বিগত কয়েক দশকে ক্রমাগত কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধির ফলে জলবায়ুর ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। এজন্য জলবায়ু পরিবর্তনে মূল ভূমিকা পালনকারী কার্বন নিঃসরণ সংক্রান্ত বিষয়টি এখন বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব পাচ্ছে। জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবেলার প্রশ্নে বিশ্বের প্রতিটি দেশই এখন অত্যন্ত সতর্ক। এরই মধ্যে কাতারে ২২তম বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে ফিফা কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে এখন জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে।
ফিফা কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, কাতার বিশ্বকাপ কার্বন নিঃসরণ নিউট্রাল (নিরপেক্ষ) থাকবে, অর্থাৎ কার্বন নিঃসরণে হলেও এর প্রশমন ব্যবস্থাপনা থাকবে যা পরিবেশের ওপর তেমন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে না। জলবায়ু ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তি কিংবা সংগঠন কেউই ফিফার এমন বক্তব্যকে মানতে নারাজ। পরিবেশবাদীরা বলছেন, ফিফার দাবি বিপজ্জনক ও বিভ্রান্তিকর! ফিফা যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণের তথ্য দিয়েছে এ টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে গিয়ে কাতারে তার চেয়ে তিন গুণ বেশি কার্বন নিঃসরণ হবে।
ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি ইউরোপীয় দেশগুলোতেও বিভিন্ন ধরনের অভিযোগের মুখে পড়েছে। খোলা চিঠিতে এর টেকসই নীতি পরিবর্তন ও পরিমার্জন করার দাবি করছে পরিবেশবাদী গ্রুপগুলো। এছাড়া কাতার বিশ্বকাপের কার্বন নিরপেক্ষতা দাবি করে ফিফার বিজ্ঞাপনী প্রচারণার বিরুদ্ধে এরই মধ্যে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের আদালতে অভিযোগ করা হয়েছে।
ফিফা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কাতার বিশ্বকাপে ৩৬ লাখ টন সমপরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হবে, তবে সেটি বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে প্রশমন করা হবে। কার্বন নিঃসরণ সংক্রান্ত বিষয়ের গবেষক যুক্তরাজ্যের ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ও ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল ফিউচারের ফেলো মাইক বার্নার্স-লি বলেন, আমরা ফিফার কার্বন নিঃসরণের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখেছি। আমরা মনে করি এর পরিমাণ হবে এক কোটি টনেরও বেশি, অর্থাৎ ফিফার ঘোষিত পরিমাণের তুলনায় অন্তত তিন গুণ। কার্বন নিউট্রাল একটি বিভ্রান্তিকর শব্দ। বিশ্বকাপ আসরের জন্য যে পদ্ধতি বেছে নেয়া হয়েছে তা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন অপসারণ করে না, এজন্য এটি একটি মিথ্যা তথ্য। একে কার্বন নিরপেক্ষ বিশ্বকাপ বলা খুবই বিভ্রান্তিকর।
বার্নার্স-লির সঙ্গে সুর মিলিয়ে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ও জলবায়ু বিজ্ঞানী কেভিন অ্যান্ডারসন বলেন, ফিফার দাবি চরম বিভ্রান্তিকর ও অত্যন্ত বিপজ্জনক! টুর্নামেন্টটি প্রত্যক্ষভাবে মানুষের ক্ষতি করবে, এই এক ইভেন্টের জন্য বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ ঘটবে, যা সারা বিশ্বে প্রভাব ফেলবে।
ফিফা জানিয়েছে, কাতার বিশ্বকাপে যে ৩৬ লাখ টন সমতুল্য কার্বন নিঃসরণ ঘটবে এর মধ্যে ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ ঘটবে ভক্তদের ফ্লাইটসহ ভ্রমণের কারণে।
কাতার বিশ্বকাপ আয়োজন করার জন্য ফিফার উল্লেখযোগ্য পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচিগুলোর মধ্যে রয়েছে ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১ হাজার ৩০০টি ফুটবল পিচের আকৃতির বিস্তীর্ণ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা স্টেডিয়ামগুলোর জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা। এছাড়া স্টেডিয়াম এলাকা ও কাতারের বিভিন্ন স্থানজুড়ে প্রায় সাত লাখ গুল্ম ও ১৬ হাজার গাছ লাগানো হয়েছে। অনেক গাছপালা এ অঞ্চলের স্থানীয় ও খরা সহনশীল, যা পানি সেচের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেবে। আর নতুন গাছগুলো কমাবে কার্বন নিঃসরণ।
এবার বিশ্বকাপ দেখতে দেশটিতে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট ব্যবহার করতে হবে না। ফুটবল সমর্থকদের যাতায়াতের জন্য দেশটিতে দোহা মেট্রোর ৭৫০টি নতুন বিদ্যুচ্চালিত বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা ব্যবহার করে বিনা খরচে স্টেডিয়ামে যাওয়া যাবে।










