ‘সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা’র জন্য কাজ করবে, যার অর্থ পাকিস্তানি ধারণার মুসলমান রাষ্ট্র পরিত্যক্ত হয়েছে।

তিনি চোখ মুছতে মুছতে পাকিস্তানকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তোমরা আমার দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করেছো, মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠন করেছো, অসংখ্য ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছো, আমার এক কোটি মানুষকে ভারতে তাড়িয়েছো।’

‘তারপরও আমি তোমাদের প্রতি কোনো ঘৃণা পোষণ করছি না। তোমরা স্বাধীন, আমাদের স্বাধীনতা আমাদের ভোগ করতে দাও।’ তাঁর দেশবাসীর অবিশ্বাস্য সমর্থনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৩৫ লক্ষ লোককে হত্যা করা হয়েছে। এই গণহত্যার জন্য যারা দায়ী, তিনি তাদের বিচারের দাবি জানান। তিনি আশা করেন আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে এই বিচার অনুষ্ঠিত হবে। যারা তাঁর ‘প্রহসনের বিচারে’ তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছে, যারা উসকানি দিয়েছে এবং যোগসাজশ করেছে, তাদেরও শাস্তি হবে। তবে জনগণ যেন আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

কঠোর পরিশ্রম করে দেশ গড়ার জন্য তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘ঘুষ নেবেন না। আমি এটা কখনো সহ্য করব না।’

শেখ মুজিব মিসেস গান্ধী এবং ভারত সরকারকে তাদের সহযোগিতার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। আবেগময় কণ্ঠে তিনি বলেন, তিনি তাঁর দেশের ‘পবিত্র ভূমি’তে ফিরে এসেছেন।

‘সারাক্ষণ আমার মনে হতো— আমি কখনো আবার আমার সোনার বাংলায় ফিরে যেতে পারব তো? তারা আমার কবর খুঁড়ে রেখেছিল। কেবল আল্লাহর রহমতে আজ আমি এখানে ফিরে আসতে পেরেছি।’

উপস্থিত কূটনীতিকদের মধ্যে চীনের কনসাল জেনারেল সেখানে ছিলেন না, তবে আমেরিকার কনসাল স্পিভাগ উপস্থিত ছিলেন। জন স্টোনহাউস এমপি (ওয়েন্সবারি থেকে শ্রমিকদলীয় এমপি) প্লাটফর্মে ছিলেন, রয়াল এয়ারফোর্সের কমেট উড়োজাহাজ তাঁকে লন্ডন থেকে নিয়ে যায়। বিপুলসংখ্যক মানুষ এটি ঘিরে রাখায় এয়ারপোর্টের স্বাগত সংবর্ধনায় পৌঁছতে ১২ মিনিট লেগে যায়। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তাঁকে স্বাগত জানান, ব্রিটিশ ডেপুটি হাইকমিশনার রে ব্রিটেন, রুশ কনসাল এবং অন্য কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

জনতার ভিড়ে তাঁর স্ত্রী এবং দুই পুত্রকে কিছু সময় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত একটি পুলিশ লরিতে তাঁকে রেসকোর্স নেয়া হয়। লরির উইন্ডস্ক্রিনে একটি বুলেটের ছিদ্র ছিল।

জনসভা শেষে তিনি তাঁর শহুরে বাড়িতে যান এবং সেখানে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আবেগময় পুনর্মিলন ঘটে। বন্ধুরা ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দেয়, তিনি তার দুই কন্যাকে আলিঙ্গন করেন।

তারপর তিনি তার ৯০ বছর বয়সী পিতার সামনে নতজানু হয়ে তাকে কদমবুসি করেন। ৮০ বছর বয়সী তাঁর মা যখন কক্ষে প্রবেশ করেন, তিনি তাঁকে আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেন এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন।

(১১ জানুয়ারি ১৯৭২, দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ লন্ডনে প্রকাশিত)

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সময়ের ব্যাপার মাত্র

নিউজউইকের তত্কালীন জ্যেষ্ঠ সম্পাদক আর্নড ডি বর্চগ্রেইভ ও ডেইলি টেলিগ্রাফের সাংবাদিক ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ ১৯৭১-এর অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে গোপালগঞ্জ সফর করেন এবং মুক্তবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের যুক্তিসঙ্গত বিশ্বাস জন্মে যে, বাংলাদেশের বিজয় ও স্বাধীনতা অর্জন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তখন ঢাকায় নিযুক্ত আমেরিকান কনসাল হার্বার্ট ডেনিয়েল স্পিভাক তাদের সঙ্গে আলাপ করে তার ভিত্তিতে ওয়াশিংটন ডিসিতে সেক্রেটারি অব স্টেটকে একটি দীর্ঘ ও গোপন টেলিগ্রাম পাঠান। দুজন সাংবাদিকই এখন প্রয়াত। বঙ্গানুবাদে সেই টেলিগ্রামটি:

