বাংলাদেশ-শ্রীলংকা ওয়ানডে দ্বৈরথ মানেই শ্রীলংকার আধিপত্য। চলতি সিরিজের আগে ৫৪টি ওয়ানডে ম্যাচে মুখোমুখি হয় দুই দল। এর মধ্যে লংকানরা ৪৩টি ও বাংলাদেশ ১১টি জিতেছে। তারা কতটা কর্তৃত্ব করেছে তা বোঝা যাবে একটি পরিসংখ্যান থেকে—সর্বোচ্চ তিনটি দলীয় সংগ্রহই শ্রীলংকার গড়া, বিপরীতে ছয়টি সর্বনিম্ন দলীয় সংগ্রহ বাংলাদেশের নামের পাশে! নয়টি সিরিজের মধ্যে লংকানরা জিতেছে ছয়টি, বাংলাদেশ জিতেছে মাত্র একটি।

অবশ্য আগের চেয়ে দুই দলের শক্তির তফাতটা কমে এসেছে। চট্টগ্রামে চলতি সিরিজেই যেমন দুই ম্যাচ শেষে ফল ১-১। নাজমুল হোসেন শান্তর সেঞ্চুরিতে প্রথম ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ, পাথুম নিশাঙ্কার সেঞ্চুরিতে দ্বিতীয় ম্যাচ জিতে নেয় অতিথিরা। আগামীকাল সিরিজ মীমাংসার ম্যাচ। কাল কি দ্বিতীয়বারের মতো শ্রীলংকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের উৎসব করতে পারবে বাংলাদেশ?

এবার তিনটি ওয়ানডে ম্যাচই হচ্ছে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে। চট্টগ্রামে দুই দলের প্রথম দেখা ২০০৬ সালে। সেই ম্যাচে বাংলাদেশকে ৭৮ রানে হারায় সিংহলিজরা। তারপর এবারই প্রথম বন্দরনগরীতে ওয়ানডে খেলছে দুই দল। সমুদ্র-তীরবর্তী এ ভেন্যুতে লংকানরা এখন এগিয়ে ২-১-এ। 

চিরাচরিতভাবে ঘরের মাঠে ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশ ভালো করে এসেছে। যদিও এবার সেই গৌরব ম্লান হতে পারে, যদি না কাল শেষ ম্যাচে জিতে যায় টাইগাররা। ২০২৩ সালে আফগানিস্তান ও নিউজিল্যান্ডের কাছে টানা দুটি হোম সিরিজ হেরেছে বাংলাদেশ। এবার লংকানদের সঙ্গেও না পারলে ২০১১ সালের পর টানা তিনটি ওয়ানডে সিরিজে পরাজয়ের গ্লানি পাবে বাংলাদেশ দল। কাল তাই শান্ত-তাসকিনদের জন্য অস্তিত্ব রক্ষারও লড়াই। 

উপমহাদেশের দুই ক্রিকেট জাতির ওয়ানডে দ্বৈরথে লংকানরা অনেক অনেক এগিয়ে। এশিয়া কাপ, বিশ্বকাপ ও অন্যান্য আসর বাদে দুই দেশ এখন পর্যন্ত ৯টি দ্বিপক্ষীয় ওয়ানডে সিরিজে মুখোমুখি হয়েছে, যার মধ্যে শ্রীলংকা ৬টি ও বাংলাদেশ মাত্র ১টি সিরিজ জিততে সমর্থ হয়েছে, আর টাইগাররা জিতেছে দুই দলের সর্বশেষ সিরিজটা। ২০২১ সালে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে তিন ম্যাচের সিরিজে ২-১-এ জয়লাভ করে স্বাগতিকরা। এবার হোম সিরিজটা জিতে নেয়ার দারুণ সুযোগ এসেছিল স্বাগতিকদের সামনে। প্রথম ম্যাচ জিতে নেয়ায় টানা দুটি সুযোগ তৈরি হয় শান্তদের। যদিও দ্বিতীয় ম্যাচে পাথুম নিশাঙ্কা ও চারিথ আসালঙ্কার অনবদ্য ব্যাটিংয়ে হার মানে বাংলাদেশ। কাল কি একুশের স্মৃতি ফিরবে, নাকি লংকানদেরই রাজত্ব অব্যাহত থাকবে? 

