মেয়েদের বয়সভিত্তিক (অনূর্ধ্ব-১৮/১৯/২০) সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশকে এখন দক্ষিণ এশিয়ার রানী বলা যায়। পাঁচ আসরের মধ্যে চারবারই শিরোপা জয়ের গৌরব দেখিয়েছে লাল-সবুজ জার্সিধারী মেয়েরা। সর্বশষ গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার কমলাপুরের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে অনূর্ধ্ব-১৯ নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ-২০২৪-এ শিরোপা উৎসব করে সাইফুল বারী টিটুর দল। যদিও এ জয় সহজে আসেনি। মাঠ ও মাঠের বাইরের অনেক নাটকীয়তার পর বাংলাদেশ ও ভারতকে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়। এবারের আসরে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দলই শিরোপার স্বাদ পায়।   

ফাইনালে অষ্টম মিনিটে শিবানি দেবীর গোলে এগিয়ে যায় ভারত। বাংলাদেশ যখন হারের প্রহর গুনছিল তখনই প্রাণ ফেরান অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ‘মেসি’ সাগরিকা। যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে ভারতের রক্ষণব্যূহ ভেঙেচুরে দিয়ে তিনি মহামূল্যবান সমতাসূচক গোল করেন। তিনি একেবারেই শেষ দিকে গোলটি করায়  হার এড়াতে সমর্থ হয় বাংলাদেশ। 

বাইলজ অনুযায়ী, ৯০ মিনিটের পর সরাসরি টাইব্রেকারের কথা বলা আছে। এ টাইব্রেকারে হলো চরম নাটকীয়তা। এখানে প্রতিটি দলই একাদশের ১১ জনকে দিয়ে শট নেয়ায় এবং প্রত্যেকেই গোল করেন (১১-১১)। টাইব্রেকারে ২২ শটের পরও সমতা থাকায় নেপালি রেফারি অঞ্জনা রাই নিয়ম অনুযায়ী টাইব্রেকার চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ম্যাচ কমিশনার শ্রীলংকার ডি সিলভা জয়সুরিয়া ডিলান হঠাৎ সিদ্ধান্ত দিয়ে বসেন কয়েন টসের। বাংলাদেশ অধিনায়ক আফিদা খন্দকার বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই রেফারি টসও সেরে ফেলেন, যাতে ভারত জিতে যায়। 

টস জিতে ভারতীয়রা যখন উৎসব শুরু করে দেয় তখন বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারা রেফারি ও ম্যাচ কমিশনারের কাছে ছুটে গিয়ে কয়েন টসের প্রতিবাদ জানান। কারণ এটা তো বাইলজেই নেই। ম্যাচ রেফারির ভুলে তখন স্টেডিয়ামে লংকাকাণ্ড ঘটে যায়। মাঠের একদিকে ক্ষোভে ফুঁসছেন বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা, তার কাছেই ফটোসেশন আর উদযাপন করছিলেন নিতু লিন্ডা, পূজা আর শিবানীরা। অবস্থা বেগতিক দেখে ম্যাচ কমিশনার আবারো পেনাল্টি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দিলেন। যদিও তখন রেগে মাঠ ছেড়ে ড্রেসিংরুমে চলে যায় ভারতীয়রা। বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা মাঠে অপেক্ষা করতে থাকলেও অতিথি দলটি আসছিল না। কর্মকর্তারা তখন ভারতীয় দলের ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেন। এভাবে প্রায় আড়াই ঘণ্টার অচলাবস্থার অবসান হয় দুই দলকে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ঘোষণার মধ্য দিয়ে।

এ ঘটনা নিয়ে সাফের বাংলাদেশী সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক হেলাল বলেছেন, ‘যে ধরনের ঘটনা ঘটেছে, তা একেবারেই দুর্ভাগ্যজনক। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে অতীতে কখনই এ রকম কোনো কিছু হয়নি। ভুলটা হয়ে গেছে ম্যাচ কমিশনারের মাধ্যমে। সে ভুলটা করেছে। নিয়মকানুন সে পুরোপুরি না দেখে হয়তো সিদ্ধান্তটা দিয়েছে। আমি যতটুকু জানি, রেফারি খেলা চালিয়ে যেতে বলেছিল, সে (ম্যাচ কমিশনার) তখন বলেছিল রেগুলেশনে এটাই (কয়েন টস) আছে। এ ভুলটা সে করাতে এ সমস্যা হয়েছে।’