আর্নড ডি বর্চগ্রেইভ ও ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ ৬ নভেম্বর ১৯৭১ ঢাকা ত্যাগ করেন। তারা ফরিদপুর শহরে আসেন। সেখানে মুক্তিবাহিনী পেট্রল পাম্প উড়িয়ে দেয়ায় জ্বালানি পাওয়া যায়নি। প্রথমে তারা জালিরপাড় যান এবং মিশনের পুরোহিতদের মাধ্যমে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মুক্তিবাহিনীর নেতা আব্দুল মান্নান মুক্তিবাহিনী অধিকৃত এলাকার বেসামরিক প্রশাসক, ৭৫ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি ইউনিটের কমান্ডার ক্যাপ্টেন কে এম শাজাহান দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে তাদের অপারেশন চালাচ্ছিলেন।

মান্নান লন্ডনের উইসডন কলেজে পড়াশোনা করেছেন। সংকট শুরুর আগে চট্টগ্রামে একটি অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করেন। শাজাহান ছিলেন কলেজছাত্র। মান্নান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যখন ভিয়েতনাম আক্রমণ করেছে, তার বিরোধিতা করেছি। যখন ভিয়েতনাম থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করার কথা বলেছেন, আমরা স্বাগত জানিয়েছি।’ মান্নান বলেন, মুক্তিবাহিনী মার্ক্সবাদী বাহিনী নয়। বাংলাদেশ কখনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হবে না। নকশালবাদীরা ক্ষমতায় তাদের ভাগ চাইবে কিন্তু সংখ্যায় তারা এত অল্প যে, বড় কোনো ভাগ তারা পাবে না। মান্নান আরো বলেন, আওয়ামী লীগের বিজয়কে সম্মান জানাতেই এই যুদ্ধ। মান্নানদের এই দলটি ছিল মুক্তিবাহিনীর সামরিক প্রশাসন।

বেসামরিক প্রশাসন প্রসঙ্গ: সেখানে তিনি আওয়ামী লীগের একটি আদালত চলতে তারা দেখেছেন। তিনি বললেন, টাকা-পয়সা না দিয়ে, মুক্তিবাহিনীর কোনো কোনো সদস্য খাবার নিয়ে যাচ্ছেন।

তাদের সঙ্গে গোপালগঞ্জ এলাকার কমান্ডার মেজর হেমায়েতের সঙ্গে দেখা হয় (গোপালগঞ্জ হেমায়েতের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে এ এলাকার গেরিলা নেতা হিসেবে মার্কিন কনসাল জেনারেলের কাছে বেশ পরিচিত)। এই ইউনিটের সদস্যসহ হেমায়েত বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা ১ হাজার ১০০। শাজাহানের দলের কাছে আছে স্টেনগান, গ্রেনেড, লি এনফিল্ড রাইফেল এবং একটি এলএমজি। কিন্তু দলটির গোলাবারুদের ঘাটতি রয়েছে। সম্প্রতি একটি লড়াইয়ে অংশ নেয়ায় এই ঘাটতি হয়েছে। তবে আশা করি, শিগগিরই ভারত থেকে এর সরবরাহ আসবে। এই ইউনিটের মর্টার নেই। বেতার যোগাযোগের যন্ত্রপাতি নেই। ঘোড়া কিংবা দেশী নৌকা ব্যবহার করে তারা খবর আদান-প্রদান করে থাকে। এই পদ্ধতিতে বার্তা পৌঁছাতে ২৪ ঘণ্টাও লেগে যায়।

মুক্তিবাহিনী নিজেদের লুকোনোর চেষ্টা না করে যেভাবে গ্রাম থেকে গ্রামে খোলামেলা চলাফেরা করছেন, তা দেখে তারা             অবাক হন। তাকে বলা হয়েছে, এলাকার মুক্তিবাহিনী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিষয়ে শঙ্কিত নয়। সেনাবাহিনী কদাচিৎ এদিকে আসে। সপ্তাহে একটি লঞ্চ আসে এবং তা প্রতিবার মুক্তিবাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়।

