একাত্তরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর অবধি বাংলাদেশ ছিল বিশ্ব-গণমাধ্যমের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে এবং বহু সাংবাদিক নানাভাবে সংগ্রহ করেছেন সংবাদ। বিদেশী সাংবাদিকদের এমত ভিড়ে নারী সাংবাদিক ছিলেন মাত্র একজন, বয়সে তিনি প্রবীণ কিন্তু সংবাদ সংগ্রহে কারো থেকে পিছিয়ে নন। পুরুষশাসিত যুদ্ধ-সাংবাদিকতার পরিমণ্ডলে ব্যতিক্রমী এই নারী ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ, জন্ম ১৯১১ সালে। গত ১০ জানুয়ারি ১০৫ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সূচনাকাল থেকে সাংবাদিকতার সঙ্গে তিনি যুক্ত এবং জার্মানবাহিনীর পোল্যান্ড আক্রমণ তথা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনার স্কুপ নিউজ করে জগদ্বিখ্যাত হয়েছিলেন। সেটা অবশ্য ছিল সাংবাদিক হিসেবে তাঁর ভাগ্যের ফের, তিনি তখন পোল্যান্ডের সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করছিলেন এবং ভোরের প্রথম প্রহরে জার্মান সাঁজোয়া বহরের সীমান্ত পেরিয়ে পোল্যান্ড প্রবেশ অবলোকন করেন। পাকা ফলের মতো পোল্যান্ড খসে পড়েছিল জার্মানির ঝোলায়, বিশেষ কোনো প্রতিরোধ দাঁড় করানো ব্যতিরেকে। পরবর্তী সময়ে তাত্পর্যপূর্ণ সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সংবাদ পরিবেশন করে ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ ঠাঁই করে নিয়েছিলেন ইতিহাসে। সেটা ছিল ভাগ্যের ফের, তবে পরে আপন যোগ্যতা দ্বারা সাংবাদিকতার জগতে নিজের আসন দৃঢ়বদ্ধ করেন তিনি এবং বাংলাদেশ-বিষয়ক সংবাদ পরিবেশনায় বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দেন।
কাজটি যে মোটেই সহজ ছিল না, সেটা একাত্তরের বাস্তবতার দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারব। বিশ্বের সব প্রধান সংবাদপত্র তখন বাংলাদেশ-বিষয়ক খবরাখবর সংগ্রহের জন্য প্রবল প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। একই পত্রিকার একাধিক সংবাদদাতা ঘটনার বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে রিপোর্ট পাঠাতেন এবং তাদের নিজেদের মধ্যেও ছিল অলিখিত দ্বন্দ্ব— কে কীভাবে তাত্পর্যময় সংবাদ ও স্কুপ নিউজ সংগ্রহ করতে পারেন। ব্রিটিশ দৈনিক ডেইলি টেলিগ্রাফের পক্ষে তখন বিভিন্ন সময় উপমহাদেশে কর্মরত ছিলেন সাইমন ড্রিং, ডেভিড লোশাক, পিটার গিল ও ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ। এদের মধ্যে তুরুপের তাসটি খেলতে পারলেন সাইমন ড্রিং, ২৫ মার্চের গণহত্যা শুরুর পর পর সব বিদেশী সংবাদদাতাকে ঢাকা থেকে বহিষ্কার করে বিমানে তুলে দিলেও সাইমন ড্রিং নজর এড়িয়ে থেকে গিয়েছিলেন ঢাকায় এবং গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী রিপোর্ট তিনিই প্রথম করতে সমর্থ হন। ভাগ্যের শিকে সাইমন ড্রিংয়ের অনুকূলে ছিঁড়েছিল, ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ সুযোগ পেয়েছিলেন পরবর্তীকালে রিপোর্ট করার এবং তেমন নাটকীয় না হলেও তাত্পর্যময় অনেক রিপোর্ট তিনি করেছিলেন। ঘুরেছিলেন পাকিস্তান, ভারত এবং তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে, সাক্ষাৎ করেছিলেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান, ইন্দিরা গান্ধী ও সামরিক কর্তাব্যক্তিদের পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে। এপ্রিলের মধ্যভাগে তিনি ছিলেন করাচিতে, যেখানে পাকিস্তানি সমরকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করলেও পরিস্থিতির বিচারে পরিচয় দিয়েছিলেন বিচক্ষণতার; বলেছিলেন যে, বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে আরেকটি ভিয়েতনাম। তবে এটাও স্মরণ রাখা দরকার, ডেইলি টেলিগ্রাফ ছিল রক্ষণশীল দৈনিক এবং সম্পাদকীয় নীতিতে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার প্রতি তাদের বিশেষ আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। তবে বাস্তবতা-বিবর্জিতভাবে চলা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি এবং রিপোর্টারদের পাঠানো বাস্তবচিত্র পত্রিকার নীতি প্রভাবিত করেছিল। বেসামরিক ব্যবস্থা গ্রহণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ঘোষণাকে গুরুত্ব দিলেও পত্রিকা তাই মনে করেছিল— সেটা অর্জন সম্ভব হবে না।
