[১৮৬০ সালে ফার্সি ভাষায় প্রকাশিত হয় নাসিরউদ্দিন হায়দারের সুহেলে এমন। গ্রন্থটি এলাহাবাদ থেকে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তীকালে এ গ্রন্থের উর্দু অনুবাদ করেন মৌলভি মবশ্বির আলি চৌধুরী যা তারিখে জালালি  নামে প্রকাশিত। তারিখে জালালি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন মোস্তাক আহমাদ দীন। এ অনুবাদ গ্রন্থ উত্স প্রকাশন থেকে ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা অনুবাদক মোস্তাক আহমাদ দীন লিখেছেন, “বাংলা অনুবাদ যখন প্রকাশিত হচ্ছে উল্লেখ করা জরুরি, ‘তারিখে জালালি’ সুহেলে এমন-এর আক্ষরিক অনুবাদ মাত্র নয়। এ কথা ধারণা করা যায় যে, এই অনুবাদটি করতে গিয়ে মৌলভি মবশ্বির আলি চৌধুরী সুহেলে এমনকে অবলম্বন করেছেন ঠিকই, সেই সঙ্গে আরও কিছু নতুন তথ্যের সন্নিবেশও করেছেন। তিনি কিছু জায়গায় সুহেলে এমন-এর লেখকের ‘মত’-এর উদ্ধৃতি দিয়েছেন, তবে, এ বিষয়ে তাঁর ভূমিকায় কোনো মন্তব্য করেননি।” তারিখে জালালির নির্বাচিত অংশ এখানে সংকলিত হলো]

প্রথম অধ্যায়: শুরুতেই জানা উচিত, সুহেলে এমন  বইটি লেখক কীভাবে লিখেছিলেন এবং তার উৎস কী ছিল।

বইটি লেখার ক্ষেত্রে লেখক যে দুটি পুস্তিকার আশ্রয় নিয়েছেন তার একটির নাম রওজাতুস সালিহিন, তাতে শাহ জালালকেন্দ্রিক কিছু ঘটনার উল্লেখ ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। পুস্তিকাটি ১১২৮ হিজরিতে লিখিত হওয়ার তথ্যটি জানা গেলেও এর সংকলকের নাম কোথাও জানা যায়নি। এ-সম্পর্কে অনুমান করা হয় যে শাহ হামিদুদ্দিন নারনুভির বংশধরদের মধ্যে কেউ একজন এর সংকলক হতে পারেন। শাহ হামিদুদ্দিন নারনুভি হলেন হযরত শাহ জালালের সফরসঙ্গীদের একজন। দ্বিতীয় পুস্তিকাটির রচয়িতা মইনুদ্দিন খাদিম, তিনি ১২৩৪ হিজরিতে মুর্শিদাবাদের তত্কালীন নবাব জাফর আলি খান নাসিরের নির্দেশে সেটি রচনা করেন।

হযরত শাহ জালাল কবে সিলেট এসেছিলেন, এ নিয়ে মতভিন্নতা রয়েছে। সুহেলে এমন-এর লেখকের মতে, শাহ জালাল ৮৬১ হিজরিতে সিলেটের মাটিতে পা রাখেন, কিন্তু মি. হান্টারের তৈরি করা সরকারি নথিসহ অন্যান্য ইতিহাস-গ্রন্থ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী হযরত শাহ জালাল ৭৮৫ হিজরি মোতাবেক ১৩৬৭ খ্রিস্টাব্দে সিলেটে এসে পৌঁছান এবং গৌড়গোবিন্দের সঙ্গে লড়াই করে বিজয়ী হন।

