পির-দরবেশ, সন্তদের জীবনচরিত; জীবনী রচনার বিদ্যা পণ্ডিত মহলে হ্যাগিওগ্রাফি নামে পরিচিত। রিচার্ড এম ইটন মনে করেন, বাংলার ইতিহাসচর্চায় বিদ্যাচর্চার এ শাখাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তার কথায় এগুলো ‘সোশ্যালি কনস্ট্রাকটিভ টেক্সট’; কারো জীবন বর্ণনা করার সঙ্গে সঙ্গে এসব টেক্সটে প্রায়ই সংস্কৃতি, সামাজিক শ্রেণীবিন্যাস এবং রচয়িতা সমাজের বিশ্বদৃষ্টির হদিস পাওয়া যায়। এ কারণে কোনো একজন সন্তের একাধিক জীবনীতে যথেষ্ট ভিন্নতা পাওয়া যায়। এ ভিন্নতার কারণ সেগুলোর রচনার প্রেক্ষিত। ইটন এমন ঘটনার উদাহরণ হিসেবে বাংলার সবচেয়ে খ্যাতিমান দরবেশ হযরত শাহ জালাল মুজাররাদের (মৃত্যু: ১৩৪৬) জীবনীর দিকে নির্দেশ করেছেন।
ইটন লিখেছেন, হযরত শাহ জালালের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় মরক্কোর বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতার (মৃত্যু: ১৩৭৭) সূত্রে। ১৩৪৫ সালে ইবনে বতুতা সিলেটের কাছে এক পাহাড়ি গুহায় শায়খের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মরক্কোর এই পরিব্রাজক শাহ জালালকে বয়স্ক এক দরবেশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যিনি স্থানীয়দের কাছে তার নানা অলৌকিক ক্ষমতার জন্য সম্মানিত ছিলেন। ১৫১২-১৫১৩ সময়ের একটি খোদাইলিপিতে কেবল তাকে সম্মানিত সাধু হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত শাহ জালালের প্রথম জীবনী পাওয়া যায় এরও শত বছর পরে। এটি ছিল ভারতীয় সুফিদের জীবনী নিয়ে তৈরি একটি সংকলনে। ১৬১৩ সালের এই সংকলনটির নাম গুলজার-ই-আবরার। এটির সংকলক ছিলেন মোহাম্মদ গাউসি। এরই মধ্যে ভারতজুড়ে মোগল আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উত্তর ভারত থেকে বাংলা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে তাদের ঘোড়ার খুরের দাপট। বাংলার বদ্বীপে তখনই যথেষ্ট সংখ্যক কৃষিজীবী মুসলিম জনগোষ্ঠী তাদের অবস্থান তৈরি করেছেন।
ইটন লিখেছেন, বাংলার এই নতুন বাস্তবতা সেকালের জীবনীকারদের ওপরও প্রভাব ফেলেছিল। তারা অনেক সময়ই সামরিক বিজয়ের সঙ্গে ধর্মান্তরকে মিশিয়ে দিতেন। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা অতীতের কোনো পবিত্র পুরুষের চরিত্রকে যোদ্ধা-সন্ত হিসেবে উপস্থাপন করতেন। তিনি হয়ে উঠতেন সাহসী, দুর্ধর্ষ দরবেশ; এক হাতে তিনি পরাজিত করেছেন বিধর্মীদের, অন্য হাতে স্থানীয়দের জন্য নিয়ে এসেছেন ইসলাম ধর্ম।
গুলজার-ই-আবরারে হযরত শাহ জালালকে মধ্য এশিয়ার এক সুফি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যিনি বিধর্মীদের বিরুদ্ধে জিহাদ আল আসগর বা ছোট (সামরিক) পরিচালনার জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিলেন। তিনি তার পিরকে তাকে ভারতে প্রেরণ করতে রাজি করান। এরপর তিনি কয়েকশ সঙ্গীকে নিয়ে বাংলার পূর্বাঞ্চলের সিলেটে আগমন করেন। এই কয়েকশ গাজিকে নিয়ে তিনি স্থানীয় রাজা গৌড় গোবিন্দের এক লাখের সেনাদলকে পরাজিত করেন। যুদ্ধের ময়দানে গৌড় গোবিন্দের মৃত্যু হয়। শাহ জালাল রাজার জমি তার সঙ্গীদের মধ্যে বিতরণ করেন তত্ত্বাবধান করার জন্য।
