সম্প্রতি নিজেদের মাঠে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শেষ ষোলোর প্রথম লেগে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদের কাছে ২-৫ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছে ইংলিশ জায়ান্ট লিভারপুল। এই হারের পর ইয়ুর্গেন ক্লোপের দলের মিশন শেষ দেখছেন অনেকে। কিন্তু দলটির নাম লিভারপুল বলেই তাদের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা একেবারে বাতিল করে দেয়া বোকামিই হতে পারে। অতীতেও রূপকথার মতো ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প আছে ছয়বারের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নদের। 

ক্লোপের শিষ্যদের জন্য কাজটি যে কঠিন তা মানতেই হবে। কেননা মাত্র পাঁচবার অ্যাওয়ে দলের প্রথম লেগের গোল ঘাটতি কাটিয়ে জয়ের নজির আছে। ২০২১-২২ মৌসুম থেকে অ্যাওয়ে গোলের নিয়মটিও বিলুপ্ত হয়েছে। 

অবশ্য স্বাগতিক দলের প্রত্যাবর্তনের একাধিক নজির আছে, যদিও এর মধ্যে মাত্র একবার চার গোলের ও তিনবার তিন গোলের ঘাটতি কাটিয়ে উঠে জয়ের নজির আছে। 

চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ঘরের মাঠে স্মরণীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প:

চার গোলের ঘাটতি

পিএসজি ৪-০ বার্সেলোনা

বার্সেলোনা ৬-১ পিএসজি

(শেষ ষোলো, ২০১৬-১৭ মৌসুম)

২০১৬-১৭ মৌসুমে শেষ ষোলোর ম্যাচে পিএসজির মাঠে ৪-০ গোলে হেরে আসা বার্সেলোনাকে নিয়ে কেউ আশা করেছিল? হয়তো না। কিন্তু অসম্ভব কথাটি যে শুধু বোকার অভিধানেই লেখা থাকে, সেটি প্রমাণ করে দিল কাতালানরা। ন্যু ক্যাম্পে পরের লেগে প্রতিপক্ষকে তারা বিধ্বস্ত করল ৬-১ গোলে। ৩-০ গোলের লিড নেয়া বার্সা একটি গোল হজম করলে জয়ের জন্য তাদের করার প্রয়োজন পড়ে ৬ গোল! সেটিও করে ছাড়ল স্প্যানিশ জায়ান্টরা। যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে সের্জি রবার্তো গোল করে অবিস্মরণীয় এক সাফল্য এনে দেন বার্সাকে। ৬-৫ গোলের অগ্রগামিতায় কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে কাতালানরা।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এ প্রথম চার গোলের ঘাটতি কাটিয়ে উঠে জয় পেল কোনো দল। আর উয়েফার ক্লাব প্রতিযোগিতা এটি চতুর্থ নজির। ম্যাচটি এতটাই আলোচনার জন্ম দেয় যে এটির নাম রাখা হয় ‘‌দ্য রেমোনতাদা (দ্য কামব্যাক)। 

তিন গোলের ঘাটতি

বার্সেলোনা ৩-০ লিভারপুল

লিভারপুল ৪-০ বার্সেলোনা

(সেমিফাইনাল, ২০১৮-১৯ মৌসুম)

এবার শিকার বার্সা। ২০১৯ সালের সেমিফাইনালে বার্সার মাঠে ৩-০ গোলে হেরেও অ্যানফিল্ডে পরের লেগে ৪-০ গোলের অবিস্মরণীয় জয় পায় ইয়ুর্গেন ক্লোপের লিভারপুল। মেসির ডাবলে ৩-০ গোলের জয়ে ফাইনালে এক পা দিয়েই রাখে বার্সেলোনা। ন্যু ক্যাম্পে বিধ্বস্ত লিভারপুল পরের লেগে যেন আরো অসহায় যেন। দলসেরা মোহাম্মদ সালাহ ও রবার্তো ফিরমিনো খেলেননি। তবু তারকাসমৃদ্ধ বার্সাকে মাটিতে নামায় তারা। ডিভোক ওরিগির গোল আশা জাগায় লিভারপুল। এরপর জর্জিনহো ভিনালদামের ডাবলে উন্মাতাল হয় অ্যানফিল্ড। শেষ মুহূর্তে ওরিগি করেন লিভারপুলের জয়সূচক গোল। 

জয় শেষে লিভারপুল অধিনায়ক জর্ডান হেন্ডারসন বলছিলেন, ‘‌ড্রেসিংরুমে আমাদের সবার মধ্যে বিশ্বাস্য ছিল, কিছু একটা আমরা করতে পারব।’ 

