মালাগায় গত মঙ্গলবার ডেভিস কাপে নেদারল্যান্ডসের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে বিদায় নেয় স্পেন। যদিও স্পেনের পরাজয় ছাপিয়ে এ রাতে বড় হয়ে ওঠে রাফায়েল নাদালের বিদায়ের ঘটনা। টেনিস ইতিহাসের অন্যতম সেরা এ অ্যাথলিটের ২৩ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষ হয়ে গেল এদিনই। স্পেনের গোটা ক্রীড়াঙ্গন আর বিশ্ব টেনিসের বিরাট এক শূন্যতা তৈরি করে বিদায় নিলেন ‘ম্যাটাডোর’ খ্যাত এ টেনিস বীর। অবশ্য ২২টি গ্র্যান্ড স্লাম জিতে টেনিসে অমরত্ব নিশ্চিত করেছেন আগেই।
মালাগার দর্শকে ঠাসা স্টেডিয়ামে ডাচ খেলোয়াড় বটিচ ফন ডে জ্যান্ডশালপের কাছে ৬-৪, ৬-৪ গেমে গেরে যান নাদাল। এরপর কার্লোস আলকারাজ এককের আরেক ম্যাচে তাল্লোন ক্রিতস্পোরকে হারালে ১-১-এ সমতা আসে, নাদালেরও আরেকটি পর্বে টিকে থাকার আশা জাগে। যদিও দ্বৈতে আলকারাজ ও মার্সেল গ্রানোলার্স হেরে যান জ্যান্ডশালপ ও ওয়েসলে কুলহফের কাছে। ফলে বিদায় ঘটে স্পেনের, সেই সঙ্গে নাদালেরও।
বিদায়বেলায় আবেগাপ্লুত দর্শককে নাদাল বলেছেন, ‘গত ২০ বছরের পেশাদার ক্যারিয়ারে আপনারা আমাকে ভালো সময়ে যেমন উৎসাহ দিয়েছেন, তেমনি খারাপ সময় কাটিয়ে উঠতেও পাশে ছিলেন। আমি নেদারল্যান্ডস দলকে অভিনন্দন জানাই। পাশাপাশি স্পেন দলের প্রত্যেককে জানাই ধন্যবাদ, তারাই আমাকে এ পর্যন্ত খেলার সুযোগ দিয়েছে। আমরা যেমনটি চেয়েছিলাম তেমনটি অবশ্য হলো না। আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।’
তিনি দর্শককে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সত্য বলতে কি, আপনারা এ সময়টি দেখতে চাননি। আমি কিন্তু টেনিস খেলতে ক্লান্ত নই, কিন্তু আমার শরীর আর খেলতে সায় দিচ্ছে না এবং এটি আপনাদের মেনে নিতে হবে। আমি খুবই ভাগ্যবান যে শৈশবের শখটাই পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ সময় আমি আমার ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে পেরেছি।’
বিদায়ী ম্যাচে গ্যালারিতে ১৫ হাজারেরও বেশি দর্শকের মধ্যে ছিলেন তার স্ত্রী মেরি, সন্তান রাফায়েল জুনিয়র, বাবা-মা আনা মারিয়া ও সেবাস্তিয়ান এবং বোন মারিবেল।
ইতিহাসের দ্বিতীয় সফলতম পুরুষ খেলোয়াড় হিসেবে অবসর নিলেন নাদাল। তিনি ২২ বারের গ্র্যান্ড স্লাম চ্যাম্পিয়ন। সর্বোচ্চ ২৪টি গ্র্যান্ড স্লাম জিতেছেন নোভাক জোকোভিচ, আর নারীদের মার্গারেট কোর্টও জিতেছেন ২৪টি। নাদাল এক ফ্রেঞ্চ ওপেনই জিতেছেন ১৪ বার। আর কোনো খেলোয়াড় নির্দিষ্ট কোনো আসর এত বেশিবার জেতেননি। ‘ক্লে কোর্টের রাজা’ খ্যাত নাদাল ফ্রেঞ্চ ওপেনে ১১৬ ম্যাচ খেলে ১১২টি জিতেছেন!
