গত অক্টোবরে স্পেনের মালাগায় ডেভিস কাপে নেদারল্যান্ডসের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে বিদায় নেয় স্পেন। স্পেনের পরাজয় ছাপিয়ে এ রাতে বড় হয়ে ওঠে রাফায়েল নাদালের বিদায়ের ঘটনা। টেনিস ইতিহাসের অন্যতম সেরা এ অ্যাথলিটের ২৩ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সমাপ্তিরেখা টেনে দিল ম্যাচটি। স্পেনের গোটা ক্রীড়াঙ্গন আর বিশ্ব টেনিসে বিরাট এক শূন্যতা তৈরি করে বিদায় নিলেন ‘ম্যাটাডোর’। সেই সঙ্গে টেনিসের কিংবদন্তিতুল্য ‘বিগ থ্রি’র লড়াইও শেষ হয়ে গেল। রজার ফেদেরার ২০২২ সালে ও নাদাল ২০২৪ সালে অবসর নেয়ায় এখন টিকে আছেন শুধু নোভাক জোকোভিচ। সার্বিয়ান সুপারস্টার দুই পরাশক্তির অনুপস্থিতিতে লড়াইয়ে আগের সেই ঝাঁজ কি অনুভব করবেন?

ইতিহাসের সেরা ‘ত্রয়ী’ ফেদেরার, নাদাল আর জোকোভিচ গত ২০ বছর এটিপি টেনিস ট্যুরে কর্তৃত্ব করে এসেছেন। তিনজন মোট ৬৬টি গ্র্যান্ড স্লাম জিতেছেন। জোকোভিচ অবশ্য এখনই থামছেন না। কাজেই ‘বিগ থ্রি’র নামের পাশে আরো গ্র্যান্ড স্লাম শিরোপা জমা হতেই পারে।

বিগ থ্রির মধ্যে হেড-টু-হেডে কে সেরা কিংবা গ্র্যান্ড স্লামে তাদের মধ্যে হেড-টু-হেডে কে এগিয়ে এবং কোনো নিদিষ্ট কোর্টে কে সেরা?

দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে জয়ে এগিয়ে রয়েছেন জোকোভিচ। যদিও সম্মিলিত জয়ের হার নাদালেরই বেশি। জোকোভিচ ও ফেদেরারের বিপক্ষে তার জয়-পরাজয় ৫৩-৪৭, অর্থাৎ ৫৩ শতাংশ। জোকোভিচের সঙ্গে জয়-পরাজয়ের রেকর্ড ২৯-৩১ হলেও ফেদেরারের সঙ্গে ২৪-১৬ ব্যবধানে এগিয়ে স্প্যানিশ তারকা।

জোকোভিচ দুই গ্রেটের বিপক্ষে ৫২.৭ শতাংশ জিতেছেন। ৫৮ জয়ের বিপরীতে হার ৫২টি। দুজনের সঙ্গে ফাইনালে ২৮ জয়ের বিপরীতে হেরেছেন ১৯ বার।

জোকোভিচের সঙ্গে লড়াইয়ে ফেদেরার ২৩টি জিতেছেন, হেরেছেন ২৭টি ম্যাচে এবং নাদালের সঙ্গে ২৪টি হারের বিপরীতে জয় পান ১৬টি। জয়ের হার ৪৩.৩ শতাংশ। দুই বড় প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে ২৭টি ফাইনাল হেরেছেন সুইস গ্রেট, জিতেছেন ১৬টি।

তিন গ্রেটের সবচেয়ে বেশি লড়াই হয়েছে গ্র্যান্ড স্লামেই। অস্ট্রেলিয়ান ওপেন, ফ্রেঞ্চ ওপেন, উইম্বলডন ও ইউএস ওপেনে মোট ৪৯ বার মুখোমুখি হন তারা। এর মধ্যে গ্র্যান্ড স্লাম ফাইনালে মুখোমুখি হন ২৩ বার। এসব ফাইনালের মধ্যে কোনোটি ছিল আবার মহাকাব্যিক। যেমন ২০০৮ সালে নাদাল ও ফেদেরারের মধ্যকার উইম্বলডন ফাইনাল, ২০১২ সালে নাদাল ও জোকোভিচের অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ফাইনাল, ৫ ঘণ্টা ৫৩ মিনিটের লড়াইটা কিনা গ্র্যান্ড স্লাম ইতিহাসেরই দীর্ঘতম।

বিগ থ্রির মধ্যে গ্র্যান্ড স্লাম জয়ের হার নাদালেরই বেশি। তিনি ৬৬ শতাংশ জয় পেয়েছেন। মূলত ফ্রেঞ্চ ওপেনের জয় দিয়েই তিনি এগিয়ে রয়েছেন। রোলাঁ গারোঁয় ফেদেরারের সঙ্গে ৮-২ ও নাদালের সঙ্গে ৬-০তে এগিয়ে তিনি। জোকোভিচ ও ফেদেরারের বিপক্ষে গ্র্যান্ড স্লাম ফাইনালে ২১ জয়ের বিপরীতে ১১টি হেরেছেন নাদাল।