ওই সময়ে সিলেটে কোন কোন ধর্মের অনুসারীরা থাকতেন, সে বিষয়েও কোনো ঐকমত্য ছিল না। কারো মতে, এখানে মুসলমানরা ছাড়া অন্য ধর্মের লোকেরাও শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করত; কারো মতে, শহরের পুবদিকে অবস্থিত টুলটিকরে মুসলমানদের একটিমাত্র ঘর ছিল যার স্বত্বাধিকারী ছিলেন বুরহানউদ্দিন আহমদ। কিন্তু এই উক্তিটি অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক বলে মনে হয়। কেননা এত বিধর্মীদের ভিড়ে একঘর মুসলমানের বসবাস অসম্ভব। তবে এ কথাটা এখন প্রতিষ্ঠিত যে হযরত শাহ জালালের পুণ্যপাদস্পর্শেই এই অঞ্চলে ইসলাম প্রসার লাভ করেছে এবং তা এতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল যে এ-সম্পর্কে বলা হয়: শাহ জালাল এখানে ইসলামের যে বীজ রোপণ করেছিলেন তা তাঁর এবং তাঁর সঙ্গীদের নিরন্তর জলবর্ষণেই প্রাণ পেল আর ক্রমশ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।

দ্বিতীয় অধ্যায়: হযরত শাহ জালাল মুজররদ এমনের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর বাবা মাহমুদ বিন মুহাম্মদ ছিলেন কোরায়শ বংশের এমন এক ব্যক্তি যাকে পিরদেরও পির বলে অভিহিত করা হতো। তিনি বিধর্মীদের সঙ্গে লড়াই করে শহীদ হন। মা ছিলেন সৈয়দ বংশের এক মহীয়সী নারী। শাহ জালালের বয়স তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর শাহ জালালের মামা আহমদ কবির তাঁকে নিজের কাছে নিয়ে লালন-পালন করেন। তিনি এমনভাবে ভাগ্নেকে বড় করে তুলতে চাইলেন যাতে তাঁর জাহিরি ও বাতিনি জ্ঞান গভীরতর স্তরে গিয়ে পৌঁছাতে পারে। কার্যত তা-ই ঘটল: ধীরে ধীরে তার অলৌকিক ক্ষমতা প্রকাশ পেতে শুরু করল।

আমরা জানি তাঁর নাম শাহ জালাল মুজররদ। নামের সঙ্গে যে ‘মুজররদ’ শব্দটি যুক্ত আছে, তার কারণ দুটো। প্রথম কারণ: তারই নামে আরো তিনজন বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন যেমন: শাহ জালাল বুখারি, শাহ জালাল তবরিজি এবং শাহ জালাল গনজরদান; দ্বিতীয় কারণ: তাঁর অবিবাহিত জীবন। জীবনে বিয়ে তো দূরের কথা তিনি একবার ছাড়া জীবনে কোনো স্ত্রীলোকের অবয়ব পর্যন্ত দেখেননি—সে বিষয় পরে আলোচিত হবে।

শাহ জালাল জন্মসূত্রে এমনের নাগরিক, তাই তাঁকে ‘এমনি’ বলে অভিহিত করা হয়। তাঁর পিরদের পরম্পরা এ রকম: তিনি তাঁর মামা সৈয়দ আহমদ কবির সোহরাওয়ার্দির কাছে শিষ্যত্ব বরণ করেন, সৈয়দ আহমদ কবির জালালউদ্দিন বুখারির কাছ থেকে, তিনি শেখ আবু ইনফেতাহ রুকনুদ্দিনের কাছ থেকে, তিনি শেখ আবুল ফজল সদরুদ্দিনের কাছ থেকে, তিনি শেখ মখদুম বাহাউদ্দিনের কাছ থেকে, তিনি শেখ শিহাবউদ্দিন সোহরাওয়ার্দির কাছ থেকে, তিনি আবু নাজিব জিয়াউদ্দিনের কাছ থেকে, তিনি শেখ ওয়াজিহুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির কাছ থেকে, তিনি শেখ আহমদ দিনওরির কাছ থেকে, তিনি শেখ ওমুয়ির কাছ থেকে, তিনি শেখ মমশাদ নূরির কাছ থেকে, তিনি শেখ সিররি সিকতির কাছ থেকে, তিনি শেখ মারুফ কারখির কাছ থেকে, তিনি শেখ দাউদ তায়ির কাছ থেকে, তিনি শেখ হাবিব আজমির কাছ থেকে, তিনি শেখ হাসান বসরির কাছ থেকে, তিনি হযরত আলি কাররামাল্লাহু ওয়াজহুর কাছ থেকে এবং হযরত আলি শেষ নবী হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর কাছ থেকে কুতাড়না থেকে মুক্তির পথ আর আত্মশুদ্ধি অর্জনের মূলমন্ত্র শিখে নেন। আল্লাহ এই পবিত্র নামের বদৌলতে আমাদের সবসময় ইসলামের ওপর আস্থাশীল রাখুন:

হে আমাদের প্রভু, এই সম্মানিত ব্যক্তিদের আশীর্বাদে

তুমি আমাদের সুন্দর সাবলীল মৃত্যু দান করো।

চতুর্থ অধ্যায়: কথিত রয়েছে সৈয়দ আহমদ কবির সোহরাওয়ার্দি ঘরের ভেতর থেকে একমুঠো মাটি নিয়ে এসে শাহ জালালের হাতে দিয়ে বললেন, ভারতবর্ষের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ো এবং যে মাটির সঙ্গে এই মাটির রূপ-রস-গন্ধের সাদৃশ্য খুঁজে পাবে সেখানে এই মাটি ছড়িয়ে দিয়ে আস্তানা গাড়বে।

শাহ জালাল তাঁর পিরের কথা অনুযায়ী হাজি ইউসুফ ও হাজি খলিলসহ আরো কিছু শিষ্য নিয়ে ভারতবর্ষের দিকে রওয়ানা হলেন। প্রথমে তাঁর নিজ বাসভূম এমনে এসে পৌঁছলেন। এমনের রাজা যে কিনা দুষ্কৃতকারীদের খুব পছন্দ করত আর সদাচারীদের অপছন্দ করত সেই রাজা যখন শাহ জালালের আগমন-সংবাদ শুনল তখন তার মাথায় দুষ্টবুদ্ধি খেলতে থাকল। সে তার পার্ষদদের ডেকে নিয়ে বলল, আমার মনের মধ্যে কোনো এক যুগশ্রেষ্ঠ ব্যক্তির শিষ্যত্ব বরণের খায়েশ জেগেছে, আমি চাই আমার সবকিছু তার পদসেবায় নিয়োগ করি, তবে তার আগে তিনি যে যুগশ্রেষ্ঠ তার প্রমাণ আমাকে পেতে হবে, প্রমাণিত হলে তো  কথাই নেই, তবে অপ্রমাণিত হলে তার মৃত্যু অনিবার্য।

অবশেষে রাজা দূতের মাধ্যমে যাচাইয়ের জন্যে বিষমিশ্রিত এক পেয়ালা শরবত শাহ জালালের কাছে পাঠাল। দূত তাঁর বিষয়ে ভালোই জানত, তাই সে শাহ জালালের দরবারে এসে সবিনয়ে কদমবুসি করে রাজার পক্ষ থেকে সালাম ও মুসাফিরের প্রতি তার উষ্ণ শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করে এক পেয়ালা শরবত পেশ করে জানাল যে রাজা আপনার দর্শন-কামনার পাশাপাশি আপনার কাছে বয়েত গ্রহণের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন। আপনার ইজাজত পেলে রাজা নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করবেন।

কিন্তু শাহ জালাল তো মানবমনের অনেক গোপন সংবাদ জানতেন, তাই তিনি রাজার প্ররোচনাপূর্ণ নিবেদন আর গোপন অভিসন্ধির কথা বুঝতে পারলেন। তিনি মুখে উচ্চারণ করলেন ‘মান আমালা সালিহান ওয়ামান আছাআ ফাআলাইকা’।

বললেন, ‘রাজা যা পাঠিয়েছেন তা একজন অতিথি এবং অতিথি-সত্কারকারী উভয়ের জন্যেই সম্মানজনক, কিন্তু রাজার যা মতলব তা তো তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে’; তারপর শাহ জালাল নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করলেন এবং নিঃশঙ্ক চিত্তে শরবত পান করতে থাকলেন আর ওইদিকে রাজা তখন যন্ত্রণায় কাতরাতে-কাতরাতে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে থাকল।