মুক্তিবাহিনী দাবি করে, তাদের সাম্প্রতিক লড়াইয়ে ১৯ পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে। প্রথমে খটকা লাগলেও পরে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে তারা সাম্প্রতিক লড়াই সম্পর্কে নিশ্চিত হন। এই লড়াইয়ের কারণে তাদের গোলাবারুদের ঘাটতি পড়েছে। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনীয়তার সঙ্গে মিশন হাসপাতালে চিকিত্সা করা হচ্ছিল।

পরে মুক্তিবাহিনীর নৌকায় সেই এলাকা ছেড়ে আসেন। সেখানে গেরিলারা তাদের পরিচয় গোপন করেননি বা করার চেষ্টা করেননি। তিনি যখন গেরিলা ক্যাম্প থেকে বিদায় নিচ্ছেন, তখন তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দুটি খাদ্যবাহী বজরায় আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে আলোচনা এবং পরিদর্শনের সময় জানা গেছে, আগামী মাসে ঢাকায় ছোট ছোট আক্রমণ পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে আক্রমণের সংখ্যা আগের চেয়ে বাড়ানো হবে। এ ধরনের লড়াইয়ে পাকিস্তান হেরে যাবে এবং পাকসেনাদের মাঠ থেকে প্রত্যাহার করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হবে। সৈন্যরা সেখানে ২৫ মার্চের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে প্ররোচিত হবে। তাতে পাকিস্তানিদের নির্মমতায় বিশ্বব্যাপী অসন্তোষের সৃষ্টি হবে। ফলে পাকিস্তান সরকার এর প্রতি বিদেশী সাহায্য দুর্বল হয়ে পড়বে। দ্রুত বিজয় অর্জনে ভারতীয় দিক থেকে চাপের পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে।

ফরিদপুর থেকে ফেরার পথে তারা মাত্র দুটি চেক পয়েন্টে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দেখা পান। প্রথম চেক পয়েন্টে যাদের পেয়েছেন, তাদের মনে হয়েছে চেক পয়েন্টের যন্ত্রপাতির সঙ্গে তারা পরিচিত নন। দ্বিতীয় চেক পয়েন্টের সেনাদের তার মনে হয়েছে মাতাল।

তারা ফরিদপুর জেলা প্রশাসনের সঙ্গে দেখা করেন। জেলা প্রশাসক তাকে খোলামেলাভাবে জানান তিনি মুক্তিকামীদের প্রতি সহানুভূতিশীল। তিনি বলেন, পাকিস্তানি সেনারা ফরিদপুর শহরে হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে কিন্তু কাদের হত্যা করা হচ্ছে, তিনি তা বলেননি। সব মিলিয়ে তারা বললেন, পাকিস্তান হেরে যাচ্ছে।

ঢাকায় ফিরে ডি বর্চগ্রেইভ জেনারেল নিয়াজির সঙ্গে দেখা করেন এবং এক ভোজে অংশ নেন। তার মনে হয়েছে, নিয়াজি প্রদেশ সম্পর্কে ভুল তথ্য জানেন। প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে তার ধারণা আছে বলে মনে হয়নি।

নিয়াজি এবং কুমিল্লায় নিযুক্ত ব্রিগেডিয়ার হাতিফের সঙ্গে আলোচনার পর ডি বর্চগ্রেইভের মনে হয়েছে, সাধারণভাবে বিপ্লবী রণকৌশল এবং বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে পাকিস্তানের ধারণা নেই। ডি বর্চগ্রেইভরা বিদ্রোহীদের বিজয়ের ব্যাপকতায় মুগ্ধ এবং তারা মনে করেন, বাংলাদেশের বিজয় সময়ের ব্যাপার মাত্র।

স্পিভাক লেখেন, আলোচনায় প্রাপ্ত তথ্য আমাদের ধারণাকেই নিশ্চিত করেছে যে, মুক্তিবাহিনীর কিছু ইউনিট কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। নিজস্ব সিদ্ধান্তের বদলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এমন উঁচুমানের বয়োজ্যেষ্ঠ সংবাদ প্রতিনিধি মনে করেন পাকিস্তান হাইকমান্ড মুক্তিবাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে সঠিক ধারণাই করতে পারছে না। এই বিবেচনা আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত। সত্যিকার অর্থে, পাকিস্তান যে কত নির্মমভাবে আমাদের ক্ষতি করে যাচ্ছে, তা যদি অনুধাবন করতে না পারে, তাহলে শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা স্পষ্টতই সংকুচিত হয়ে আসবে।