ফুটবলের ঐতিহ্যবহুল দলবদলের নিয়মটাই ওলটপালট করে দেয় চেলসি। গত দুটি গ্রীষ্মকালীন দলবদলে ৬৩ কোটি ডলার (৬ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা) ব্যয় করে দল গুছিয়েছে ইংলিশ জায়ান্ট চেলসি। তাতে দলবদলের রেকর্ডও ভেঙে চুরমার। বাজারকেও সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিয়েছে লন্ডন জায়ান্টরা। যদিও তাতে চেলসির ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। দলটি ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের পয়েন্ট টেবিলে রয়েছে ১১তম স্থানে। ধারাবাহিক ব্যর্থতায় গত রোববার চাকরি হারিয়েছেন কোচ গ্রাহাম পটার। তার জায়গায় চলতি মৌসুমের বাকি সময়ের জন্য সাবেক কোচ ও খেলোয়াড় ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডকে নিয়োগ করেছে চেলসি।
অ্যাস্টন ভিলার কাছে চেলসি ২-০ গোলে হেরে গেলে বিদায় বলে দেয়া হয় পটারকে। টমাস টুখেলকে বরখাস্ত করে পটারকে নিয়োগ করে একরকম জুয়াই খেলেছিল ব্লুজরা। কিন্তু সাত মাসের বেশি তিনি স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে টিকতে পারলেন না।
সেটা ছিল আমেরিকান মালিক টড বোহলির প্রথম কোচ নিয়োগ এবং প্রথম নিয়োগই ব্যর্থ প্রমাণিত হয়। ব্রাইটন থেকে উড়িয়ে এনে পাঁচ বছরের চুক্তি করা হয় পটারের সঙ্গে। অথচ বড় কোনো ক্লাবে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা তার ছিল না। তার একমাত্র শিরোপা বলতে ছিল ২০১৭ সালে জয় করা সুইডিশ কাপ। চেলসির মতো বড় ক্লাবে এসে তাদের প্রত্যাশা পূরণে শোচনীয়ভাবে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।
পটারের অধীনে প্রিমিয়ার লিগে ২২ ম্যাচ খেলে সাতটি জয় পেয়েছে চেলসি। তার বিদায়ের পর লিভারপুলের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে ব্লুজরা। গতকাল তারা খেলেছে উলভারহ্যাম্পটনের মাঠে। তার আগ পর্যন্ত ২৯ ম্যাচের ১০টিতেই হেরেছে চেলসি। ৩৯ পয়েন্ট নিয়ে তারা ছিল টেবিলের ১১তম স্থানে। শীর্ষ চার থেকে ১৪ পয়েন্ট দূরে ছিল লন্ডন জায়ান্টরা। তার মানে, এটা নিশ্চিত যে আগামী মৌসুমে তারা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে কোয়ালিফাই করছে না।
ঘরোয়া দুটি প্রতিযোগিতায়ই ম্যানচেস্টার সিটির কাছে হেরে বিদায় নেয় চেলসি। যদিও চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে দুইবারের সাবেক চ্যাম্পিয়নরা, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ বর্তমান চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদ। ১২ এপ্রিল কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগ।
বোহলির নেতৃত্বে নতুন মালিকরা চেলসিকে ঢেলে সাজাতে শুরু করেন। গত গ্রীষ্মকালীন দলবদলে ২৮ কোটি ডলার ব্যয় করে দল গোছায় চেলসি, যা কিনা রোমান আব্রামোভিচ অধ্যায় শেষের পর ক্লাবটির প্রথম দলবদল। ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স ও স্পেনের চারটি লিগও সম্মিলিতভাবে এত বেশি অর্থ গ্রীষ্মে ব্যয় করেনি। এরপর জানুয়ারির শীতকালীন দলবদলে আরো ৩৫ কোটি ডলার ব্যয় করে স্কোয়াড সাজায় ব্লুজরা। এ সময় শেষ দিন তারা দলে ভেড়ায় আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজকে। তাকে কিনতে ব্রিটিশ রেকর্ড (১৩ কোটি ১০ লাখ ডলার) গড়ে চেলসি।
