গত ৩০ অক্টোবর নেপালের কাঠমান্ডুতে নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে নেপালকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব পায় বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল ক্রীড়াঙ্গনে দেশকে গৌরবান্বিত করেছে এবং এ গৌরবের বড় ভাগীদার ময়মনসিংহবাসী। এ জেলার ডজনখানেক খেলোয়াড় সাফ মাতিয়েছেন।

কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক নেপালকে ২-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। নেপালের সেই জয়ের আনন্দ ঢেউ ফেলে ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী উপজেলা ধোবাউড়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল কলসিন্দুরেও। সানজিদা আক্তার, মারিয়া মান্দা, তহু খাতুনসহ বাংলাদেশ দলের বড় একটি অংশ উঠে এসেছে এ কলসিন্দুর থেকে।

সাফ জয়ের পর ধোবাউড়া উপজেলায় শুরু হয়েছিল মিষ্টি বিতরণ, আনন্দ উল্লাস। দক্ষিণ এশিয়া জয়ের রেশ এখনো কাটেনি। এখন চলছে প্রিয়দর্শিনীদের বরণ ও সংবর্ধিত করার নানা আয়োজন। দ্বিতীয়বার সাফ ফুটবল চ‍্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করায় তাদের অর্জনে কলসিন্দুর গ্রামের বাসিন্দারা আনন্দে উদ্বেলিত।

এবারের সাফ মিশনে ছিলেন কলসিন্দুর সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছয়জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে সাবেক শিক্ষার্থী চারজন ও দুজন বর্তমান শিক্ষার্থী। সাফজয়ী এ ফুটবলাররা হলেন শামছুন্নাহার সিনিয়র, শামছুন্নাহার জুনিয়র, তহুরা খাতুন, সানজিদা আক্তার, শিউলি আজিম ও মারিয়া মান্দা। তাদের মধ্যে তহুরা ভুটানের বিপক্ষে তিন গোল ও ভারতের বিপক্ষে দুই গোল করে বাংলাদেশের সাফ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এছাড়া শামছুন্নাহার জুনিয়র করেছেন ১ গোল। তবে ফাইনালে সানজিদা ছাড়া অংশ নিয়েছিলেন বাকি পাঁচজন। একটি স্কুল থেকে সাফজয়ী জাতীয় দলে এতজন গর্বিত সদস্য নিয়ে গৌরবের যেন শেষ নেই কলসিন্দুরের মানুষদের।

ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত অঞ্চলের কলসিন্দুর গ্রাম নারী ফুটবলারদের জন্য অনন্য খ্যাতি পেয়েছে। এখন এক নামে এ গ্রামকে সবাই চেনে। কলসিন্দুর নাম এখন সারা দেশে অতি পরিচিত। তাদের এ অর্জনের কারণে সরকারীকরণ করা হয় কলসিন্দুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে। তাই আবারো মেয়েদের এমন অর্জনে আনন্দ ও উচ্ছ্বাসে ভাসছে কলসিন্দুর গ্রামসহ পুরো ধোবাউড়া উপজেলা।

ময়মনসিংহ নগরী থেকে ৬৫ কিলোমিটার উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য ঘেঁষা সীমান্তবর্তী উপজেলা ধোবাউড়ার কলসিন্দুর গ্রামটি আঁকাবাঁকা ও অরণ্য পথে গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। উন্নয়নে পিছিয়ে থাকা এ গ্রামে মুসলমানদের পাশাপাশি আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করেন। আছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনও। নেপালের সঙ্গে ফাইনাল খেলার দিন মেয়েদের খেলাকে ঘিরে পুরো উপজেলায়ই ছিল টান টান উত্তেজনা। ফলে ওইদিন বিকাল থেকে টেলিভিশন ও মোবাইলের দিকে নজর ছিল সব বয়সী মানুষের। বাড়িঘরের পাশাপাশি হাটবাজার ও দোকানপাটেও টিভির সামনে ছিল উৎসুক মানুষের চোখ। মেয়েদের এ অর্জন প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে বড় পাওয়া বলে মনে করছেন গ্রামবাসী।