বর্ষীয়ান এ ফুটবল প্রশাসক আরো বলেন, ‘এএফসির সঙ্গে কথা বললাম আমরা; ওরা আমাদের জানাল, এটাই নিয়ম (টাইব্রেকার চালিয়ে যাওয়া)। পরে ভারতকে এটা বলা হলে তারা জানাল, তারা রাজি নয়। এ পরিস্থিতি দাঁড়াল যে আমাদের কিছু করার নেই। আমরা সমঝোতার জন্য কয়েকটা প্রস্তাব দিয়েছিলাম। এক. ম্যাচটা আমরা পরিত্যক্ত করে দেই এবং আরেকটা ম্যাচ আয়োজন করব। দুই. টাইব্রেকার চালিয়ে নেয়া এবং তিন. যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা।’

মাঝে ভারতের ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতিসহ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানালেন হেলাল। বাইলজে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ঘোষণার নিয়ম না থাকলেও সব পক্ষের সম্মতিতে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি। হেলাল বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত এ আলোচনায় অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদককে অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিষয়ে তারা রাজি হয়। আসলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাতে তাৎক্ষণিকভাবে একটা সিদ্ধান্ত দিতে হয়েছে। এছাড়া সামনে আর কোনো উপায়ও ছিল না। এখানে তো আর কারো আপিল করার কিছু নেই। দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে বলেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’

বাংলাদেশ দলের কোচ সাইফুল বারী টিটু গতকাল এক সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘যৌথ চ্যাম্পিয়ন ঘোষণাটা ন্যায্য হয়েছে। যদিও ভারত আমাদের চেয়ে ভালো খেলেছে। বাইলজে না থাকলেও যৌথ চ্যাম্পিয়ন ঘোষণাটা ন্যায্য হয়েছে, কারণ পুরো আসরে দুই দলই ভালো খেলেছে।’

বাংলাদেশ অধিনায়ক আফিদা খন্দকার সেদিনের রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘আমরা নব্বই মিনিট খেলেছি, টাইব্রেকার নিয়েছি, টসের মাধ্যমে কীভাবে একটা দলের হার-জিত হবে? এটা কোনো নিয়মের মধ্যেই পড়ে না। কেউ আমাকে কিছু বলে নাই যে টসের মাধ্যমে তুমি জিতবে বা হারবে। কিছুই বলেনি। আমাকে ডেকেছে, আমি ভেবেছি টস করার পর আমরা রি-কিক (পুনরায় টাইব্রেকার) নেব, ওরা সেভ দেবে বা এ রকম কিছু। আমাকে বলল, কয়েনের নীল পাশ ওরা, তুমি সবুজ। টস করল, ওদেরটা পড়ল, বাঁশি বাজিয়ে রেফারি ওদের জিতিয়ে দিল!’

মহানাটকীয়তা শেষে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হয়ে খুশিই আফিদা। তিনি বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম চ্যাম্পিয়ন হতে। আল্লাহ আমাদের যেভাবে চ্যাম্পিয়ন হওয়া ভাগ্যে রেখেছেন, ওভাবেই হয়েছি। এককভাবে হলে আরো বেশি ভালো লাগত, খুব খুশি হতাম। প্রথমবার অধিনায়ক হয়েছি, প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। তাও হাজার হাজার শুকরিয়া যে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। সাগরিকা গোল করে আমাদের যে খুশি দিয়েছে! তখন আমরা আশ্বাস পেয়েছি (বিশ্বাস করেছি), ভালো কিছু হবে।’

রাউন্ড রবিন লিগে শেষ মুহূর্তে গোল করে ভারতকে হারিয়ে দেন সাগরিকা। ১০ নম্বর জার্সিধারী খেলোয়াড়টি এবারো ভারতের জন্য আতঙ্কের কারণ হলেন। গোল করলেন যোগ করা সময়ে। আর তাতেই পাল্টে গেল সব সমীকরণ। অবশেষে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘প্রথমে খুব খারাপ লাগছিল, গোল দিতে পারছিলাম না। ওরাও খেলেছে, আমরাও খেলেছি। কিন্তু ওরা গোল করে ফেলেছে, আমরা পারিনি। পরে গোল করেছি। খুব ভালো লাগছে। যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হতে হলো, একটু তো আক্ষেপ আছেই। এটা তো এককভাবে আমাদের হওয়ার কথা ছিল। তার পরও অনেক খুশি যে আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি।’