এরপর ৫১ শতাংশ জয় পেয়েছেন জোকোভিচ। নাদাল ও ফেদেরারের সঙ্গে গ্র্যান্ড স্লাম ফাইনালে ৮ জয়ের বিপরীতে তিনি হেরেছেন ৬টিতে।

গ্র্যান্ড স্লামে ব্রিগ থ্রির লড়াইয়ে জোকোভিচের রেকর্ড অবশ্য উজ্জ্বল নয়। তিনি ১০ জয়ের বিপরীতে হেরেছেন ৩১টি এবং জোকোভিচ ও নাদালের কাছে ১৪ ফাইনালের মধ্যে ১০টিতে হেরেছেন। বিগ থ্রিকে ২০০৬ ও ২০০৭ সালের উইম্বলডন, ২০০৭ সালের ইউএস ওপেন ও ২০১৭ সালের অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ফাইনালেই শুধু হারাতে পেরেছেন তিনি।

তিন কিংবদন্তির একে অন্যের সঙ্গে এ মহাকাব্যিক লড়াই আর দেখা যাবে না। দুজন অবসরে। ৩৭ বছর বয়সী জোকোভিচও খুব বেশিদিন হয়তো খেলবেন না। মার্গারেট কোর্টের ২৫ গ্র্যান্ড স্লাম জয়ের রেকর্ডটা ভাঙতে পারলেই হয়তো টেনিসকে বিদায় বলে দেবেন সার্বিয়ান গ্রেট।

২০২২ সালে লেভার কাপে ছিল ফেদেরারের শেষ ম্যাচ। লেভার কাপে ইউরোপের হয়ে একই দলে খেলেছেন ফেদেরার, জোকোভিচ ও নাদাল। ফেডের বিদায়বেলায় তার সঙ্গে অঝোরে কেঁদেছেন নাদাল। দুজনের সেই কান্না হৃদয় ছুঁয়ে যায় টেনিস বিশ্বের। ঠিক দুই বছর পর ২০২৪ সালের অক্টোবরে ডেভিস কাপ খেলে টেনিসকে বিদায় বলেছেন নাদালও। মালাগার দর্শকে ঠাসা স্টেডিয়ামে ডাচ খেলোয়াড় বটিচ ফন ডে জ্যান্ডশালপের কাছে ৬-৪, ৬-৪ গেমে হেরে যান নাদাল। দুই কিংবদন্তিই বিদায়ী ম্যাচে হেরেছেন!

বিদায়বেলায় আবেগাপ্লুত দর্শককে নাদাল বলেছেন, ‘গত ২০ বছরের পেশাদার ক্যারিয়ারে আপনারা আমাকে ভালো সময়ে যেমন উৎসাহ দিয়েছেন, তেমনি খারাপ সময় কাটিয়ে উঠতেও পাশে ছিলেন।’

তিনি দর্শককে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সত্য বলতে কি, আপনারা এ সময়টি দেখতে চাননি। আমি কিন্তু টেনিস খেলতে ক্লান্ত নই, কিন্তু আমার শরীর আর খেলতে সায় দিচ্ছে না এবং এটি আপনাদের মেনে নিতে হবে। আমি খুবই ভাগ্যবান যে শৈশবের শখটাই পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ সময় আমি আমার ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে পেরেছি।’

ইতিহাসের দ্বিতীয় সফলতম পুরুষ খেলোয়াড় হিসেবে অবসর নেন নাদাল। তিনি ২২ বারের গ্র্যান্ড স্লাম চ্যাম্পিয়ন। সর্বোচ্চ ২৪টি গ্র্যান্ড স্লাম জিতেছেন নোভাক জোকোভিচ, আর নারীদের মার্গারেট কোর্টও জিতেছেন ২৪টি। নাদাল এক ফ্রেঞ্চ ওপেনই জিতেছেন ১৪ বার। আর কোনো খেলোয়াড় নির্দিষ্ট কোনো আসর এত বেশিবার জেতেননি। ‘ক্লে কোর্টের রাজা’ খ্যাত নাদাল ফ্রেঞ্চ ওপেনে ১১৬ ম্যাচ খেলে ১১২টি জিতেছেন!

তিনি চারবার অস্ট্রেলিয়ান ওপেন এবং দুবার করে জিতেছেন ইউএস ওপেন ও উইম্বলডন শিরোপা। এর বাইরেও সাফল্য আছে। অলিম্পিকে একক ও দ্বৈতে স্বর্ণ জয়ের গৌরব অর্জন করেছেন। স্পেনকে চারবার ডেভিস কাপ শিরোপা জিততে সাহায্য করেছেন, যার সর্বশেষটি ২০১৯ সালে।