এক সময় মনে হচ্ছিল আরেকটি বিশ্বকাপ রূপকথা লিখতে যাচ্ছে জাপান। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে প্রথমার্ধে পিছিয়ে দিয়ে প্রায় পুরো ম্যাচজুড়ে শৃঙ্খলিত রক্ষণে আটকে রেখেছিল সামুরাই ব্লুরা। ব্রাজিল একের পর এক আক্রমণ চালিয়েও বারবার ফিরেছে হতাশ হয়ে। কাসেমিরোর গোলে সমতায় ফেরার পরও শেষ বাঁশি পর্যন্ত লড়াইটা ছিল সমান তীব্র। কিন্তু ফুটবল যে নিষ্ঠুরও হতে পারে, সেটি টের পেল জাপান যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে। বক্সের ঠিক বাইরে এক ভুল, আর সেই ভুলের শাস্তি দিলেন গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। তার জয়সূচক গোলে ২-১ ব্যবধানে জিতে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে শেষ ষোলো নিশ্চিত করল কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিল; হৃদয়ভাঙা বিদায় হলো দারুণ লড়াই করা জাপানের।

শুরু থেকেই বলের দখল ছিল ব্রাজিলের। তৃতীয় মিনিটেই ব্রুনো গিমারায়েসের শট প্রতিহত হয়, এরপর ১৩ মিনিটে কাসেমিরোর পাস থেকে ম্যাথিউস কুনহার নিচু শট দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন জাপানের গোলরক্ষক সুজুকি। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে নিবিড় মার্কিং করে এবং পাঁচ ডিফেন্ডারের রক্ষণভাগ সাজিয়ে ব্রাজিলের আক্রমণভাগকে বেশির ভাগ সময়ই আটকে রাখে জাপান।

২৯ মিনিটে ম্যাচের চিত্র পাল্টে যায়। মাঝমাঠে দানিলোর ভুল পাস কেড়ে নিয়ে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে বেরিয়ে পড়েন কাইশু সানো। প্রায় ৩০ গজ দৌড়ে বক্সের বাইরে থেকে নিচু শটে অ্যালিসনকে পরাস্ত করে জাপানকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি। শুরুতে হলুদ কার্ড দেখলেও পরে দুর্দান্ত নৈপুণ্যে নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করেন এই মিডফিল্ডার।

গোল হজমের পর ব্রাজিল আক্রমণের চেষ্টা চালালেও তা ছিল এলোমেলো। ভিনিসিয়ুস, কুনহা ও রায়ান—এই তিন ফরোয়ার্ডই প্রথমার্ধে ব্রাজিলের আউটফিল্ড খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে কম বল স্পর্শ করেন। বিরতিতে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই মাঠ ছাড়ে জাপান।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই পরিবর্তন আনেন কার্লো আনচেলত্তি। চোটের অস্বস্তি নিয়ে মাঠ ছাড়েন লুকাস পাকেতা, তার জায়গায় নামেন এন্দ্রিক। এরপর থেকেই আক্রমণের গতি বাড়িয়ে দেয় ব্রাজিল।

৫২ মিনিটে দানিলোর ক্রসে ব্রুনো গিমারায়েসের হেড আবারও রুখে দেন সুজুকি। এক মিনিট পর বক্সে কাসেমিরোর প্রচেষ্টা গোললাইন থেকেই প্রতিহত করে জাপানের রক্ষণভাগ। সেই চাপ বেশিক্ষণ সামলাতে পারেনি সামুরাই ব্লুরা।

৫৫ মিনিটে গ্যাব্রিয়েলের দারুণ ক্রসে দূরের পোস্টে থাকা কাসেমিরো এবার আর ভুল করেননি। সহজ ফিনিশে জালে বল পাঠিয়ে ব্রাজিলকে সমতায় ফেরান অভিজ্ঞ এই মিডফিল্ডার। বিরতির পর ব্রাজিলের অবিরাম চাপের যথার্থ পুরস্কার ছিল এই গোল।

সমতায় ফেরার পরও আক্রমণ থামায়নি ব্রাজিল। ৫৮ মিনিটে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে কয়েকজনকে কাটিয়ে দুর্দান্ত শট নেন। গোলরক্ষক সুজুকির আঙুলের স্পর্শে বল পোস্টে লেগে ফিরে আসে। অল্পের জন্য এগিয়ে যাওয়া হয়নি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।

এক ঘণ্টা পার হওয়ার পর পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্রাজিলের হাতেই। জাপান নিজেদের অর্ধে রক্ষণ সামলাতেই ব্যস্ত ছিল। ৬৫ মিনিটে দুই দলই বদলি খেলোয়াড় নামায়। ব্রাজিলের হয়ে ম্যাথিউস কুনহার জায়গায় গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি নামেন। অন্যদিকে জাপান রক্ষণ আরো শক্ত করতে ইয়ুকিনারি সুগাওয়ারা ও জুননোসুকে সুজুকিকে মাঠে পাঠান।

৬৮ মিনিটে এন্দ্রিক বক্সে ফাউলের আবেদন জানালেও তাতে সাড়া দেননি রেফারি। এরপরই নির্ধারিত হয় ম্যাচের দ্বিতীয় হাইড্রেশন ব্রেক। তখন পর্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ে ব্রাজিল ও জাপান ১-১ সমতায় ছিল।

৭৩ মিনিটে আবারও গ্যাব্রিয়েলের বাঁ দিক থেকে ভাসানো ক্রস জাপানের রক্ষণে অস্বস্তি তৈরি করে। বদলি নেমে আসা জুননোসুকে সুজুকির গায়ে লেগে বল কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা পায় জাপান। কিছুক্ষণ পর আবারও আক্রমণে ওঠে সেলেসাওরা। ভিনিসিয়ুসের কাছ থেকে বল পেয়ে এন্ড্রিক মার্তিনেল্লির উদ্দেশে লব পাস দিতে চাইলেও সেটি অনেক বেশি জোরে হয়ে যায়। ফলে আরেকটি সম্ভাবনাময় আক্রমণ নষ্ট হয় ব্রাজিলের।

৭৮ মিনিটে ডগলাস সান্তোসের ক্রস জাপানের রক্ষণভাগ ফিরিয়ে দিলেও বল পেয়ে যান গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। তবে তড়িঘড়ি করে নেওয়া তার শট ডান পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়। এরপর জুনিয়া ইতো ও দাইচি কামাদার বদলে মাচিনো ও তানাকাকে নামায় জাপান।

যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে নাটকীয়ভাবে জয়সূচক গোল পায় ব্রাজিল। বক্সের ঠিক বাইরে ভয়ংকর জায়গায় তানাকা বল হারালে সেটি পান ব্রুনো গিমারায়েস। তার বাড়ানো পাসে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি মুহূর্তের মধ্যে বাঁ পা থেকে বল ডান পায়ে এনে শট নেন। বল সুজুকিকে পরাস্ত করে পোস্টে লেগে জালে জড়ায়। তার গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় নিয়ে শেষ ষোলোয় ওঠে ব্রাজিল।