সেই কাব্যই পরে রূপ নেয় জার্মান মেশিনে। নিখুঁত, নির্মম, শৃঙ্খলাবদ্ধ যন্ত্র, যার চাকা শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত থামত না। যাকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল অভেদ্য দুর্গ, যেখানে ঢুকলেই প্রতিপক্ষের স্বপ্ন ভেঙে যেত; কখনো ব্রাজিলকে সাত গোলে ছারখার করে, কখনো আর্জেন্টিনার স্বপ্নভঙ্গের ফুটবলগাথা লিখে।

কিন্তু সব অপরাজেয় সাম্রাজ্যেরই তো এক ম্রিয়মাণ গোধূলি থাকে, যেখানে বাজে কেবলই বিষাদের সুর। ২০১৪ সালে বিশ্বজয়ের পর থেকেই যেন সেই বিষাদসিন্ধুতে জার্মান শিবির। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে হতাশাজনক বিদায়, ২০২৬-এ এসেও সেই একই অন্ধকার। এবার নকআউটের প্রথম ধাপেই প্যারাগুয়ের কাছে হার। এটা কেবল টাইব্রেকারের পরাজয় নয়, এটি জার্মান দুর্গের দেয়াল থেকে খসে পড়া আরেকটি ইট। যার সাক্ষী হয়ে রইল অরলান্ডো গিলের জোড়া গ্লাভস। টাইব্রেকারে কাই হাভার্টজ ও নিক ভোল্টেমাডের শট ফিরিয়ে দিয়ে বিশ্বকাপের প্রায় শতবর্ষের ইতিহাসে জার্মানির টাইব্রেকার-অজেয় থাকার ইতিহাস বদলে দিয়েছেন তিনি। বার্নের অলৌকিকতার সেই মহাকাব্য যেখানে একদিন জন্ম নিয়েছিল, আজ সেখানে যেন বিথোভেনের সিম্ফনিও বিজয়ের নয়, বিষাদের সুর তুলে জানান দিচ্ছে জার্মানি আর ফুটবল পরাশক্তি নয়।

প্যারাগুয়ে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপ খেলছে। নকআউটে তাদের কোনো ঐতিহ্য নেই, তারকা ঝলকেও যোজন যোজন দূরে। কৌশলগত দিক থেকে ম্যাচটি ছিল ডেভিড বনাম গোলিয়াথের লড়াই। প্যারাগুয়ের কোচ গুস্তাভো আলফারো আগে থেকেই জানতেন, জার্মানির আক্রমণ রুখতে হলে রক্ষণের দেয়াল মজবুত করার বিকল্প নেই। ৪-৫-১ ফরমেশনে নিশ্ছিদ্র ব্লক তৈরি করেছিলেন। জার্মান কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান আগেই সতর্ক করেছিলেন, গুস্তাভো আলফারোর দলকে ভাঙা সহজ হবে না।

ম্যাচের শুরু থেকেই প্যারাগুয়ে তাদের রক্ষণভাগকে এতটা গভীরে নামিয়ে এনেছিল যে জার্মান খেলোয়াড়রা যেন গোলকধাঁধায় আটকে পড়েছিল। নাগেলসম্যান আক্রমণভাগে বেশকিছু পরিবর্তন এনেছিলেন। ডেনিজ উনদাভকে মূল স্ট্রাইকার হিসেবে খেলিয়ে কাই হাভার্টজকে একটু পেছনে নামিয়েছিলেন। দলের সবচেয়ে প্রতিভাবান প্লেমেকার জামাল মুসিয়ালাকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু এত সব পরিবর্তনও প্যারাগুয়ের কংক্রিটের দেয়াল ভাঙতে পারেনি।