পঞ্চম অধ্যায়: এমনের রাজার মৃত্যুর পর তার ছেলে শেখ আলি তার স্থলাভিষিক্ত হয়। কথিত আছে শেখ আলির প্রশস্ত ললাটে সৌভাগ্যের তারকাচিহ্ন জ্বলজ্বল করত।

এই শেখ আলি হযরত শাহ জালালের গুণ ও কামালতির পরিচয় পেয়ে তাঁর শিষ্যত্ব বরণ করেন এবং রাজত্ব ছেড়ে তাঁর সফরসঙ্গী হওয়ার মনের বাসনা ব্যক্ত করলেন। শাহ জালাল তাকে বোঝাতে চাইলেন যে তুমি তোমার জায়গায় বসে এমন রাজ্যে সত্য ও ন্যায়ের আলো জ্বালিয়ে দাও এবং গরিবের প্রতি একজন নিষ্ঠাবান রাজার যে দায়িত্ব, তা পালন করো, কারণ এতেই রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি। শেখ আলি শাহ জালালের সব উপদেশ নীরবে শুনলেন ঠিকই কিন্তু পরমুহূর্তে করজোড়ে আবারো তার সঙ্গী হওয়ার জন্যে মিনতি প্রকাশ করলেন। শাহ জালাল আর না করতে পারলেন না। তাঁর পির আহমদ কবির যে মাটি তাঁকে দিয়েছিলেন, যে মাটি খিজিরের পথের চিহ্নায়কও বটে, সেই মাটি শেখ আলির হাতে দিয়ে বললেন: আমরা যখন যেখানে গিয়ে পৌঁছাব, সেখানকার মাটির সঙ্গে এই মাটির রূপ-রস-গন্ধ তোমাকে মিলিয়ে দেখতে হবে, এটাই হলো তোমার কাজ। শেখ আলিকে জিহ্বা দিয়ে চুষে মাটি নিরীক্ষণ করতে হতো, সে কারণে আজও তাকে চাষনির পির নামে অভিহিত করা হয়। একেই বলে প্রেমিক যিনি কিনা রাজত্বের এত লোভনীয় আকর্ষণ ত্যাগ করে শাহ জালালের প্রতি এতটাই অনুরক্তি প্রকাশ করেন যে যথোচিত অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শাহ জালাল তাঁকে তাঁর ভক্ত ও সফরসঙ্গীদের তালিকায় গ্রহণ না করে পারলেন না।

ষষ্ঠ অধ্যায়: শাহ জালাল যখন দিল্লিতে পৌঁছান তখন সেখানে একজন বিখ্যাত পির ছিলেন বলে জানা যায়, তবে তাঁর নাম কী ছিল তা নিশ্চিত করে জানা যায় না। কারো কারো মতে সেই পিরের নাম নিজাম উদ্দিন, যিনি দিল্লির রাজারও পির ছিলেন। শাহ জালাল সেখানে পৌঁছার পর সেই পিরের এক শিষ্য তাঁকে গিয়ে বলল: এক অভিজাত যুবক এই শহরে এসে পৌঁছেছেন, তার ভাবগতি দেখে মনে হয় তিনি আরবেরই কোনো দরবেশ হবেন। তার সম্পর্কে বলার কোনো ভাষা আমার জানা নেই, তিনি কুমার অথচ এমনই পরহেজগার যে পথচলাকালে তার মুখ-চোখ নেকাবে ঢাকা থাকে আর যখন ঘরে যান, তখন পরির মতো সুন্দর দাড়ি-গোঁফ-না-ওঠা এক যুবকের দিকে তাকিয়ে থাকেন! মইনুদ্দিন খাদিম জানান, শাহ জালাল সম্পর্কে তাঁর শিষ্যের এমন শ্লেষাত্মক মন্তব্য শুনে তিনি মুরাকাবায় বসলেন এবং ওই আচরণের মর্মার্থ অনুধাবন করে শিষ্যকে শাস্তি দিলেন।

