লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দ্বৈরথ ভেঙে নতুন কেউ যে তাদের স্থান দখল করবে তা অনুমেয়ই ছিল। কিন্তু তাদের সেরা সময়ে নতুন বিশ্বসেরা, এমনটা হয়তো কেউ ভাবেননি। সে প্রথা-ই ভেঙে দেন ক্রোয়েশিয়া তারকা লুকা মদ্রিচ। 

সেন্টার মিডফিল্ডারের ভূমিকায় খেলা ফুটবলার লুকা মদ্রিচ নিজের দেশকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন ২০১৮ বিশ্বকাপের ফাইনালে। অপ্রতিরুদ্ধ ফ্রান্সের সঙ্গে অবশ্য শেষ মুহূর্তে আর পেরে ওঠেননি। তবে ওই আসরে সেরার মুকুট লুকাই পরেছিলেন। 

তারকা হওয়ার আগে লুকা মদ্রিচের জীবন কিন্তু খুব মসৃণ ছিল না। ১৯৮৫ সালে যুগোস্লাভিয়ার ভেলবেট পাহাড়ের এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম তার। ১৯৯১ সালে ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে সবাইকে পালাতে হয় নিজ গ্রাম ছেড়ে। এরপর সবার বাড়ি পুড়িয়ে দেয় সার্ব-বিপ্লবীরা। সেখান থেকে পালিয়ে লুকাদের পরিবার আশ্রয় নেয় জাদার শহরের শরণার্থী শিবিরে। সেখানেই সাত বছর থেকেছেন লুকা মদ্রিচরা। ওখান থেকেই ফুটবলের যাত্রা শুরু তার।

কাতার বিশ্বকাপে দেশের জার্সিতে শেষবার খেলবেন ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়ক লুকা মদ্রিচ। মেসি, রোনালদো, নেইমার, এমবাপেদের সঙ্গে আছেন তারকার আসনেই। 

চেলসি তারকা ভিক্টর মোজেজ। বাবা-মা দুজনই খুন হন নাইজেরিয়ার এক দাঙ্গায়। কোনোক্রমে যুক্তরাজ্যে পালিয়ে যান মোজেজ। ঠাঁই ব্রিটেনের শরণার্থী শিবিরে। ক্রিস্টাল প্যালেসে বিখ্যাত হন মোজেজ। পরের সিজনেই তাকে কিনে নেয় চেলসি। খেলেছেন বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে। আর নিজের দেশ নাইজেরিয়ার হয়ে খেলেন ২০১৪ ও ২০১৮ বিশ্বকাপ। যদিও নিজের সেরাটা দিতে না পারায় রাশিয়া বিশ্বকাপের পরপরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন মোজেজ। দল অবশ্য তাকে ছাড়েনি। নিজেও ফিরেছেন প্রকৃত ঈগল হয়েই। গ্রুপ পর্বের ম্যাচে দ্রুতগামী মোজেজ কিন্তু এবার ঘুম ছোটাতে পারেন মেসিদের।

এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার ফ্রান্সের মাঝমাঠে ভরসার নাম এদুয়ার্দো সেলমি ক্যামাভিঙ্গা। মাত্র দুবছর বয়সে কঙ্গো থেকে অ্যাঙ্গোলা হয়ে তার ফ্রান্স আসার গল্পটা অনেকটা রূপকথার মতোই। রিফুইজি ক্যাম্পে থেকে ফ্রান্সেই ফুটবলার হয়ে ওঠা। দলের সবচেয়ে কমবয়সী এ তারকা স্পেনের পেশাদার ফুটবল লিগের শীর্ষ স্তর লা লিগার ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে খেলেন। ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়া পোগবার বদলি হিসেবেই ভাবা হচ্ছে ২০ বছরের ক্যামাভিঙ্গাকে।

অস্ট্রেলিয়া দলে উইং দিয়ে দৌড়ে কোনো কালো মানুষ নিখুঁত ক্রস তুলছেন মানেই তিনি আওয়ের বুল মাবিল। কেনিয়ার কাকুমা শরণার্থী শিবিরে জন্মানো এ ফুটবলার অজিদের হয়ে বিশ্বকাপে আসছেন তারকা হতে। দক্ষিণ সুদানে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে মাবিলের বাবা-মা পালিয়ে আসেন কেনিয়ায়। সেখানে গিয়ে তারা আশ্রয় নেন কাকুমা শরণার্থী শিবিরে। তার এক বছর পর কোলজুড়ে আসে মাবিল। কয়েক বছর ওখানে থাকার পরে পরিবারটি চলে আসে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে। তারপরেরটা ইতিহাস।  যে কিনা একদিন প্লাস্টিক মুড়িয়ে বল তৈরি করে কাকুমা ক্যাম্পে শুরু করেছিলেন ফুটবল খেলা। 

এশিয়ান অঞ্চল থেকে বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়া অস্ট্রেলিয়ার আরো এক উইঙ্গার গ্যারাং কুওল আর তার পরিবার সুদান থেকে পালিয়েছিল মিশরে। সেখান থেকে কুওলের বাবা পাড়ি দেন অস্ট্রেলিয়ায়। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে অভিষেক হলে গারাংই হবেন অস্ট্রেলিয়ার সর্বকনিষ্ট খেলোয়াড়। বর্তমানে তার বয়স কেবল ১৮ বছর। 

লাইবেরিয়ার গৃহযুদ্ধে দেশ থেকে পালিয়ে ঘানার শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয় রিয়াল তারকা আলফানসো ডেভিসের পরিবার। সেখানেই জন্ম হয় আলফানসোর। পরে তার বাবা-মা চলে যান কানাডায়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে রিয়ালের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়, তারপর আঠারোয় বিশ্বকাপের আঙিনায়। স্বাভাবিকভাবেই ডেভিসকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছে কানাডা।