এছাড়া তিনি চারবার অস্ট্রেলিয়ান ওপেন এবং দুবার করে জিতেছেন ইউএস ওপেন ও উইম্বলডন শিরোপা। এর বাইরেও সাফল্য আছে। অলিম্পিকে একক ও দ্বৈতে স্বর্ণ জয়ের গৌরব অর্জন করেছেন। স্পেনকে চারবার ডেভিস কাপ শিরোপা জিততে সাহায্য করেছেন, যার সর্বশেষটি ২০১৯ সালে।
স্পেনকে অনেক কিছু দিয়েছেন নাদাল। তাই তো কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে নিয়ে তার শেষ ম্যাচে সার্ভ করার মুহূর্তে এক নারী গ্যালারি থেকে চিৎকার করে বললেন, ‘তুমি স্পেনকে গর্বিত করেছ।’
সেইদিনই কিছু সময় পর ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদেছেন নাদাল। সতীর্থদের আলিঙ্গনে বেঁধেছেন, দর্শকদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন।
টুর্নামেন্ট ডিরেক্টর ও সাবেক টেনিস খেলোয়াড় ফেলিসিয়ানো লোপেজ বলেছেন, ‘এটা পরিষ্কার যে রাফা স্পেনের ইতিহাসে সেরা অ্যাথলিট। এখন পর্যন্ত অন্যদের তুলনায় সে ছিল ভিন্ন মাপের এক খেলোয়াড়। স্পেনের অন্য অ্যাথলিটদের অসম্মান করছি না, তবে আর কেউই মনে হয় রাফার মতো সমর্থকদের এতটা অনুপ্রেরণার কারণ হতে পারেননি।’
ডেভিস কাপে নাদালের সাবেক সতীর্থ লোপেজ তাকে তুলনা করেছেন টাইগার উডস, মাইকেল জর্ডান আর মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে, যারা খেলার মানচিত্রই বদলে দিয়েছেন। লোপেজ বলেন, ‘খুব কম অ্যাথলিটই আছেন যারা তাদের খেলার বাইরে গিয়েও মানুষকে বদলে দিতে পেরেছেন, অনুপ্রাণিত করতে পেরেছেন। এ ছোট গ্রুপটিতে জায়গা পাবেন নাদাল। এখন থেকে ৪০-৫০ বছর বিশ্বের সর্বত্রই মানুষজন রাফাকে মনে রাখবেন।’
স্প্যানিশ দৈনিক এএস শিরোপা করেছে: ‘এটা ছিল বড় সম্মানের’। মার্কার শিরোনাম: ‘ধন্যবাদ, রাফা’। মুন্ডো দেপোর্তিভোর শিরোপা: ‘শাশ্বত’।
স্পেনের বিখ্যাত অ্যাথলিট হচ্ছেন গলফে পাঁচবারের মেজর চ্যাম্পিয়ন সেভে বালেস্তেরোস, পাঁচবারের ট্যুর ডি ফ্রান্সজয়ী সাইক্লিস্ট মিগুয়েল ইন্দুরাইন, দুইবারের এনবিএ চ্যাম্পিয়ন পল গ্যাসল, ফর্মুলা ওয়ানে দুইবারের চ্যাম্পিয়ন ফার্নান্দো আলোনসো, ছয়বারের মোটোজিপি চ্যাম্পিয়ন মার্ক মার্কুয়েজ, চারবারের ডাকার র্যালি চ্যাম্পিয়ন কার্লোস সেইঞ্জ। যদিও তাদের কেউই জনপ্রিয়তা কিংবা খ্যাতিতে নাদালের ধারেকাছেও ছিলেন না।
আবার ফুটবলে বিশ্বকাপজয়ী ইকার ক্যাসিয়াস কিংবা আন্দ্রেস ইনিয়েস্তারা স্পেনের গৌরব। যদিও তারা কেউই লিওনেল মেসি কিংবা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মানের নন, যারা ক্রীড়ার মহাতারকা। তেমনি নাদালও।
স্পেনের ৩৫ বছর বয়সী টেনিস সমর্থক ক্লারা গার্সিয়া নাদালের বিদায় নিয়ে বলেছেন, ‘স্প্যানিশ মানুষকে গর্বিত করেছেন নাদাল। তিনি গভীর আবেগ, নিবেদন, সৌহার্দ আর সংহতি নিয়ে স্পেনের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এটা মেনে নেয়া সত্যিই কষ্টের যে তিনি আর কোর্টে স্পেনের প্রতিনিধিত্ব করবেন না।’










