গত সোমবার যখন ঘোষণা করা হয়, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নীতিমালা ভঙ্গ করেছে ম্যানচেস্টার সিটি, সেই থেকে ফুটবল বিশ্বে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। চার বছরের তদন্ত শেষে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত নয় বছরে অন্তত ১০০ বার লিগের আর্থিক নীতিমালা ভেঙেছে বর্তমান লিগ চ্যাম্পিয়ন সিটি।
২০০৯-১০ থেকে ২০১৭-১৮-এর মধ্যবর্তী নয় মৌসুম লিগের আর্থিক নীতিমালা ভাঙার অভিযোগ তোলা হয়েছে সিটির বিরুদ্ধে এবং তারা পরের পাঁচ মৌসুমও লিগের নিরপেক্ষ তদন্ত দলকে সহযোগিতা করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ মূলত রাজস্ব, খেলোয়াড় ও কোচদের বেতন, লাভ-লোকসানের হিসাব ও আরো কিছু বিষয়ে তথ্য গোপন করা। এ সময়ের মধ্যে ক্লাবটি তিনটি প্রিমিয়ার লিগ, একটি এফএ কাপ ও তিনটি কারাবাও কাপ শিরোপা জিতেছে।
আর্থিক নীতিমালা ভাঙার দায়ে ২০২০ সালে সিটিকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল ইউরোপিয়ান ফুটবল গভর্নিং বডি উয়েফা, জরিমানা করা হয়েছিল ২ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড। যদিও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে গিয়ে সেই নিষেধাজ্ঞা থেকে রেহাই পায় সিটিজেনরা। জরিমানাও কমিয়ে ৯০ লাখ পাউন্ড করেন ক্রীড়া আদালত। তখন উয়েফা বলেছিল, সিটি ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে আর্থিক নীতিমালা ভেঙেছে।
এবারের ঘটনা নিয়ে প্রিমিয়ার লিগ বলছে, সিটির বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম করার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ হাতে আছে তাদের। ক্লাবের স্পন্সরশিপ খাত থেকে রাজস্ব ও পরিচালন ব্যয়সহ সামগ্রিকভাবে ক্লাবের রাজস্বের তথ্য রয়েছে প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষের হাতে।
অপরাধ প্রমাণিত হলে বড় ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে পারে আবুধাবি গ্রুপের মালিকানাধীন এ ক্লাবটি। কেমন হবে সেই শাস্তি? জানা গেছে, বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা থেকে জরিমানা, পয়েন্ট কর্তন ও পরিশেষে রেলিগেশনের মুখে পড়তে পারে সিটিজেনরা। তাতে ২০১১-১২, ২০১৩-১৪ ও ২০১৭-১৮ মৌসুমের লিগ শিরোপা হারাতে পারে দলটি।
২০০৮ সালে ২০০ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে আবুধাবি ইউনাইটেড গ্রুপ সিটির মালিকানা নেয়। এরপর প্রথম দুই মৌসুমেই দল গঠনে ৩০০ মিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি খরচ করে ধনী এ ক্লাবটি। ২০২০-২১ মৌসুমে ৬৪ কোটি ৪৯ লাখ ইউরো রাজস্ব আহরণ করে বিশ্বে শীর্ষস্থান দখল করে সিটি। ২০২১ সালে ফোর্বসের এক সমীক্ষায় বলা হয়, ৪০০ কোটি ডলারের সম্পদ নিয়ে বিশ্বের ষষ্ঠ শীর্ষ ধনী ক্লাব ম্যানসিটি। কিন্তু অতিরিক্ত খরচ করতে গিয়েই এখন তারা মহাবিপদে।
আবুধাবি গ্রুপের অধীনে যাওয়ার পর ম্যানসিটি ছয়টি লিগ শিরোপা জিতেছে। এ গ্রুপটি মালিকানায় আসার পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জেতার আশায় দেদার খরচ করে তারকাখচিত স্কোয়াড গড়েছে, যখন একাধিকবার তাদের বিরুদ্ধে নিয়মবহির্ভূতভাবে অধিক খরচের অভিযোগ তুলেছে প্রতিপক্ষ ক্লাবগুলো।
