আগামী তিন বছর মেয়েদের টেনিসে সেরা আট খেলোয়াড়ের টুর্নামেন্ট ডব্লিউটিএ ফাইনালস অনুষ্ঠিত হবে সৌদি। এ তিন আসরের প্রাইজমানিও বেড়েছে। প্রাইজমানি দেয়া হবে ১ কোটি ৫২ লাখ ৫০ হাজার ডলার (প্রায় ১৬৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকা)। স্পোর্টসওয়াশ বিতর্কের মধ্যেই সৌদিতে নারী টেনিসের বড় টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
নারীদের টেনিসে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত র্যাংকিংয়ের শীর্ষ আটে থাকা খেলোয়াড়রা অংশ নিয়ে থাকেন ডব্লিউটিএ ফাইনালস আসরে। একইভাবে দ্বৈতেও শীর্ষ র্যাংকধারী আট জুটি অংশ নিয়ে থাকে। উল্লেখ্য, সৌদি আরবে এটাই হতে যাচ্ছে সবচেয়ে হাইপ্রোফাইল টেনিস টুর্নামেন্ট। এর আগে রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার ‘এল ক্ল্যাসিকো’সহ বক্সিংয়ের অনেক হেভিওয়েট খেলোয়াড়ের লড়াই সৌদি আরবে হলেও টেনিসে বড় টুর্নামেন্ট এ প্রথম। গত বছর অনূর্ধ্ব-২১ ক্যাটাগরির নেক্সট জেন এটিপি টুর্নামেন্ট আসর বসেছিল সৌদি আরবে। চলতি বছরের ২-৯ নভেম্বর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত হবে ডব্লিউটিএ ফাইনালস আসর।
বড় বড় ক্রীড়া ইভেন্ট আয়োজন করে সৌদি আরব তাদের বিভিন্ন বিতর্ক ঢাকতে চায় বলে দাবি করা হচ্ছে, যাকে বলা হয় স্পোর্টসওয়াশ। কোনো ব্যক্তি, দল, সংস্থা কিংবা সরকারের ভুল কাজে সুনাম ভূলুণ্ঠিত হলে তা পুনরুদ্ধারে খেলাধুলা আয়োজনের চর্চাকে বলা হয় স্পোর্টসওয়াশ। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে স্পোর্টসওয়াশ ধারণাটি কাজে লাগানোর অভিযোগ রয়েছে। বলা হয়, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নারীর জীবন ও কথা বলার স্বাধীনতা সীমিত করে দেয়া এই দেশটি তার ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের সব চেষ্টাই করে যাচ্ছে।
গত জানুয়ারিতে কিংবদন্তি চেক-আমেরিকান টেনিস খেলোয়াড় মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা ও ক্রিস এভার্ট প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘সৌদি রাজ্যে এমন নামিদামি ইভেন্ট আয়োজনের মানে হলো, নারীদের টেনিসের আরেকধাপ পিছিয়ে যাওয়া।’
ডব্লিউটিএর প্রধান নির্বাহী স্টিভ সাইমন বলেছেন, ‘রিয়াদকে ভেন্যু হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে মূলত টেনিসের মাধ্যমে এ অঞ্চলে খেলাটির মাধ্যমে যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তাকে সমর্থন করা।’ সাইমন বলেন, ‘৫০ বছরেরও অধিক সময়ের বাধা ভেঙে ফেলতে চলেছে ডব্লিউটিএ। আমরা শীর্ষ পর্যায়ে টেনিসে নারীদের খেলার সুযোগ আবারো বাড়াতে চাই এবং আমরা বিশ্বাস করি, এমন আয়োজনের মধ্য দিয়ে আরো বেশি কিশোরী খেলাটিতে আকৃষ্ট হবে। টেনিস তো বৈশ্বিক খেলা। ডব্লিউটিএর এখন সব ধরনের টুর্নামেন্ট আছে যেখানে বিশ্বে সব সংস্কৃতি ও সিস্টেমের সংমিশ্রণ রয়েছে।’
ডব্লিউটিএ বলছে, মেয়েদের এ এলিট টুর্নামেন্ট আয়োজনে বিভিন্ন অঞ্চলের আগ্রহ ছিল। সেগুলোর মধ্য থেকে এমন একটিকে তারা বেছে নিয়েছেন যেন তা সংস্থাটির আকাঙ্ক্ষা পূরণে সহায়ক হয়। ডব্লিউটিএ দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করে যাচ্ছে যেন পুরুষদের সমান প্রাইজমানি মেয়েরাও পায়। ২০৩৩ সালের মধ্যে ছোট-বড় সব ধরনের টুর্নামেন্টে সমান প্রাইজমানি নিশ্চিত করতে চায় ডব্লিউটিএ। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে প্রাইজমানি ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার করা হচ্ছে, যা কিনা বর্তমান প্রাইজমানির চেয়ে ৯০ লাখ ডলার বেশি।
