জ্যামাইকা টেস্টে ১০১ রানে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। ১৫ বছর পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে টেস্ট ম্যাচ জয়ের কৃতিত্ব দেখাল টাইগাররা। এর আগে ২০০৯ সালে দুই টেস্টের সিরিজে ক্যারিবীয়দের ২-০-তে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা, সাকিব আল হাসানরা। এবার জ্যামাইকায় জিতে দুই ম্যাচের সিরিজটা ১-১-এ ড্র করতে সমর্থ হয়েছে মেহেদী হাসান মিরাজের দল। টেস্টে ২২ বারের মুখোমুখিতে এটা বাংলাদেশের পঞ্চম জয়।

বাংলাদেশ দলের অবিশ্বাস্য কামব্যাক। অ্যান্টিগায় সিরিজের প্রথম ম্যাচে ২০১ রানের বিশাল ব্যবধানে হারে পরও এভাবে সিরিজ ড্র করাটা দারুণ কৃতিত্বেরই। এছাড়া যে দলটি সর্বশেষ পাঁচটি টেস্টেই বাজেভাবে হেরেছে, তাদের জন্য জয়টি ভীষণ স্বস্তির, ভীষণ আনন্দের। জাকের আলী, নাহিদ রানা আর তাইজুল ইসলামের কল্যাণে ২০২৪ সালে দেশের বাইরে তৃতীয় টেস্ট জয় করল বাংলাদেশ, যা এক পঞ্জিকাবর্ষে টাইগারদের সর্বোচ্চ টেস্ট জয়ের রেকর্ড।

মঙ্গলবার রাতে ২৮৭ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নামা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১৮৫ রানে অলআউট করে দেয় বাংলাদেশ। বামহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম ৫০ রানে ৫ উইকেট নিয়ে ক্যারিবীয়দের হারের যন্ত্রণা দিয়েছেন। যে টেস্টে শুরু থেকেই কর্তৃত্ব করে এসেছে পেস বোলাররা সেখানে নাটকীয়ভাবে শেষ দিকে তাইজুলের ঘূর্ণিতে বেসামাল হয়ে পড়ে স্বাগতিক দলের ব্যাটাররা।

এ নিয়ে ক্যারিয়ারে ১৫তম বারের মতো, বিদেশে চতুর্থ এবং ১০ বছরের মধ্যে প্রথমবার ৫ উইকেট শিকার করেছেন তাইজুল। বাকি ৫ উইকেট ভাগাভাগি করেন হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদ ও রানা। ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ৫ উইকেট নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে প্রথম ইনিংসে ১৪৬ রানে অলআউট করেছেন রানা। দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন অভিজ্ঞ তাইজুল।

বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ১৬৪ রানে অলআউট হয়ে গেলেও দ্বিতীয় ইনিংসে তাদের প্রত্যাবর্তন ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে তরুণ মিডল অর্ডার ব্যাটার জাকের আলী অনিক ১০৬ বলে ৯১ রানের বীরোচিত ইনিংস খেলে বাংলাদেশকে ২৮৬ রানের লিড এনে দেন। মূলত সেখানেই বাংলাদেশের জয়ের ভিত রচনা করে ফেলেন তিনি। জ্যামাইকার স্যাবাইনা পার্কে টেস্টে সর্বোচ্চ ২১২ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড রয়েছে। এবারো তেমনই হলো। শুরুতে অধিনায়ক ক্রেগ ব্র্যাথওয়েট (৪৩) ও মাঝে কাভেম হজ (৫৫) ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আশা দেখালেও তাইজুলের ঘূর্ণি বিষে মিশন সম্পন্ন করা হয়নি দুজনের।

তাসকিন আহমেদ (১১ উইকেট) ও জেইডেন সিলস (১০ উইকেট) দুজনকেই যুগ্মভাবে সিরিজের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার দেয়া হয়েছেন। আর ম্যাচসেরা হয়েছেন ৬৫ উইকেট শিকারি বোলার তাইজুল ইসলাম।

সাবেক অধিনায়ক মুমিনুল হক রানে নেই। আগের টেস্টে ফিফটি করলেও জ্যামাইকায় পান জোড়া ‘ডাক’। এর মধ্য দিয়ে মোহাম্মদ আশরাফুলকে (১৬) পেছনে ফেলে টেস্টে দেশের হয়ে সর্বোচ্চবার শূন্য রানে আউট হওয়ার রেকর্ড গড়েন তিনি। এছাড়া অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি টেস্ট রানের মালিক মুশফিকুর রহিম চোটের কারণে এ সিরিজে খেলতে পারেননি। সাকিব আল হাসানও নেই। সব মিলিয়ে তারুণ্যনির্ভর দল নিয়ে আশা-নিরাশার দোলাচলে থাকা বাংলাদেশ দল প্রথম টেস্টে বাজেভাবেই হেরে বসে। সেখান থেকে রূপকথার মতোই যেন ফিরল টাইগাররা।

জয় শেষে ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মিরাজ বলেছেন, ‘খুবই ভালো লাগছে। প্রথম ম্যাচে হারার পর দ্বিতীয় ম্যাচ জিততে পেরেছি, এটা অবশ্যই বড় একটা অর্জন আমাদের। যেহেতু আমি প্রথম অধিনায়কত্ব করছি, এটা আমার জন্য বড় একটি পাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে। সবাই খুব ভালো ক্রিকেট খেলেছে। সবাই আমাকে অনেক সাপোর্ট করেছে। এজন্য কৃতিত্ব দিতে চাই সব ক্রিকেটারকে। আমি যেভাবে পরামর্শ দিয়েছি, সবাই মেনে নিয়েছে। এজন্য আমার কাছে খুব ভালো লাগছে।’

অনেকটা বৈরী কন্ডিশনে জয় পাওয়া নিয়ে মিরাজ বলেন, ‘যেহেতু এ কন্ডিশন খুব সহজ ছিল না, প্রতিটি ক্রিকেটারের জন্য অনেক কঠিন ছিল, সবাই মানসিকতা এ রকম করে নিয়েছিল যে ম্যাচটা জিততে হবে। সবাই মন থেকে চেয়েছে ম্যাচটি জেতার জন্য। এজন্যই আমরা জিততে পেরেছি।’

ম্যাচসেরা তাইজুল বলেছেন, ‘অনেকটা বৈরী কন্ডিশনে জয়। সবাই সেরাটা দিয়েছে এবং ছেলেরা মনেপ্রাণে জিততে চেয়েছে।’ বোলিং নিয়ে তিনি বলেন, ‘পেস ও স্পিন উভয় বিভাগেই আমরা দারুণ ছন্দে আছি। তাই আমরা যেকোনো ব্যাটিং অ্যাটাকের মোকাবেলা এখন করতে পারি।’

এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি লড়াই। সেন্ট কিটসে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ শুরু হবে ৮ ডিসেম্বর, সেন্ট ভিনসেন্টে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ শুরু হবে ১৫ ডিসেম্বর।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

বাংলাদেশ: ১৬৪ ও ২৬৮। ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ১৪৬ ও ১৮৫ (হজ ৫৫, ব্র্যাথওয়েট ৩৯; তাইজুল ৫/৫০, হাসান ২/২০)। ফল: বাংলাদেশ ১০১ রানে জয়ী। ম্যাচসেরা: তাইজুল ইসলাম (বাংলাদেশ)। সিরিজসেরা: তাসকিন আহমেদ (বাংলাদেশ) ও জেইডেন সিলস (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)। সিরিজ: ১-১-এ ড্র।