ক্ষমতা-আধিপত্য কখনোই চিরস্থায়ী নয়। কথাটির বাস্তব উদাহরণ কিংবদন্তি বিরাট কোহলি। ২০০৮ সালে ভারতের জার্সিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখেন ১৯ বছর বয়সী এ তরুণ। ব্যাটের জোর খাটিয়ে ক্রিকেট সালতানাতের সুলতানের আসনে বসতেও বেশ সময় নেননি দিল্লী থেকে উঠে আসা এই ক্রিকেটার। গত এক দশক ধরে বিরাটের ‘বিরাট’ অর্জন দেখেছে ক্রিকেট বিশ্ব। কিন্তু সবকিছুর যেমন শুরু আছে, শেষও আছে। যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যে যেতেই হবে। তাতে হারাতে হয় যৌবনের শক্তিমত্তা। ক্রিকেট ক্যারিয়ারেরও যৌবন আর বৃদ্ধ বয়স আছে। ৩৩ বছর ১৩৮ দিন বয়সী কোহলিকে এখনো বৃদ্ধ বলা যাবে না; কিন্তু তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার ধীরে ধীরে শেষের দিকে এগোচ্ছে। ব্যাটের বয়স বৃদ্ধে উপনীত হচ্ছে।
অভিষেকের পর এক দশক আইসিসির তিন সংস্করণ- টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি র্যাংকিংয়ের শীর্ষস্থানে ছিল ‘বিরাট আধিপত্য’। এ আধিপত্য টিকে থাকে এক দশক। বিশ্বের একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে তিন ফরম্যাটে একসঙ্গে শীর্ষে ওঠার রেকর্ডও গড়েন তিনি। ২০২০ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে ‘বিরাট’ সম্রাজ্যের ক্ষমতা হারাতে থাকেন। ২০০৮ সালে আন্তর্জাতিক (ওডিআই) ক্রিকেটে অভিষেকের পর ২০১০ সালে প্রথমবার আইসিসির ওডিআই র্যাংকিংয়ে সেরা দশে ঢুকেন কোহলি। ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১০ বছরের বেশি সময়ে শীর্ষস্থান কিংবা দুই নম্বর থেকে ওয়ানডে র্যাংকিংয়ের নিচে নামেননি কোহলি। ২০১৩ সালে প্রথম শীর্ষে ওঠেন। ২০১৫ ও ২০১৬ তে কিছু সময় এবি ডি ভিলয়ার্সের কাছে ক্ষমতা হারান। ২০১৭ সাল থেকে আবার বিরাটের একক আধিপত্য। বর্তমান শীর্ষ ব্যাটার বাবর আজমের আগে টানা ৪১ মাস (প্রায় সাড়ে তিন বছর) ওয়ানডে ব্যাটারদের র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে ছিলেন বিরাট কোহলি। ২০২১ সালে এসে শীর্ষস্থান হারান তিনি। গত বছরের এপ্রিলে কোহলির সেই আসন দখলে নেন পাকিস্তানের অধিনায়ক বাবর আজম। আসন হারিয়ে কোহলি এখন দুই নম্বরে আছেন।
২০১০ সালে টি-টোয়েন্টিতে অভিষেকের পর ২০১২ সালে র্যাংকিংয়ে পাঁচে আসেন বিরাট। পরের বছরই ২০ ওভারের ফরম্যাটেও তাকে এক নম্বরে দেখা যায়। এরপর ২০১৭ সাল পর্যন্ত সেখানেও একক আধিপত্য দেখান কিং কোহলি। পরের বছর বাবরের কাছে তিনি ক্ষমতা হারান। এর পর চলছে বাবরের যুগ। মাঝে ডেভিড মালান কিছু দিন শীর্ষে থাকলেও বাবর আবার তা কেড়ে নেন। অপর দিকে বিরাট কোহলি এখন টি-টোয়েন্টি র্যাংকিংয়ের সেরা ১৬তম ব্যাটার। ১০ বছর পর প্রথমবার শীর্ষ দশের বাইরে গেলেন ভারতের সাবেক অধিনায়ক।
২০১১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ক্রিকেটের অভিজাত সংস্করণ টেস্টে অভিষেক হয় বিরাটের। ২০১৪ সালের শুরুতে সাদা পোশাকে র্যাংকিংয়ের শীর্ষ দশে (৯) ঢুকে পড়েন তিনি। ২০১৬ থেকে ২০২০ পর্যন্ত শীর্ষস্থান এবং দুই নম্বরের নিচে নামেননি কোহলি। পরে স্টিভেন স্মিথ, জো রুট ও মার্নাস লাবুশানের কাছে শীর্ষস্থান হারাতে হয় তাকে। বর্তমানে শীর্ষে আছেন অজি ব্যাটার লাবুশানে। কোহলি আছেন ৯ নম্বরে। বাবর আজম আছেন ৮ নম্বরে। র্যাংকিংয়ে তিন ফরম্যাটেই বাবরের পরে বিরাটের অবস্থান।
একটা সময় ক্রিকেট বিশ্লেষকরা বলেছেন, স্বদেশী শচীন টেন্ডুলকারের রেকর্ডগুলো হুমকির মুখে কোহলির কাছে। ব্যাট হাতে মাঠে নামলেই রানের ফুলঝুরি ছুটিয়ে সেঞ্চুরি-হাফসেঞ্চুরি করা যার স্বভাব। সেই বিরাট কোহলি কি-না আড়াই বছরে ধরে ভুগছেন সেঞ্চুরি খরায়। সবশেষ ২০১৯ সালের ২২ নভেম্বর সেঞ্চুরি করেছিলেন বিরাট। টেস্টে কলকাতার ইডেন গার্ডেনে বাংলাদেশের বিপক্ষে ১৩৬ রানের ইনিংস ছিল সেটি। এরপর টেস্টে ৩০ ইনিংস ব্যাট করেছেন, নেই কোনো শতক।
ওয়ানডেতে বিরাট সবশেষ সেঞ্চুরি পেয়েছেন আড়াই বছরেরও বেশি সময় আগে। ২০১৯ সালের ১৪ আগস্ট পোর্ট অব স্পেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে করেছিলেন অপরাজিত ১১৪ রান। এরমধ্যে খেলেছেন ২১টি একদিনের ম্যাচ। টি-টোয়েন্টিতে অবশ্য বিরাটের কোনো সেঞ্চুরি আগেও ছিল না।
এত দীর্ঘ সময় সেঞ্চুরি খরা
কখনো ছিল না বিরাটের ক্যারিয়ারে। তবে ২০১৪ সালে ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর মাস
পর্যন্ত টানা ২৫ ইনিংসে সেঞ্চুরি করতে পারেননি বিরাট।
অথচ ২০১৯ সালের নভেম্বর
পর্যন্ত বিরাট কোহলি সব ফরম্যাট মিলিয়ে ৭০টি সেঞ্চুরি করেছিলেন। যেভাবে বিরাট ধেয়ে
আসছিলেন মনে হচ্ছিল,
কিংবদন্তী শচীন টেন্ডুলকারের সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি রেকর্ডও হুমকির
মুখে। ৩৩ বছর বয়সী বিরাট কোহলি কি পারবেন তার সেই শীর্ষস্থানে ফিরে যেতে? নাকি বয়সের সঙ্গে ধীরে ধীরে তার সাম্রাজ্য থেকে অনেক দূরে হারিয়ে যাবেন?










