উইমেন্স সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ বিজয়ী পাহাড়ের তিন বীর কন্যা ঋতুপর্ণা চাকমা, রূপনা চাকমা ও মনিকা চাকমাকে রাঙ্গামাটিতে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে। গতকাল সকালে রাঙ্গামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে বর্ণাঢ্য মোটর শোভাযাত্রা শুরু হয়ে রাঙ্গামাটি জেলা শহরের ভেদভেদী-আসামবস্তি-তবলছড়ি-দোয়েল চত্বর-বনরূপার প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে রাঙ্গামাটি চিং হ্লা মং চৌধুরী মারী স্টেডিয়ামে গিয়ে শোভাযাত্রাটি শেষ হয়। পরে সেখানে কৃতী ফুটবলারদের বরণ এবং সংবর্ধনা প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি জেলা প্রশাসন মূলত আয়োজন করলেও সহযোগিতায় রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, সেনাবাহিনীর রাঙ্গামাটি রিজিয়ন, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ ও জেলা পুলিশ। এবারের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিন কৃতী ফুটবলার ছাড়াও রয়েছেন ফুটবল প্রশিক্ষক ও ফিফা রেফারি জয়া চাকমা, ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চন্দ্রা দেওয়ান, মঘাছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বীরসেন চাকমা, ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয় বালিকা ফুটবল দলের কোচ শান্তিমনি চাকমা, বর্মাছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ধারশ মনি চাকমা, চেলাছড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নলিনী মোহন চাকমা ও ফুটবল কোচ সুইহ্লামং মারমা।

এ সময় তিন কৃতী ফুটবলারকে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিজনকে ১ লাখ টাকা করে মোট ৩ লাখ টাকার চেক ও সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া রাঙ্গামাটি রিজিয়ন ও রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের পক্ষ থেকেও প্রতিজনকে ১ লাখ টাকা, রাঙ্গামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রতিজনকে ৫০ হাজার টাকা করে মোট ৩ লাখ টাকার চেক ও সম্মাননা স্মারক দেয়া হয়েছে। এছাড়া জেলা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বড়ুয়া কল্যাণ সংস্থা এবং অন্যান্য ব্যক্তি ও সংস্থা থেকে সম্মাননা স্মারক দেয়া হয়েছে।

সংবর্ধনা শেষে নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন ঋতুপর্ণা ও মনিকা চাকমা। এ সময় সাফের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জয় করা ঋতুপর্ণা চাকমা বলেন, ‘এ বিজয় একসঙ্গে উদযাপন করতে পারতেছি, এটা আমাদের জন্য বড় পাওয়া। আমরা তিনজনে সত্যিই আনন্দিত ও গর্বিত। সবাই আমাদের এভাবে ভালোবেসে সাপোর্ট দিয়ে পাশে থাকবেন যেন এর থেকে আরো বড় বড় বিজয় দেশবাসীকে উপহার দিতে পারি।’

জাতীয় দলের কৃতী মিডফিল্ডার মনিকা চাকমা বলেন, ‘যখন ভালো কোনো অর্জন দেশবাসীকে উপহার দিতে পারি, আমাদের অনেক ভালো লাগে এবং আমরাও দেশবাসীর অনেক সাপোর্ট ও ভালোবাসা পাই। আমরা সবসময় চেষ্টা করি দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনার। আমরা চাই আরো সামনে এগ্রিয়ে যাব, আপনারা সবাই আমাদের জন্য আশীর্বাদ করবেন ও পাশে থাকবেন। সবাই পাশে থাকলে আমরা সবসময় সফল হব।’

রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খান বলেন, ‘আজকে জেলা প্রশাসন, রাঙ্গামাটি রিজিয়ন, জেলা পরিষদ, জেলা পুলিশ, অন্যান্য সংস্থাসহ গণসংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছে। কৃতী তিন ফুটবলারকে সংবর্ধনা দিতে পেরে আমরা আনন্দিত। তারা রাঙ্গামাটির গর্ব ও অহংকার। তাদের বেশকিছু অসুবিধার বিষয় আমরা জেনেছি, আমরা চেষ্টা করব তাদের সমস্যাগুলো সমাধান করার।’

এ সময় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খান, সেনাবাহিনীর রাঙ্গামাটি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শওকত ওসমান, জেলা পুলিশ সুপার ড. এসএম ফরহাদ হোসেন, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার, জেলা সিভিল সার্জন ডা. নূয়েন খীসা, সাবেক জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড় বরুণ বিকাশ দেওয়ান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান, জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপুসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

গত ৩০ অক্টোবর নেপালের কাঠমান্ডুর দশরথ স্টেডিয়ামে নেপালকে ২-১ গোলে হারিয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের মুকুট ধরে রাখে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। ফাইনাল ম্যাচে দেশের হয়ে আলো ছড়ান পাহাড়ের বীর কন্যারা। নেপালের গোলবারে যে দুটি বল গেছে, তার দুটোই দিয়েছেন পাহাড়ের বীর কন্যা মনিকা চাকমা ও ঋতুপর্ণা চাকমা। খেলায় সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন রাঙ্গামাটির কন্যা ঋতুপর্ণা চাকমা এবং টুর্নামেন্টের সেরা গোলরক্ষক হয়েছেন রূপনা চাকমা।

পাহাড়ের মেয়ে ঋতুপর্ণা চাকমার গ্রামের বাড়ি রাঙ্গামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের দুর্গম মঘাছড়ি গ্রামে। রূপনা চাকমার বাড়ি রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের ভূঁইয়াদাম গ্রামে। আর মনিকা চাকমার বাড়ি খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার লক্ষ্মীছড়ি ইউনিয়নের সুমান্ত পাড়ায়।

গত ৩০ অক্টোবর টানা দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়নশিপের মুকুট ধরে রাখায় ৩১ অক্টোবর পাহাড়ের কন্যাদের রাঙ্গামাটিবাসীর পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেয়ার ঘোষণা দেয় জেলা প্রশাসন। এর আগে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ বিজয়ী হওয়ায় ২৯ সেপ্টেম্বর সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল।