মৃত্যুর কাছে বরাবরই পরাজিত হয় রাগ, ক্ষোভ কিংবা শত্রুতা। অ্যান্ড্রু সাইমন্ডসের মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ ক্রীড়াঙ্গন। সাবেক অজি অলরাউন্ডারের এভাবে হঠাৎ চলে যাওয়ায় হতভম্ব ভারতের সাবেক অফস্পিনার হরভজন সিং। ক্রিকেট মাঠে সাইমন্ডস ও হরভজনের সম্পর্ক ছিল বৈরিতা। ২০০৮ সালের ‘মাঙ্কিগেট’ কাণ্ডের কথা সহজে ভুলে যাওয়ার কথা নয় ক্রিকেটভক্তদের। যেটি সাইমন্ডস- হরভজনকে নিয়ে গিয়েছিল আদালত পর্যন্ত।

কিন্তু গতকাল শনিবার কুইন্সল্যান্ডে সড়ক দুর্ঘটনায় অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস নিহত হওয়ার পর ক্রিকেট দুনিয়ার সঙ্গে যেন স্তব্ধ হয়ে গেছেন হরভাজনও। আর সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটারের বার্তায় ফুটে উঠেছে। সাইমন্ডসের মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হরভজন লিখেছেন, ‘অ্যান্ড্রু সাইমন্ডসের হঠাৎ মৃত্যুতে আমি হতভম্ব। খুব তাড়াতাড়ি চলে গেল। ওর পরিবার ও বন্ধুদের আন্তরিক সমবেদনা জানাই। দোয়া করি তার বিদেহী আত্মার জন্য।’

হরভাজানের বৈরিতা আজ আর নেই, সাইমন্ডসের জন্য আছে ভালোবাসা। আর এরই সঙ্গে ধামাচাপা পড়ল সেই ‘মাঙ্কিগেট’ বিতর্ক। আর হয়তো খোলাখুলি তাদের বিতর্ক দেখা যাবে না।

অনেকেই মনে করেন মাঙ্কিগেট বিতর্কই সাইমন্ডসের ক্রিকেটজীবন শেষ করে দেয়। ২০০৮ সালের বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফিতে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন ভারতের হরভজন ও সাইমন্ডস। ওই ঘটনার পর থেকে বহুবার বেশ কয়েক জায়গায় দু’জনেই মুখ খুলেছেন। বিতর্ক তখনকার মতো মীমাংসা হলেও, তার রেশ থেকে গেছে আজও। 

কী হয়েছিল সেই মাঙ্কিগেট বিতর্কে? ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে সিডনিতে দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমেছিল ভারত ও অস্ট্রেলিয়া। সেই ম্যাচের আম্পায়ার স্টিভ বাকনরের (সাবেক) একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। এমন সময় হরভাজনের একটি মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে অস্ট্রেলিয়া শিবির। তারা অভিযোগ জানায়, সাইমন্ডসের উদ্দেশে একটি বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য করেছেন হরভজন।

গোটা ম্যাচে এমন অনেক ভুল সিদ্ধান্ত দেন স্টিভ বাকনর। অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে চারশতকের বেশি রান তুলেছিল। তবে ভারতীয় ক্রিকেটারদের দাবি, বাকনরের ভুল সিদ্ধান্ত না হলে তিন শতকের কমে আটকে রাখা যেত অজিদেরকে। ব্যাট করতে নেমে পাল্টা লড়াই দেয় ভারতও। শচীন টেন্ডুলকার ও ভিভিএস লক্ষ্মণের সেঞ্চুরি এবং সৌরভ গাঙ্গুলির অর্ধশত রানে তারা লিড নিয়েছিল। ভারতের স্কোর যখন ৭ উইকেটে ৪৫১ রান, তখনই এই ঘটনা ঘটে।

হরভজনকে একের পর এক বাউন্সার দিচ্ছিলেন সাবেক পেসার ব্রেট লি। এমন সময় ক্রিজের অন্যপ্রান্তে গিয়ে সাইমন্ডসকে একটি প্রচলিত ভারতীয় গালি দেন হরভজন। সাইমন্ডস প্রথম বুঝতে পারেননি। পরে জানতে পারেন যে তাকে বানরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এরপর দুই দলের ক্রিকেটারদের মধ্যেই ঝামেলা লেগে যায়। কথা-কাটাকাটি চলতে থাকে। এজন্য আম্পায়ার মার্ক বেনসন কড়া কথা বলেন হরভজনকে। এরপর সাইমন্ডস আনুষ্ঠানিকভাবে আম্পায়ারের কাছে অভিযোগ জানান। আম্পায়ার বাকনরও সেই অভিযোগ মেনে নেন। সাইমন্ডসের সতীর্থ রিকি পন্টিং ও ম্যাথু হেডেন তার পাশে দাঁড়ান। ফলে বিষয়টি অন্য মাত্রায় চলে যায়।