আধুনিক ফুটবলে এ ধরনের জমাট রক্ষণ ভাঙতে প্রয়োজন হয় উইং দিয়ে দুর্দান্ত ড্রিবলিং কিংবা ছোট ছোট পাসে রক্ষণচেরা বল বাড়ানো। কিন্তু লিরয় সানে বা ফ্লোরিয়ান ভির্টজ কেউই নিজেদের নামের সুবিচার করতে পারেননি। পাভলোভিচ ও এনমেচাকে নিয়ে গড়া জার্মানির মিডফিল্ড ছন্দের অভাবে ভুগছিল। অন্যদিকে বোবাদিয়া, কুবাস, কানালে ও গুস্তাভো গোমেজদের নিয়ে গড়া প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগ প্রতিটি চ্যালেঞ্জে ছিল দারুণ এনার্জেটিক ও নিখুঁত। সময় গড়াতে জার্মানি যত অধৈর্য হয়েছে, প্যারাগুয়ে তত রক্ষণকে জমাট করেছে।

বিরতির ঠিক আগে সে ধৈর্যের পুরস্কারও পেয়ে যায় তারা। কর্নার থেকে ফিরিয়ে দেয়া বল দ্রুত ডান প্রান্তে পৌঁছে যায়। মাতিয়াস গালারসার নিখুঁত ক্রসে উঠে আসেন হুলিও এনসিসো। জার্মান রক্ষণ স্থির, ন্যুয়ারও অসহায়। স্টেডিয়ামের একাংশে তখন উৎসব, আর জার্মান সমর্থকদের চোখে ভেসে উঠতে শুরু করেছে ২০১৮ আর ২০২২-এর স্মৃতি।

দ্বিতীয়ার্ধের গল্পটাও ছিল প্রথমার্ধের মতোই। ৭৫ শতাংশ বলের দখল এবং পুরো ম্যাচে ২১টি শট নিয়েও জার্মানি যেন খেই হারিয়ে ফেলছিল। মাঝমাঠে গতি বাড়াতে এনমেচার বদলে গোরেৎস্কাকে নামান নাগেলসম্যান। তবে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই জশুয়া কিমিখের মারাত্মক ভুলে এনসিসো প্রায় দ্বিতীয় গোলটি পেয়েই যাচ্ছিলেন, যদি না ন্যুয়ার দুর্দান্ত সেভটি করতেন।

অবশেষে ৫৪ মিনিটে জার্মানি তাদের বহু কাঙ্ক্ষিত সমতাসূচক গোলটি পায়। বাঁ প্রান্ত থেকে ফ্লোরিয়ান ভির্টজের একটি দারুণ ক্রসে আলতো হেডে বল জালে জড়ান আর্সেনাল স্ট্রাইকার কাই হাভার্টজ। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, হয়তো এখান থেকেই শুরু হবে জার্মানদের চেনা প্রত্যাবর্তন। কিন্তু সেটিই ছিল ম্যাচের সবচেয়ে বড় ভ্রম।

সমতায় ফেরার পর সময় যত গড়িয়েছে, প্যারাগুয়ের রক্ষণ ততই সংগঠিত হয়েছে। অতিরিক্ত সময়ে জনাথন তাহ কর্নার থেকে বল জালে জড়িয়েও উৎসব করতে পারেননি। ভিডিও সহকারী রেফারির হস্তক্ষেপে গোল বাতিল হয়ে যায়। অতিরিক্ত সময়ের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই প্যারাগুয়ের বেঞ্চে যে উল্লাস দেখা গেল, সেটি অনেকের কাছে বিস্ময়কর লাগতে পারে। কারণ প্রতিপক্ষ ছিল জার্মানি—যারা বিশ্বকাপের ইতিহাসে টাইব্রেকারে প্রায় অজেয় এক নাম।

বিশ্বকাপের মঞ্চে কখনো টাইব্রেকারে হারেনি জার্মানরা। সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৫০ বছর ট্রাইবেকারে অপরাজিত তারা। ১৯৭৬ সালের ইউরো ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়ার আন্তোনিন পানেনকার সেই আইকনিক পেনাল্টির পর জার্মানি আর কখনো এ স্নায়ুযুদ্ধে পরাজিত হয়নি। কিন্তু ইতিহাসও কখনো কখনো নতুন লেখকের হাতে কলম তুলে দেয়। বোস্টনের রাতে সেই লেখকের নাম অরলান্ডো গিল, প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক।