জুনের শেষাশেষি পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ নির্বাচিত কতক বিদেশী সাংবাদিককে ঢাকায় আসার সুযোগ দেয় এবং সেনা-প্রহরায় তাদের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে দেখাতে চায় যে, পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ এবং সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, কেবল সীমান্ত এলাকায় কিছু হামলা ঘটাচ্ছে ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীরা। সেই সময়ে ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ প্রেরিত রিপোর্ট বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ঘুরলেও এমবেডেড জার্নালিস্ট তিনি হননি, বরং পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি গড়ে তুলতে পেরেছিলেন এবং ঢাকা-বিষয়ক রিপোর্টে লিখেছিলেন যে, ‘সেনাবাহিনী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেও ঢাকাবাসীর মধ্যে ভয় ও ঘৃণার পাশাপাশি এক ধরনের প্রচ্ছন্ন প্রতিরোধের মনোভাব কাজ করছে।’
অক্টোবরে আমরা দেখি গৌহাটি থেকে রিপোর্ট করছেন ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ এবং মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাদের মনোবল ও যুদ্ধ-প্রস্তুতির বিবরণ তিনি মেলে ধরেন। ভারত কেন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিচ্ছে না, সেটা নিয়ে গেরিলা যোদ্ধাদের উষ্মাও তিনি প্রকাশ করেন। এর পর দিল্লিতে এসে ভারতীয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে তিনি সবিস্তার রিপোর্ট করেন। রিপোর্টে তিনি জানান, শ্রীমতী গান্ধী মন্ত্রিসভার প্রবীণ সদস্য ও সেনাপ্রধানদের নিয়ে সভা করেছেন। সবার মতামত শোনার পর তিনি সংযত থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পরবর্তীকালে যেসব তথ্য জানা গেছে, তাতে বোঝা যায়— ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ ভেতরকার খবর ঠিকঠিকভাবে সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন।
৩ নভেম্বর ডেইলি টেলিগ্রাফে ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থের বিস্তারিত আরেক রিপোর্ট প্রকাশ হয়। তিনি ঢাকায় এসে বিভিন্ন স্থান সফর করেন, বরিশালের প্রত্যন্ত এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। নৌকাযোগে তাঁর এই মুক্ত এলাকা অভিযানে তিনি স্থানীয় ব্যাপ্টিস্ট চার্চের সহায়তা পেয়েছিলেন। তবে রিপোর্টে এত কিছুর উল্লেখ করেননি ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ, তথ্যসূত্র তিনি গোপন রেখেছিলেন, কেননা এর ফলে তাঁকে সাহায্যকারীরা বিপদগ্রস্ত হতে পারত, বরিশাল শহরের কাছাকাছি অবস্থানরত পাঁচ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার অবস্থান সম্পর্কেও ধারণা পেত পাকবাহিনী। ঢাকা থেকে পাঠানো এ রিপোর্টের শিরোনাম ছিল— ‘পূর্ব পাকিস্তানে গেরিলারা রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ শুরু করেছে।’ মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি সঞ্চয় ও বেপরোয়া আক্রমণের ছবি আঁকার পাশাপাশি তিনি পাকবাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর এ রিপোর্ট মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ প্রেরণামূলক হয়েছিল। প্রশ্ন উঠতে পারে, লন্ডনের দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত ইংরেজি সংবাদের কথা শহরে লুকিয়ে থাকা গেরিলা যোদ্ধা কিংবা দুর্গম অপিচ মুক্ত এলাকায় অবস্থানরত সদাসতর্ক মুক্তিযোদ্ধা কীভাবে জানতে পারবেন, আর কীভাবেই-বা তা দ্বারা অনুপ্রাণিত হবেন। লড়াইয়ের ময়দান কিংবা অবরুদ্ধ শহরে অথবা গ্রামগঞ্জে ব্যাপক মানুষের কাছে ব্রিটিশ সংবাদদাতাদের রিপোর্ট সম্পর্কে জানার প্রধান অবলম্বন হয়েছিল বিবিসি রেডিওর বাংলা ও ইংরেজি সংবাদভাষ্য। প্রায় প্রতিদিনই প্রচারিত হতো ‘প্রেস রাউন্ডআপ’ অথবা ‘রিভিউ অব দ্য ব্রিটিশ প্রেস অন পাকিস্তান’। রেডিও সম্প্রচার থেকে জানা যেত বিস্তারিত সংবাদ এবং তার প্রভাব ছিল ব্যাপক। ৩ নভেম্বর ১৯৭১, বিবিসির উইলিয়াম ক্রলি পেশ করেন পত্রপত্রিকার খবর। শুরুতেই জানান ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থের পাঠানো বার্তা। তিনি বলেন, ‘আজ সকালে ডেইলি টেলিগ্রাফে ঢাকা থেকে পাঠানো ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেছেন যে, এখন পূর্ব পাকিস্তানের ভেতরে লড়াই করছে ৪০ হাজার বাংলাদেশী গেরিলা যোদ্ধা। একজন পাকিস্তানি সেনাসদস্যের বক্তব্যের উদ্ধৃতি ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ দিয়েছেন। সেই সেনাসদস্য বলেছেন যে, গত দুই মাসে মুক্তিফৌজের প্রতি সমর্থন বিপুল জলোচ্ছ্বাসের মতো বৃদ্ধি পেয়ে দেশকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’ ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ বলেন যে, ‘গেরিলারা শহরে তাদের তত্পরতা বৃদ্ধি করছে এবং মার্চের পর এই প্রথম প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তায় সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘাত ঘটছে।’ একই রিপোর্টে ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ বরিশালের মুক্তিযোদ্ধা ঘাঁটির বর্ণনা দাখিল করেন। সেই রিপোর্টের বিবরণ রেডিওর সুবাদে যখন শুনেছে বাংলার মানুষ, তখন তাদের মনোবল কোন শিখর স্পর্শ করেছিল, তা আজ অনুমান করাও কঠিন। ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ ছিলেন তেমনি প্রেরণার উদগাতা সাংবাদিক।
১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১, ঢাকা থেকে প্রেরিত রিপোর্টে ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ লিখেছিলেন, ‘ঢাকার যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি, তবে ঢাকায় পাকবাহিনীর পরাজয় অবধারিত হয়ে গেছে।’ দুদিন পর ১৬ ডিসেম্বর তিনি রেসকোর্স ময়দানে পাকবাহিনীর আত্মসমপর্ণের সাক্ষী হয়েছেন। যিনি দেখেছিলেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সূচনা, তিনি আবার প্রত্যক্ষ করলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর পরাজয়। ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ঘড়ির কাঁটা যদি পিছিয়ে দেয়া যেত, তবে আপনি নিজেকে কোথায় নিয়ে যেতেন। তিনি বলেছিলেন যে, ‘আমি কাগজপত্র ঘেঁটে জানতে চাইতাম সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা কোনটি এবং যেতে চাইতাম সেখানে, কেননা ভালো রিপোর্ট করবার জন্য সেটাই সবচেয়ে উত্তম স্থান।’ ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মজীবনী ‘ফ্রন্টলাইন’, যুদ্ধ-সাংবাদিকের স্মৃতিভাষ্যের যোগ্য নামই বটে। উক্ত গ্রন্থে বরিশালে মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে যাওয়ার বিবরণ তিনি দিয়েছেন। কাজটি যেমন সহজ ছিল না, তেমনি ছিল ঝুঁকিপূর্ণও। কিন্তু যথার্থ যুদ্ধ-সংবাদদাতা হিসেবে বিপদবরণে কোনো দ্বিধা ছিল না ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থের, খবর সংগ্রহই ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় কর্তব্য।
ইতিহাসের দুই ঘটনার মেলবন্ধন রচিত হয়েছিল ব্যতিক্রমী এই নারী সাংবাদিকের কর্ম কৃতীর সুবাদে। ১০৫ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হয়েছেন হংকংয়ে, যেখানে তিনি ডেরা গেড়েছিলেন অবসর জীবনে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংবাদভাষ্য রচয়িতা হিসেবে তিনি আমাদের কাছে স্মরণীয় ও শ্রদ্ধেয় হয়ে রইবেন। আমার স্মৃতিতে আঁকা রয়েছে একাত্তরে চকিতে দেখা তাঁর এক ছবি। অবরুদ্ধ ঢাকায় কোনো এক দুপুরে ধানমন্ডির রাস্তায় তিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন বাহনের অপেক্ষায়, বেবিট্যাক্সি— হালের ভাষায় সিএনজি— নিয়ে যাবেন কোথাও। কোনো বাহন না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি হাঁটতে শুরু করলেন। বয়স্ক এই বিদেশিনী পোশাকে একবারে সাদাসিধে, হাঁটেন একটি পা টেনে টেনে। লাল কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচ দিয়ে নিদাঘের দুপুরে তাঁর সেই হাঁটার ছবি কীভাবে যেন মনে গেঁথে গেছে সবসময়ের জন্য। কে জানে কোথায় চলছিলেন তিনি, তবে এটা বুঝে প্রীত হওয়ার ছিল যে, বিদেশী সংবাদদাতা খবরের খোঁজে হাঁটছেন পথ এবং এই পথচলা থেকে তিনি নিশ্চয় জানবেন বাস্তব সত্য, আর সবার জন্য মেলে ধরবেন সেই সত্য ভাষ্য। একাত্তরে এমন কাজই করেছিলেন ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ। তাঁর প্রতি নিবেদন করি শ্রদ্ধার অর্ঘ্য।