এ-প্রসঙ্গে রওজাতুস সালিহিন-এর লেখক একটি অনুঘটনার উল্লেখ করেছেন। তাঁর কথায়, দিল্লির পির নিজাম উদ্দিন তার শিষ্যের মন্তব্যের মতলব বুঝতে পেরে তা গোপন রেখে আরো দুজন শিষ্যকে শাহ জালালের খেদমতে পাঠালেন। শিষ্য শাহ জালালের কাছে পৌঁছল, শাহ জালাল একটি কৌটার মধ্যে কিছু তুলো আর তার মধ্যে জ্বলন্ত আঙরাখা রেখে সেটি লাগিয়ে দিলেন এবং শিষ্যের মারফত নিজাম উদ্দিনের কাছে পাঠালেন।

সুহেলে এমন-এর লেখক তাঁর টীকার মধ্যে এর মর্মার্থ এভাবে করেছেন যে জ্বলন্ত আঙরাখা দ্বারা শাহ জাদার রূপলাবণ্য, তুলো দ্বারা নিজেকে আর জ্বলন্ত আঙরাখা সত্ত্বেও তুলোর না-পোড়ার মাধ্যমে এই জায়গায় তাঁর অবস্থানের দৃঢ়তার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। নিজাম উদ্দিন যখন কৌটা খুলে দেখলেন, জ্বলন্ত আঙরাখা সত্ত্বেও তুলো পুড়ছে না, তখন তিনি উপলব্ধি করতে পারলেন শাহাজালাল প্রকৃত অর্থেই একজন দরবেশ। সঙ্গে সঙ্গে শিষ্যের অহেতুক সন্দেহের জন্যে সংকোচ বোধ করতে থাকলেন। এরপর ছাই রঙের এক জোড়া কবুতর তাঁকে উপহার পাঠিয়ে নিমন্ত্রণ জানালেন। শাহ জালালের মাজারে কবুতর উড়তে দেখা যায়, তা ওই দুটি কবুতরেরই বংশধর, যা এখন জালালি কবুতর নামে খ্যাত।

চতুর্দশ অধ্যায়: হযরত শাহ জালাল তাঁর ত্রিশ বছর বয়সে সিলেটে শুভাগমন করেন এবং আরো ত্রিশ বছর এখন যেখানে মাজার রয়েছে সেখানে এমন একটি ঘরে থাকেন যার দৈর্ঘ্য ছিল আড়াই হাত আর প্রস্থ ছিল মাত্র দুই হাত।

এরপর তাঁর বয়স যখন বাষট্টি যা হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর বয়সের চেয়ে মাত্র এক বছর কম সময় ২০ জিলকদ জুমার রাতে তিনি ইন্তেকাল করেন।

শাহ জালালের সিলেট আগমনের তারিখটি নিয়ে যে রকম মতভিন্নতা রয়েছে যা এর আগে প্রথম অধ্যায়ে উল্লিখিত হয়েছে সে রকম তাঁর ইন্তেকালের তারিখ নিয়েও রয়েছে। সুহেলে এমন-এর লেখকের মতে, হজরতের মৃত্যু তারিখ হলো ৮৯১ হিজরি, তবে মৌলভি আবদুল গফুর (ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, ঢাকা) তার একটি পদে মিস্টার হান্টার-কৃত তোয়ারিখে নায়ছ-এর সরকারি রিপোর্ট-এ ছাড়া আরো কিছু বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর মৃত্যু সাল হলো ৮১৫ হিজরি মোতাবেক ১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দ।

পঞ্চদশ অধ্যায়: সুহেলে এমন-এর লেখক লিখেছেন, আমি একটি গ্রন্থে নাসির উদ্দিনের মৃত্যুর বর্ণনা পাঠ করেছি এবং সৈয়দ খাদিম হুসাইন যিনি ছিলেন তাঁরই বংশধরদের মধ্যে একজন, তাঁর মুখ থেকে শুনেছি একদিন নাসির উদ্দিন হযরত শাহ জালালের খেদমতে এসে বললেন: ‘আমি নিজে স্বপ্নে মুসতাআন নামের পবিত্র জিকির অসংখ্যবার পাঠ করেছি, তাই আমার ধারণা আমার মৃত্যু নিকটবর্তী।’