জুভেন্টাসের মতো পরিণতি হতে পারে ম্যানসিটির। ম্যাচ কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করে ম্যাচের ফল নিজেদের পক্ষে নেয়ার অপরাধে ২০০৬ সালে জুভেন্টাসকে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল সিরি-বি লিগে এবং তাদের ২০০৪-০৫ ও ২০০৫-০৬ মৌসুমের শিরোপা কেড়ে নেয়া হয়েছিল, রানার্সআপ হিসেবে পরেরটি যোগ হয়েছিল ইন্টার মিলানের নামে।
চলমান তদন্ত শেষে এমনটিও দেখা যেতে পারে যে ম্যানসিটির শিরোপা বাতিল হয়ে যাবে এবং রানার্সআপ হিসেবে শিরোপা পাবে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও লিভারপুল। ২০১১-১২ মৌসুমে মাত্র গোল ব্যবধানে ম্যানইউকে পেছনে ফেলে শিরোপা জিতেছিল সিটিজেনরা। প্রিমিয়ার লিগে সিটির প্রথম শিরোপাটি এসেছিল বড় নাটকীয়তা শেষে। ৯৪ মিনিটে আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড সার্জিও আগুয়েরোর গোলে কুইন্স পার্ক রেঞ্জার্সকে হারাতে সক্ষম হয় সিটিজেনরা, আর সেই জয়ে ম্যানইউর সমান পয়েন্ট নিয়ে গোল ব্যবধানে রেড ডেভিলদের পেছনে ফেলে শিরোপা জিতে নেয় তারা।
পরের মৌসুমে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনকে বিদায়ী উপহার হিসেবে শিরোপা এনে দেন রেড ডেভিলরা। ২০১৩-১৪ মৌসুমে লিভারপুলের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে শিরোপা পদক ওঠে সিটিজেনদের গলায়। পুরো মৌসুমে এগিয়ে থেকে শেষ দুই সপ্তাহে পিছিয়ে পড়ে ব্রেন্ডন রজার্সের লিভারপুল। তবে দীর্ঘ নয় বছর পর কি সেই শিরোপা যাবে অ্যানফিল্ডে?
এরই মধ্যে ইউরোপের অন্যতম সেরা ক্লাব হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে ফেলে ম্যানসিটি এবং লিগের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে ১০০ পয়েন্ট পেয়ে ২০১৭-১৮ মৌসুমের শিরোপা জিতে নেয় পেপ গার্দিওলার দল। সেবার সবচেয়ে বেশি জয় (৩২), টানা জয় (১৮), অ্যাওয়েতে সবচেয়ে বেশি জয় (১৬), মৌসুমে সবচেয়ে বেশি গোল (১০৬) ও সর্বোচ্চ গোলগড়ের (+৭৯) মতো অসংখ্য রেকর্ড গড়ে গার্দিওলার দল। হোসে মরিনহোর ম্যানইউর চেয়ে ১৯ পয়েন্টে এগিয়ে থেকে শিরোপা জিতে আরেকটি রেকর্ড গড়ে সিটিজেনরা।
এত এত সব রেকর্ডের মধ্য দিয়ে জেতা লিগ শিরোপা এখন হারানোর ঝুঁকিতে সিটি। কী তাদের অপরাধ? এ নিয়ে ফুটবল ফাইন্যান্স এক্সপার্ট কিয়েরান মাগুয়ার বলেন, ‘অভিযোগের ভিত্তিতে দুটি বিষয় বেরিয়ে আসছে। প্রথম অভিযোগ, ম্যানচেস্টার সিটি পরিকল্পিতভাবে তাদের আয়কে বেশি করে দেখিয়েছে। মালিক সরাসরি বিনিয়োগ করলেও তা বাণিজ্যিক ও স্পন্সরশিপ চুক্তি থেকে এসেছে বলে জানানো হয়। এটা অবশ্য ফাইন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে (এফএফপি) বিবেচনায় নেবে না।’
মাগুয়ার আরো বলেন, ‘দ্বিতীয় অভিযোগটি হলো, সিটি ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের খরচ কমিয়ে দেখিয়েছে। বিষয়টি এমন, তাদের কোচের বেতন পরিশোধ করেছে মালিকের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্য কোনো কোম্পানি, যাতে তারা দেখাতে পারেন, অল্প খরচেই তারা ক্লাবটি পরিচালনা করছেন।’
ম্যানইউর আর্থিক নীতিমালা ভাঙার বিষয়টি এখন স্বাধীন কমিশনের হাতে, যার প্রধান হিসেবে রয়েছেন মারে রোজেন কেসি। এর কার্যক্রম অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পন্ন হবে। এ কমিশনের হাতেই এখন ম্যানসিটির ভাগ্য। বিবিসি ও ইএসপিএন।