এছাড়া মালো গুস্তো (২৬.৩ মিলিয়ন পাউন্ড), নোনি মাদুয়েকে (২৯ মিলিয়ন পাউন্ড), মিখাইলো মুদ্রিক (৮৮.৫ মিলিয়ন পাউন্ড), হোয়াও ফেলিক্স (ধার), আন্দ্রে স্যান্টোস (অপ্রকাশিত ফি), ডেভিড ফোফানা (অপ্রকাশিত ফি), বেনো বাদিয়াশিলি (৩৫ মিলিয়ন পাউন্ড), ডেনিস জাকারিয়া (ধার), পিয়েরে এমেরিক অবামেয়াং (১০.৩ মিলিয়ন পাউন্ড), ওয়েসলে ফোফানা (৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড), সিজার কাসাদেই (১৬.৮ মিলিয়ন পাউন্ড), ক্যারনে চুকবুমেকা (২০ মিলিয়ন পাউন্ড), ওমারি হাচিসন (ফ্রি), কালিদু কুলিবালি (৩৩ মিলিয়ন পাউন্ড), এডি বিচ (অপ্রকাশিত ফি), রহিম স্টার্লিং (৪৭.৫ মিলিয়ন পাউন্ড), মার্ক কুকুরেল্লাকে (৬০ মিলিয়ন পাউন্ড) দলে ভেড়ায় লন্ডন জায়ান্টরা।
জানুয়ারির দলবদলে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলো মোট ১০০ কোটি ডলার খরচ করে, যা আগের সর্বোচ্চ ব্যয়ের (২০১৮) চেয়ে ৯০ শতাংশ বেশি এবং গত বছরের প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে ৩৭ শতাংশই খরচ করে চেলসি।
দুটি দলবদলে মোট ১৬ জন খেলোয়াড়কে কিনেছে চেলসি। এজন্য খরচ পড়ে ৬৩ কোটি ডলার। আমেরিকান মালিক দায়িত্ব গ্রহণের পর নজিরবিহীন ব্যয়ের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতির জানান দেন। এটি সঠিক না ভুল সিদ্ধান্ত ছিল, সেটি বুঝতে সময় লাগে। তবে কোচ ছাঁটাইয়ের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট, তাদের প্রকল্প প্রাথমিকভাবে ব্যর্থ। ব্লুজদের ব্যর্থতার বলি হলেন কোচ গ্রাহাম পটার।
চেলসি বিশ্বের অন্যতম ধনী ক্লাব। ডেলোয়েট ফুটবল মানি লিগের হিসাবে, গত মৌসুমে ৬২ কোটি ডলার আয় করে বিশ্বের অষ্টম ধনী ক্লাব চেলসি। তবে ধনী হলেই আর কোষাগারে অর্থ থাকলেই খরচ করা যায় না। তাদের মানতে হয় উয়েফার ফাইন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে (এফএফপি)। চেলসি কীভাবে এফএফপির শাস্তি এড়াতে সমর্থ হবে?
ফুটবল এক্সপার্ট কিয়েরান মাগুইয়ার বলেন, ‘চেলসি মূলত খেলোয়াড়দের সঙ্গে লম্বা চুক্তি করে খরচটা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছে। যেমন ৮৮ মিলিয়ন পাউন্ডে কেনা মিখাইলো মুদ্রিকের সঙ্গে সাড়ে আট বছরের চুক্তি করা হয়েছে। সাড়ে আট বছর দিয়ে ভাগ করলে বছরে পড়ে ১০ মিলিয়ন পাউন্ড! গত কয়েকটি দলবদলে এ কৌশলই প্রয়োগ করে এসেছে চেলসি।’
এফএফপির শাস্তির খড়্গ থেকে বাঁচলেও মাঠের পারফরম্যান্সে চেলসিতে এখন হতাশা। আগামী মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে উঠতে ব্যর্থ হলে তা চেলসিকে আর্থিক ও সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কেননা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে না খেললে তাদের আয় অন্তত ১০ কোটি ডলার কমে যাবে।