কলসিন্দুর সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ওই গ্রাম থেকে আরো কিশোরী ফুটবলার উঠে আসছে। পাইপলাইনে সাথী, রুজিনা, সাদিয়া, আফরোজা, মল্লিকা হাসিনা ও জীমসহ অন্তত ৩৪ জন খেলোয়াড় গড়ে তোলা হচ্ছে। হয়তো আগামীতে এরাই নেতৃত্ব দেবে জাতীয় নারী ফুটবলে।

কলসিন্দুর নারী ফুটবল টিমের কোচ মো. জুয়েল সরকার বলেন, ‘নেপালকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের শিরোপা জিতেছেন মেয়েরা। দলের ছয়জনই এ গ্রামের সন্তান। মেয়েদের এমন অর্জনে আমিসহ দেশবাসী গর্বিত। আমরা নানা প্রতিকূলতার মধ্যে মেয়েদের নিয়ে এগিয়ে গিয়েছি। কলসিন্দুর নারী ফুটবল টিমের এখন জুনিয়র টিমও শক্তিশালী। তারা তাদের সিনিয়রদের অনুসরণ করছে।’

মো. জুয়েল সরকার জানান, বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স ২৫ নভেম্বর সাফজয়ীদের সংবর্ধনা দেবেন।

কলসিন্দুর সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাইনুল হাসান খান রাসেল বলেন, ‘মেয়েদের জয়ে আমরা সত্যি খুবই আনন্দিত। তাদের সংবর্ধনা ও বরণ করতে স্কুলের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হবে। মেয়েরা বাড়িতে আছে। তারা একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। পরে আমরা তাদের সংবর্ধিত করব ইনশা আল্লাহ।’

কলসিন্দুর সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ফুটবল কন্যাদের মা খ্যাত অধ্যক্ষ মালা রানী সরকার বলেন, ‘নারী ফুটবল দলের শুরু থেকেই আমি ছিলাম, এখনো আছি। এবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল খেলায় কলসিন্দুর সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছয় মেয়ে অংশগ্রহণ করেছে। এতে কলসিন্দুরবাসী যেমন খুশি, সারা দেশবাসীও তেমন খুশি ও আনন্দিত। আমরা প্রত্যাশা করি নারী ফুটবলার তাদের জয়ের ধারা অব্যাহত রাখবে এবং দেশবাসীকে এভাবে সবসময় আনন্দ দেবে। আমরা তাদের সংবর্ধনা দেব।’

সাফজয়ী ফুটবল দলের সদস্য সানজিদা আক্তারের বাবা মো. লিয়াকত আলী বলেন, ‘দ্বিতীয়বারের মতো খেলায় নেপালকে হারিয়ে ফাইনাল জিতেছে বাংলাদেশের নারী ফুটবল দল। এটা দেশের জন্য অনেক বড় অর্জন। আমি এ দলের একজন খেলোয়াড়ের বাবা হিসেবে অনেক গর্বিত।’

একটা সময় মেয়ে খেলাধুলা করে বলে পাড়া-প্রতিবেশীরা নানা বিরূপ মন্তব্য করতেন জানিয়ে লিয়াকত আলী বলেন, ‘সবাই এখন সানজিদাসহ আমার গ্রামের মেয়েদের প্রশংসা করে। মেয়ের জন্য আজ আমাদের মুখ উজ্জ্বল হয়েছে। এলাকার অনেক নারী ফুটবলার সানিজদাকে অনুকরণ করে। সব জায়গাতেই আমাদের মূল্যায়ন বেড়েছে। এটা আগে পেতাম না।’

একই ধরনের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন তহুরার বাবা মো. ফিরোজ মিয়া। তিনি বলেন, ‘সাফ জয়ের খবর পেয়ে নিজেকে গর্বিত মনে করছি। এলাকার সবাই খুশি। এখন সবাই মেয়েদের অপেক্ষায় আছে।’

ধোবাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিশাত শারমীন বলেন, ‘নারী ফুটবলারদের সংবর্ধনার ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে সচিব স্যারের সম্মতিতে জেলা প্রশাসন বড় করে একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠান করবে বলে জানতে পেরেছি।’