অতঃপর নাসির উদ্দিন মৃত্যুর আগে তাঁর বন্ধুদের কাছে অসিয়ত করলেন: ‘যখন আমি মরে যাব তখন আমার লাশ আদিনা মসজিদের সামনে নিয়ে যেয়ো এবং আমার জানাজা শেষ করে সকলেই আপনাপন মুখ জানাজার উল্টো দিকে ফিরিয়ে নিয়ো। তাহলে ‘মুসতাআন’ নামক জিকিরের প্রভাব এ তাত্পর্য উপলব্ধি করতে পারবে।’

এরপর আরো কিছুদিন অতিক্রান্ত হলো। নাসির উদ্দিন পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। তার অসিয়ত মতো সবকিছুই করা হলো। জানাজার পরে উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে ফের যখন লাশের দিকে মুখ ফেরানো হলো, দেখা গেল শবাধারটি শূন্য—মৃতদেহ নেই। পরে এই শবাধারটিকেই পীরমহল্লার সেই স্থানে সমাহিত করা হয়, যে স্থানটিকে এখন মাজার-জ্ঞান করা হয়।

সুহেলে এমন-এর লেখক আকল কূপের একটি ঘটনা, যা এই পীরমহল্লায় ঘটেছিল বলে উল্লেখ করেছেন। নাসির উদ্দিনের বংশধর শাহ আহমদ নামক এক ব্যক্তি ছিলেন। সৈয়দ শাহ আলী নামক তার একটি পুত্রসন্তান ছিল যে কিনা সবসময় ঘোরাঘুরি আর শিকারের মধ্য দিয়ে সময় কাটাত। জ্ঞান অর্জনের প্রতি তার কোনো রকমের স্পৃহা ছিল না। তার পিতার নিরন্তর শাসন, উপদেশ, তার মতিগতি ফেরাতে পারল না। অগত্যা শাহ আহমদ ছেলের প্রতি ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে একদিন তার হাত-পা শিকল দিয়ে বেঁধে তাকে গৃহবন্দি করে রাখলেন।

একসময় রাত নেমে এল। ছেলেটি স্বপ্নে দেখল, রাসুল (সা.) তার ঘরে ঢুকে বলছেন, ‘হে বালক, তুমি কেমন আছ?’ সে তার অবস্থা সবিশদ বর্ণনা করে তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করল। রাসুল তার কথা শুনে তার প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করলেন এবং তাঁর পবিত্র হাত দিয়ে হাত-পায়ের শিকল খুলে দিয়ে নিজের মুখের পবিত্র লালা তার মুখে লাগিয়ে দিলেন।

ভোরে শাহ আহমদ যখন ঘরের দরজা খুলে দেখলেন, শাহ আলীর হাত-পায়ের বাঁধন খোলা আর সে অনবরত কোরান মজিদের আয়াত পাঠ করে যাচ্ছে এবং তার মুখ থেকে লালা প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি ছেলের এই অবস্থা দেখে তাকে কোলে নিলেন এবং তার এই অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। শাহ আলী তার স্বপ্নের কথা তাকে জানাল। তা শুনে শাহ আহমদ কৃতজ্ঞতাস্বরূপ হজরতের আত্মার প্রতি দরুদ পাঠ করলেন। তিনি ভাবলেন, তার মুখনিঃসৃত লালা যদি মাটিতে পড়ে যায় তাহলে রাসুলের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখানো হবে; তাই তিনি সেখানে একটি কূপ খনন করলেন আর সেই লালা সেখানেই ঢেলে দিলেন।

কথিত আছে, এই কূপের মাহাত্ম্য এমন ছিল যে যে ব্যক্তি এই কূপের পানি পান করত তার বুদ্ধিমত্তা বেড়ে যেত। সেজন্য এই কূপের নাম আকল কুয়া নামে বিখ্যাত হয়ে ওঠে।

উল্লেখ্য, এই কূপটির পানি প্রতি জুমার রাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উছলে উঠত কিন্তু যেদিন থেকে এক দুষ্ট প্রকৃতির লোক এই কূপে তার হাত ডুবাল সেদিন থেকেই তা বন্ধ হয়ে যায়।