ইটন দেখাচ্ছেন হযরত শাহ জালালের এমন সামরিক চিত্রায়ণের বিপরীত চিত্র পাওয়া যায় সুহেলে এমন গ্রন্থে। এটি রচিত হয়েছিল আরো অনেক পরে, ১৮৫৯ সালে। শাহ জালালের এ জীবনী রচনা করেন মৌলভি মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন হায়দার। নাসিরউদ্দিন লিখেছেন তিনি এ জীবনী লিখেছেন আগের দুটি পাণ্ডুলিপি অবলম্বন করে। এ দুটি পাণ্ডুলিপির অস্তিত্ব আজ বিলুপ্ত। এ দুটো পাণ্ডুলিপি ছিল রওজাতুস সালিহিন ও রিসালায়ে মুইনউদ্দিন খাদিম। বলা হয়, রওজাতুল সালিহিন সংকলিত হয়েছিল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে (১৬৫৮-১৭০৭)। রিসালা ইয়া মুইনউদ্দিন খাদিম রচিত হয় ১৭১৬ থেকে ১৭২৭-এর মধ্যে। তাই এটা অনুমান করা যায় যে সুহেলে এমন হচ্ছে সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে রচিত জীবনীগুলোর একটি পুনর্নির্মাণ। অর্থাৎ এ সময় হযরত শাহ জালালকে যে দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করা হয়েছিল তার নিদর্শন মিলবে সুহেলে এমনে। এ সময়ে বাংলায় মুসলিমরা কৃষিনির্ভর প্রভাবশালী সমাজ নির্মাণ করেন; বেশির ভাগ মুসলিম মূলত ধান চাষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ইটন এমন মূল্যায়ন টেনে বলছেন, ‘তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই যে এ টেক্সটে তাকে কৃষিনির্ভর দুনিয়ার চোখে দেখা হয়েছে।’ হযরত শাহ জালাল সিলেটে স্থায়ী হয়েছিলেন বিধর্মীদের কতল করার জন্য নয়, বরং সিলেটের মাটি ছিল ঠিকঠাক; এর মাটির গন্ধ, রস, রঙ মিলে গিয়েছিল তার আধ্যাত্মিক গুরুর দেয়া মাটির সঙ্গে। শাহ জালাল ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করার সময় তার গুরু তাকে এ মাটি দিয়েছিলেন। এখনো এ অঞ্চলের মুসলমানরা তাদের পূর্বপুুরুষদের মুসলিম হয়ে ওঠার ইতিহাসে শাহ জালালের সেই মাটির কাহিনীটিকে ঘনিষ্ঠ মনে করেন।
রিচার্ড ইটন দেখিয়েছেন, সুহেলে এমন আরো বেশকিছু বিষয়ে শাহ জালালের আগের জীবনীগুলোর চেয়ে ভিন্ন। মোগলরা ভারতে এসেছিলেন মধ্য এশিয়া থেকে। তাদের সংস্কৃতিকে অনুসরণ করতে গিয়ে গুলজার-ই আবরারে (১৬১৩) লেখা হয়েছে, হযরত শাহ জালাল তুর্কিস্তান থেকে বাংলায় এসেছিলেন। এতে আরো উল্লেখ আছে যে শায়খের আধ্যাত্মিক শিক্ষক ছিলেন আহমাদ ইয়েসেভি (মৃ. ১১৬৬), যিনি মধ্য এশীয় সুফি ঐতিহ্যের প্রতিষ্ঠাতা। অন্যদিকে সুহেলে এমন রচিত হয়েছে পরবর্তী সময়ে এবং তাতে দক্ষিণ এশিয়ার সেই সময়কার মুসলিম সমাজের প্রবণতাকে শনাক্ত করা যায়। এ সময় এখানকার মুসলমানরা মধ্য এশিয়ার পরিবর্তে তাদের উৎসভূমি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছেন। আর তাই সুহেলে এমনে শাহ জালালের জন্মভূমি তাই তুর্কিস্তান থেকে ইয়েমেনে পরিবর্তিত হয়েছিল। সুহেলে এমন অর্থ ‘ইয়েমেনের তারা’। ১৬১৩ সালের গুলজার-ই আবরারে দেখা গিয়েছিল সিলেটের হিন্দু রাজা গৌড় গোবিন্দকে হযরত শাহ জালাল উত্খাত করেছেন, যুদ্ধে গোবিন্দের মৃত্যুও হয়েছে। সুহেলে এমনে দেখা গেল গোবিন্দ বরং হযরত শাহ জালালকে সিলেটের প্রথম মসজিদ নির্মাণে সহায়তা করেছেন। অর্থাৎ গৌড় গোবিন্দ বাংলায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছেন। ইটন জীবনী বা ইতিহাসের এ রূপান্তরকে মূল্যায়ন করেছেন এভাবে, ‘...a prior Hindu cultutal
world is construed as connected to a subsequent Muslim world, and not
annihilated by that world.’
শানজিদ অর্ণব: লেখক ও অনুবাদক