গত ডিসেম্বরে বেলারুশিয়ান তারকা আরিনা সাবালেঙ্কা ও তিউনিস তারকা ওন্স জাবেরের মধ্যে একটি প্রদর্শনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় সৌদি আরবে। যদিও গত নভেম্বরের নেক্সজেন এটিপি ফাইনালের আগে দেশটিতে বড় কোনো টেনিস আসর বসেনি। যদিও এ দেশে ফর্মুলা ওয়ান, বক্সিং আর গলফের বড় বড় আসর বসেছিল। এসব আসর দর্শক যে খুব একটা টানতে পেরেছে তেমনটি নয়।
মানবাধিকার গ্রুপগুলো সৌদি আরবের মতো রক্ষণশীল একটি দেশে টেনিসের বড় এ আসর আয়োজন করা নিয়ে নিজেদের শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। রাশিয়ার খেলোয়াড় দারিয়া কাসাতকিনা একজন সমকামী। তিনি সৌদি আরবে টুর্নামেন্ট আয়োজনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। বিপরীতও আছে। তিউনিস তারকা ওন্স জাবের বলেছেন, সৌদিতে টুর্নামেন্ট খেলতে তিনি ‘শিহরিত’।
সাইমন বলেন, ‘আমরা খেলোয়াড়দের সঙ্গে সরাসরি বসে একাধিক বৈঠক করেছি এবং সৌদি আরবে একাধিক সফর করেছি। আমরা তাদের জানিয়েছি, এখানে টুর্নামেন্ট চলাকালে সমকামী একাধিক খেলোয়াড় ও দর্শক আসতে পারে। আগের আসরগুলো বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি, অতীতের আসরগুলো এ অঞ্চল থেকে ইতিবাচক বার্তাই দেয়।’
সৌদি আরবের ক্রীড়ামন্ত্রী এবং সৌদি অ্যারাবিয়ান অলিম্পিক ও প্যারা অলিম্পিক কমিটির প্রেসিডেন্ট প্রিন্স আব্দুলআজিজ বিন তুর্কি আল ফয়সাল মনে করেন, টুর্নামেন্ট আয়োজনের ঘোষণা তার দেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ এক ঘটনা। তিনি বলেন, ‘নারীদের টেনিসের এমন উচ্চ পর্যায়ের একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন সৌদি আরবের টেনিসের জন্য এক গৌরবোজ্জ্বল মুহূর্ত। বিশেষ করে আমাদের কিশোরী ও নারী খেলোয়াড়দের জন্য এটা হবে বিরাট অনুপ্রেরণামূলক।’
সৌদি আরবের ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর একটি পরিচালনার জন্য প্রথম নারী হিসেবে নির্বাচিত আরিজ আলমুতাগানি ডব্লিউটিএ ফাইনালস নিয়ে বলেন, ‘এখানে প্রত্যেককে স্বাগত জানানো হবে। আমাদের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে যুগান্তকারী অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে এবং অর্জনও এসেছে। ক্রীড়ার এ উন্নয়ন গোটা জাতির মধ্যে প্রভাব ফেলছে। এবার ডব্লিউটিএ ফাইনালস আয়োজন সৌদি আরবের টেনিসের ভবিষ্যতের জন্য অনেক বড় ঘটনা। বিশেষ করে আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খেলোয়াড় ও নারী টেনিসের জন্য এটি বিশেষভাবে উদযাপনের উপলক্ষ এনে দিয়েছে।’
সৌদি আরবে টেনিসের একটা বিপ্লব এরই মধ্যে ঘটে গেছে। দেশটিতে এখন ১৭৭টি টেনিস ক্লাব রয়েছে, যার ১৪৬ শতাংশই ২০১৯ সালের পর প্রতিষ্ঠা করা হয়। গত চার বছরে নিবন্ধিত খেলোয়াড় ৪৬ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৩০০ জনে দাঁড়িয়েছে। অনূর্ধ্ব-১৪ পর্যায়ের খেলোয়াড় শতভাগ বেড়ে ৫০০ থেকে এক হাজার হয়েছে।
সৌদি আরব টেনিস ফেডারেশন এখন বছরে ৪০টি জাতীয় টুর্নামেন্ট আয়োজন করে থাকে, যার মধ্যে গত বছর ছিল তিনটি আইটিএফ জুনিয়র টুর্নামেন্ট।
সৌদি আরবের টেনিসকে এগিয়ে নিতেই এ বছর জানুয়ারিতে দেশটির টেনিসের শুভেচ্ছাদূত নিয়োগ করা হয় স্প্যানিশ গ্রেট রাফায়েল নাদালকে, যিনি ২২টি গ্র্যান্ড স্লাম জিতেছেন। তরুণ খেলোয়াড়দের টেনিসে আরো দক্ষ করে তুলতে সৌদিতে চালু হতে যাচ্ছে রাফা নাদাল একাডেমি।










