মর্ত্য ছেড়ে এখন স্বর্গের বাসিন্দা ‘ফুটবলের রাজা’ এডসন আরানতেস দো নাসিমেন্তো পেলে। ব্রাজিলের অজ পাড়াগাঁয়ে জন্মগ্রহণ করা এ নক্ষত্র ঐন্দ্রজালিক ফুটবল খেলে দুনিয়াটাই পাল্টে দিয়েছেন। পাল্টে দিয়েছেন ব্রাজিলকে, আলাদাভাবে জায়গা করে দিয়েছেন বিশ্ব মানচিত্রে। তিনি বিশ্ব ক্রীড়ার মহান অধিপতি, যেন রাজাদেরও রাজা। বিশ্ব শাসন করা ব্যক্তিত্বরাও তার সান্নিধ্যে গৌরব অনুভব করেছেন। তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বের বিশেষ ‘দূত’। তার মৃত্যুতে যে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো তা হয়তো পূরণ হওয়ার নয়।

আশির দশকে যুক্তরাষ্ট্রের পরাক্রমশালী রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রিগান পেলের সামনে বলছিলেন, আমার নাম রোনাল্ড রিগান, আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। কিন্তু আপনার তো নিজের পরিচয় দেয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ প্রত্যেকেই জানে, পেলে কে।

এই হলেন পেলে। রিগানের আগে আরো দুজন আমেরিকান রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে গেছে পেলের। রিগানের সঙ্গে সাক্ষাতেরও বছর দশেক আগে পেলের দেখা হয় রিচার্ড নিক্সনের সঙ্গে। এরপর আরো কত কত। বহু রাষ্ট্রনায়ক, সিনেমা আর নানা জগতের নামিদামি ব্যক্তিদের আকর্ষণের কেন্দ্রে স্থান করে নেন পেলে। তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বের মুখ।

তিনবারের বিশ্বজয়ী ফুটবলের এই মহান শিল্পী টাচলাইনের বাইরেও ঈর্ষণীয় এক জীবনের অধিকারী হয়েছেন। তার জীবনটা যেন একটি রঙিন সিনেমা। ফুটবল শৌর্য আর অনুপম ব্যক্তিত্ব মিলে তিনি যেন এক রূপকথার গল্প।

পেলে বলেই তাকে নিয়ে জন্ম হয় কত কত রূপকথা। কখনোবা সত্য ঘটনাও যেন রূপকথাকে ছাড়িয়ে যায়। ১৯৬৯ সালে একটি প্রীতি ম্যাচ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত নাইজেরিয়ায়। কিন্তু মহাতারকা পেলেকে কোনোভাবে দেশটিতে পাঠাতে রাজি ছিল না ব্রাজিল। এরপর যা হলো, তার ‘সত্য-মিথ্যা’ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সেই গল্প কখনো হারাবে না। শোনা যায়, পেলের উপস্থিতির কারণে থমকে গিয়েছিল গৃহযুদ্ধ।

বৃহস্পতিবার ব্রাজিলের সাও পাওলোর এক হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন পেলে। খেলায় তার পারদর্শিতা কল্পনার সীমাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তার গল্প ছড়িয়ে পড়েছিল খেলাধুলার বাইরের জগতেও। এর মধ্যে অন্যতম গৃহযুদ্ধ থেমে যাওয়ার ঘটনাটি। জীবনযুদ্ধে তার হেরে যাওয়ার পর উঠে আসছে নাইজেরিয়ায় যুদ্ধ থামানোর সেই ঘটনা।

পেলের সান্তোস এফসি ফুটবল ক্লাব ছিল ১৯৬০-এর দশকে বিশ্বের জনপ্রিয় ক্লাবগুলোর একটি। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ক্লাবটি প্রীতি ম্যাচে অংশ নিত। নাইজেরিয়ায় তখন রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ চলছিল। দেশ থেকে বায়াফ্রা রাজ্যটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে এ যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয় নৃগোষ্ঠী ‘ইগাবো’ ও ‘হাউসা’। সেই যুদ্ধে ২০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে, আর গৃহহীন হয় ৪৫ লাখের মতো। 

সান্তোসের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, সেদিন বিদ্রোহীদের সঙ্গে আর যুদ্ধে জড়ায়নি সরকারি বাহিনী। সেই সময়ের মিলিটারি গভর্নর স্যামুয়েল অগবেমুদিয়া এক দিনের ছুটি ঘোষণা করে ব্রিজ খুলে দিয়েছিলেন। যাতে দুই পক্ষের মানুষ ম্যাচ উপভোগ করতে পারে। সেই ম্যাচে পেলের ব্রাজিল ২-১ গোলের জয় পায়।

ঘটনাটির সত্যতা ১৯৭৭ সালে প্রকাশ পাওয়া পেলের আত্মজীবনীতে লেখা নেই। অবশ্য ২০০৭ সালে প্রকাশিত আরেকটি আত্মজীবনীতে তিনি নাইজেরিয়ার ওই ‘যুদ্ধবিরতির’ কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, এই প্রদর্শনী ম্যাচের জন্য গৃহযুদ্ধ থামানো হবে বলে খেলোয়াড়দের জানানো হয়েছিল। যুদ্ধ আক্রান্ত নাইজেরিয়ায় যাওয়া নিয়ে ব্রাজিলে ব্যাপক দুশ্চিন্ত কাজ করছিল। তখন নাইজেরিয়া থেকে আমাদের নিশ্চিত করা হয়, আমরা যখন ওখানে খেলতে যাব তখন বায়াফ্রানরা সেখানে আক্রমণ করবে না। আর সেই ম্যাচ খেলে নিশ্চিন্তে ও সুস্থভাবেই দেশে ফিরেছিল পেলের দল।

যদিও এ ঘটনার সত্যতা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। এমনকি ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত পেলের আত্মজীবনীতে ঘটনাটির কোনো উল্লেখ ছিল না। ৩০ বছর পর প্রকাশিত আরেকটি আত্মজীবনীতে পেলে ‘যুদ্ধবিরতির’ কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘এই প্রদর্শনী ম্যাচের জন্য গৃহযুদ্ধ থামানো হবে বলে’ খেলোয়াড়দের জানানো হয়েছিল। তার কথায়, ‘আমি জানি না এই ঘটনা পুরোপুরি সত্য কিনা, তবে নাইজেরিয়ানরা আমাদের নিশ্চিতভাবে জানিয়েছিলেন যে আমরা যখন ওখানে খেলতে যাা তখন বায়াফ্রানরা সেখানে আক্রমণ করবে না।’

পেলের জন্ম ১৯৪০ সালের ২৩ অক্টোবর। ১৯৫৮ সালে ব্রাজিলের হয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জয় করেন। পরপর চারটি বিশ্বকাপে খেলেছেন। তার মধ্যে তিনবার নিজের দেশকে করেছেন চ্যাম্পিয়ন। বিশ্বের আর কোনো ফুটবলারের তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি নেই। তিনি ক্লাব ও দেশের হয়ে ১ হাজার ৩৬৩টি ম্যাচ খেলে মোট ১ হাজার ২৮১টি গোল করেছেন, যা বিশ্ব রেকর্ড।