হরভজন ও শচীন টেন্ডুলকার ক্রমাগত বলে যাচ্ছিলেন যে, কোনো বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য করা হয়নি। কিন্তু অজিরা কিছুই শুনতে নারাজ। দু’দলের বৈরিতা এতটাই চরমে পৌঁছয় যে ম্যাচের শেষে ভারতীয় ক্রিকেট দলের সদস্যদের সঙ্গে হাত মেলায়নি অস্ট্রেলিয়রা।

পরে যদিও অ্যাডাম গিলক্রিস্ট জানিয়েছিলেন যে, ভারতীয়দের সাজঘরে গিয়ে অস্ট্রেলিয় ক্রিকেটাররা হাত মেলান। তবে সেই মন্তব্য কেউ বিশ্বাস করেননি। ম্যাচ আম্পায়ার মাইক প্রোক্টর চার ঘণ্টা শুনানির শেষে সিদ্ধান্ত নেন যে হরভজন অপরাধ করেছেন। ফলে তাকে তিন টেস্টে নিষিদ্ধ করা হয়। ভারত এই সিদ্ধান্তে অখুশি ছিল। হরভজনের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত বদলানো না হলে তারা সফর থেকে ফিরে আসার হুমকিও দেয়। ভারতের চাপের কাছে এক সময় নতিস্বীকার করে অস্ট্রেলিয়া।

এবার ব্যাপারটি গড়ায় আদালত পর্যন্ত। অ্যাডিলেডের ফেডেরাল কোর্ট বিল্ডিংয়ে একটি শুনানি বসেছিল। সেখানে সাইমন্ডসের সাক্ষী হিসেবে হাজির ছিলেন পন্টিং, হেডেন এবং মাইকেল ক্লার্ক। ভারতের তরফে ছিলেন শচীন। শেষে আইসিসির তৎকালীন আপিল কমিশনার স্বীকার করে নেন যে হরভজন কোনো অপরাধ করেননি। তার বিরুদ্ধে নেয়া সিদ্ধান্ত পরির্বতন করে ৫০ শতাংশ ম্যাচ ফি জরিমানা করা হয়।

সেই ঘটনায় মানসিক ভাবে ভেঙে দিয়েছিল সাইমন্ডসকে। পরে অবশ্য হরভজনের সঙ্গে আইপিএলে মুম্বই ইন্ডিয়ানসের হয়ে খেলেছিলেন সাইমন্ডস। কিন্তু ব্যাপারটি ভুলতে পারেননি অজি তারকা। সাইমন্ডসের আজীবন বিশ্বাস ছিল, সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়ায়নি তার বোর্ড। যে সাইমন্ডস ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং তিন বিভাগেই অস্ট্রেলিয়ার তুখোড় ক্রিকেটার ছিলেন, তিনিই শেষ দিকে ছন্দ হারিয়ে ফেলেন এবং দল থেকে বাদ পড়তে থাকেন।

পরে পন্টিংও নিজের আত্মজীবনীতে লেখেন, সাইমন্ডসের পাশে না দাঁড়ানো ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ভুল ছিল। সে বছর ভারত সফরে অস্ট্রেলিয়া দলে নেয়া হয়নি সাইমন্ডসকে। পরের বছর নিউজিল্যান্ডের তত্কালীন ক্রিকেটার ব্রেন্ডন ম্যাকালামের উদ্দেশে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। ২০০৯-এ টি-২০ বিশ্বকাপ চলাকালীন মদ্যপান সংক্রান্ত একটি ঘটনায় তাকে দেশে ফেরানো হয়। সাইমন্ডসের জীবন থেকে শৃঙ্খলা জিনিসটাই ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে। আর কয়েক বছর কোনো মতে টানার পর ২০১২ সালে চূড়ান্তভাবে অবসর নিয়ে নেন সাইমন্ডস।

ডিএনএ,আনন্দবাজার