মাত্র কয়েক বছর আগেও যার ফুটবলজীবন ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা, সংসার চালাতে যাকে নিজের সরঞ্জাম পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছিল, সেই গোলরক্ষকই বোস্টনের রাতে হয়ে উঠলেন এক জাতির স্বপ্নের প্রহরী। কাই হাভার্টজের শট ঠেকিয়ে প্রথম ধাক্কাটা দিলেন তিনি। এরপর নিক ভোল্টেমাডের প্রচেষ্টাও ফিরিয়ে দিলেন একই দৃঢ়তায়। গিল শুধু দুটি শটই বাঁচাননি, জার্মানির আত্মবিশ্বাসটাকেও আটকে দিয়েছিলেন গ্লাভসের মুঠোয়।

তবু নাটকের শেষ দৃশ্য তখনো বাকি। ন্যুয়ারও নিজের অভিজ্ঞতার পরিচয় দিলেন। একটি শট ফিরিয়ে দিয়ে, আরেকটি বাইরে যেতে বাধ্য করে তিনি আবারো জার্মানিকে ম্যাচে ফেরালেন। কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, পুরনো সেই ‘জার্মান অরা’ বুঝি ফিরে এসেছে। এরপর জোনাথন তাহ যখন তার শটটি আকাশে উড়িয়ে মারলেন, তখন পুরো চাপ এসে পড়ে প্যারাগুয়ের হোসে কানালের কাঁধে। গোল করলেই প্যারাগুয়ের জয়।

কে এই হোসে কানালে? ২৯ বছর বয়সী এই সেন্টারব্যাকের এ ম্যাচে খেলার কথাই ছিল না! আহত আলডেরেটের জায়গায় সুযোগ পেয়ে পুরো ১২০ মিনিট গুস্তাভো গোমেজের সঙ্গে মিলে জার্মানির আক্রমণ সামলেছেন। ষষ্ঠ পেনাল্টিটি নিতে এসে বাঁ পায়ে এমন এক বুলেট শট নিলেন, যা সরাসরি জালের ওপরের দিকে আছড়ে পড়ল। এর পরই প্যারাগুয়ের বেঞ্চ, গ্যালারি আর দেশের কোটি মানুষের বুক থেকে বেরিয়ে এল ২৮ বছরের জমে থাকা উল্লাস।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে নাগেলসম্যানের কণ্ঠ ছিল হতাশাগ্রস্ত। তিনি স্বীকার করে নিলেন রূঢ় সত্য। বললেন, ‘প্রথম রাউন্ড বা নকআউটের শুরুতেই যদি বিদায় নিতে হয়, তবে তা জার্মান ফুটবলের জন্য যথেষ্ট নয়। এটি টানা তৃতীয়বারের মতো আমাদের ভরাডুবি। আমাদের মেনে নিতে হবে, আমরা আর প্রথম সারির দলের তালিকায় নেই।’ ইঙ্গিতে বলেই দিলেন জার্মানি আর ফুটবলের পরাশক্তি নয়।

অন্যদিকে প্যারাগুয়ের জন্য এটি স্বপ্নের রাত। জয়ের পর প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট দেশটিতে জাতীয় ছুটি ঘোষণা করেছেন। রাস্তায় নেমে এসেছে লাখো জনতা। তাদের পরবর্তী প্রতিপক্ষ হয়তো কিলিয়ান এমবাপ্পে ও ওসমান দেম্বেলের শক্তিশালী ফ্রান্স। কিন্তু তাতে প্যারাগুয়ের কিছুই যায় আসে না। যারা বিশ্বকাপের মঞ্চে জার্মানির মতো পরাশক্তিকে টাইব্রেকারে বিদায় করেছে, তাদের হারানোর আর কী আছে?