চার বছর আগের সেই মহাকাব্যিক জয় থেকে এবার নিশ্চিতভাবেই প্রেরণা খুঁজবে অল রেডরা। যদিও সেবার দ্বিতীয় লেগ হয়েছিল অ্যানফিল্ডে, আর এবার দ্বিতীয় লেগ রিয়াল মাদ্রিদের ডেরায়। তাছাড়া বার্সার মতো অযথাই পা হড়কানোর অভ্যাস রিয়ালের কমই দেখা গেছে। সব মিলিয়ে এবার লিভারপুলের রূপকথা লেখা কঠিনই মনে হচ্ছে। আর যদি লিভারপুল এ বাধা টপকাতে পারে, তবে সেটি হবে ফুটবল ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা ঘটনা। 

তিন গোলের ঘাটতি

বার্সেলোনা ৪-১ রোমা

রোমা ৩-০ বার্সেলোনা

(কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০১৭-১৮ মৌসুম)

পরাক্রমশালী বার্সার মাঠে ৪-১ গোলে হেরে আসার পর রোমার সমর্থকরাও হয়তো প্রত্যাবর্তনের কথা ভাবেননি। কিন্তু সেটিই হলো। ষষ্ঠ মিনিটে এডিন জেকোর গোলে লিড নেয় রোমানরা। বিশ্বাস ক্রমেই বাড়তে থাকে স্বাগতিক দলটির। ৫৮ মিনিটে ড্যানিয়েল ডি রসি ও ৮২ মিনিটে কোস্টাস মানোলাস গোল করে হৃদয় ভাঙেন মেসি, ইনিয়েস্তাদের।  

ম্যাচটি দুই লেগ শেষে ৪-৪ গোলে অমীমাংসিত থাকলে বার্সার মাঠে করা একটি অ্যাওয়ে গোলের বিচারে সেমিফাইনালের টিকিট পায় রোমা। ১৯৮৪ সালের পর ইউরোপিয়ান শীর্ষ প্রতিযোগিতার সেমিফাইনালে নাম লেখায় রোমানরা। 

তিন গোলের ঘাটতি

এসি মিলান ৪-১ লা করুনা

লা করুনা ৪-০ এসি মিলান

(কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০০৩-০৪ মৌসুম)

তখনকার পরাশক্তি এসি মিলানের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগ সামনে রেখে স্প্যানিশ দল দেপোর্তিভো লা করুনার কোচ হাভিয়ের ইরুরেতা বলছিলেন, ‘‌অলৌকিক ঘটনা সব সময় হয় না, এমনটি যুক্তিসংগতভাবে আপনি আশা করতে পারেন না।’

কিন্তু দুই লেগ শেষে তার দল ঠিকই অঘটন ঘটিয়ে দেয়। প্রথম লেগে স্যান সিরোয় আগে গোল করলেও শেষ পর্যন্ত ৪-১ গোলের পরাজয় নিয়ে দেশে ফেরে লা করুনা। এরপর ঘটল অবিশ্বাস্য ঘটনা। লা করুনার মাঠে দ্বিতীয় লেগে ৪-০ গোলে পরাজিত হলো ইউরোপের হেভিওয়েট এসি মিলান। গোল করলেন ওয়ালটার পানদিয়ানি, হুয়ান কার্লোস ভেলেরন, আলবার্ট লুক ও ফ্রান গঞ্জালেজ।   

এছাড়া অ্যাওয়েতে প্রথম লেগে দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও জয়ের নজির আছে জুভেন্টাস, রিয়াল মাদ্রিদ, বায়ার্ন মিউনিখ, চেলসি (দুবার), ম্যানইউ, বার্সেলোনা (দুবার) ও মোনাকোর। 

অ্যাওয়ে দলের প্রত্যাবর্তন

দুই গোলে ঘাটতি

(ম্যানইউ ০-২ পিএসজি; পিএসজি ১-৩ ম্যানইউ; ২০১৮-১৯)।  

এক গোলে ঘাটতি:

(টটেনহাম ০-১ আয়াক্স; আয়াক্স ২-৩ টটেনহাম; ২০১৮-১৯), (আয়াক্স ১-২ রিয়াল মাদ্রিদ; আয়াক্স ১-৪ রিয়াল মাদ্রিদ; ২০১৮-১৯), ইন্টার মিলান ০-১ বায়ার্ন মিউনিখ, বায়ার্ন মিউনিখ ২-৩ ইন্টার মিলান; ২০১০-১১), (আয়াক্স ০-১ প্যানাথিনাইকোস; প্যানাথিনাইকোস ০-৩ আয়াক্স; ১৯৯৫-৯৬)।