ছিয়ানব্বইয়ের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা বাংলাদেশের ওপর কর্তৃত্ব করে এসেছে। পাঁচটি তিন ম্যাচের সিরিজে বাংলাদেশকে হোয়াইটওয়াশ করেছে তারা। এবার বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচটি জিতে নেয়ায় হোয়াইটওয়াশের সুযোগ আর নেই। তবে সিরিজ জয়ের সুযোগ অতিথিদের এখনো আছে।

বাংলাদেশের মাটিতে তিনটি ওয়ানডে সিরিজে মুখোমুখি হয়েছে টাইগার ও সিংহলিজরা। এ তিন সিরিজের মধ্যে শ্রীলংকা দুটি ও বাংলাদেশ একটি জিতেছে। ২০১৪ সালে মিরপুরে তিন ম্যাচের সবগুলোয় হেরেছে টাইগাররা। 

এখন পর্যন্ত শ্রীলংকার সঙ্গে নিজেদের মাঠে মোট ২২টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে টাইগাররা জিতেছে ৭টি, হার ১৫টি। এই ২২ ম্যাচের মধ্যে মাত্র তিনটি হয়েছে চট্টগ্রামে। ২০০৬ সালে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রথম ম্যাচে কুমার সাঙ্গাকারার সেঞ্চুরিতে (১০৯) বাংলাদেশ হেরেছিল ৭৮ রানের ব্যবধানে। ১৮ বছর পর এবার চট্টগ্রামে ওয়ানডে খেলছে সিংহলিজরা।

বাংলাদেশ-লংকা ওয়ানডে দ্বৈরথে দলীয় কর্তৃত্বের পাশাপাশি ব্যক্তিগত নৈপুণ্যেও এগিয়ে দ্বীপদেশটির খেলোয়াড়রা। দ্বৈরথে সবচেয়ে বেশি রান করেছেন শ্রীলংকার কুমার সাঙ্গাকারা (৩১ ম্যাচে ১২০৬)। এর পরই বাংলাদেশের মুশফিকুর রহিম (৩৮ ম্যাচে ১১৭০)। অবশ্য কাল ৩৭ রান করলেই সবচেয়ে বেশি রানের মালিক হবেন মুশফিক। চলতি সিরিজের প্রথম ম্যাচে তিনি করেছেন ৭৩ রান, দ্বিতীয়টিতে তার ব্যাট থেকে আসে ২৫ রান। সর্বোচ্চ ইনিংস খেলায়ও দুই নম্বরে মুশফিক। ২০১৮ সালে দুবাইয়ে ১৪৪ রানের ইনিংস খেলার কৃতিত্ব আছে তার। এ দ্বৈরথে সর্বোচ্চ ১৬১ রানের ইনিংস খেলার গৌরব শ্রীলংকার তিলকারত্ন দিলশানের।

উইকেট শিকারেও আধিপত্য লংকানদের। সর্বোচ্চ ৩১ উইকেট শিকার করেছেন মুত্তিয়া মুরালিধরণ। ২৭ উইকেট নিয়ে তার পরেই আছেন লাসিথ মালিঙ্গা। তিন ও চারে যথাক্রমে বাংলাদেশের মাশরাফি বিন মর্তুজা (২৬) ও রুবেল হোসেন (২৩)। সেরা বোলিংয়ের তিনটি ফিগারই লংকানদের। ২৫ রানে ৬ উইকেট শিকার করে লংকান ফাস্ট বোলার চামিন্ডা ভাস এক নম্বরে। এরপর দুশমন্ত চামিরা (৫/১৬), মুরালিধরণ (৫/৩১), আব্দুর রাজ্জাক (৫/৬২), সনাথ জয়সুরিয়া (৪/১৪)।

শুক্রবার নিশাঙ্কা ও আসালঙ্কার ১৮৫ রানের জুটি এই দুই দেশের দ্বৈরথে পঞ্চম সেরা। এর ওপরের চারটিও লংকানদের। সর্বোচ্চ ২১৫ রানের জুটির রেকর্ডটি উপুল থারাঙ্গা ও মাহেলা জয়াবর্ধনের। সর্বোচ্চ ছয়টি জুটির রেকর্ডটা শ্রীলংকার। সপ্তম সেরা জুটিটি বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান ও নাজমুল হোসেন শান্তর (১৬৯)। এর পরই গত বুধবার চট্টগ্রামে শান্ত ও মুশফিকুর রহিমের করা ১৬৫ রানের জুটি।