অ্যাজটেকদের হারিয়ে যাওয়া রাজধানীর মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা এ স্টেডিয়ামের বাতাসে যেন এখনো মিশে আছে তেনোচতিৎলানের হারানো গৌরব, প্রাচীন সূর্যপঞ্জির রহস্য আর লাতিন আমেরিকার হাজার বছরের বহু সভ্যতার হারিয়ে যাওয়া প্রতিধ্বনি। ‘এস্তাদিও অ্যাজটেকা’র মতো পৃথিবীতে খুব কম মাঠই আছে, যার ঘাসে পায়ের ছাপ রেখে গেছেন পেলে, ম্যারাডোনা ও বেকেনবাওয়ারের মতো কিংবদন্তিরা। এ স্টেডিয়ামের বাতাসে এখনো ভেসে বেড়ায় ১৯৮৬ সালের সেই বিকালের চিৎকার, যখন দিয়েগো ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমে হাত দিয়ে গোল করে জন্ম দিয়েছিলেন বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’-এর। তার মাত্র কয়েক মিনিট পরই করেছিলেন ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে একাই কাটিয়ে গিয়েছিলেন পাঁচজনকে। ম্যারাডোনা যখন ট্রফি হাতে আকাশের দিকে তাকিয়েছিলেন, সেই ছবিটি আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আইকনিক দৃশ্যগুলোর একটি হয়ে আছে।

এরও আগে ১৯৭০ সালে এ মাঠেই পেলে জিতেছিলেন নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপ। পৃথিবীর আর কোনো মানুষ সে গৌরব স্পর্শ করেনি। ব্রাজিলের হলুদ জার্সি তখন যেন সূর্যের আলো হয়ে নেমে এসেছিল মেক্সিকোর আকাশে। সেই বিশ্বকাপেই পশ্চিম জার্মানির কিংবদন্তি ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার কাঁধ স্থানচ্যুত হওয়ার পরও ব্যান্ডেজ বেঁধে খেলেছিলেন অতিরিক্ত সময়।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,২০০ মিটার ওপরে, পাতলা বাতাসের এ শহরে এই মাঠের মাটি এমন সব মুহূর্ত ধারণ করে আছে যা ফুটবল ইতিহাসে কিংবদন্তির উপাখ্যান। এখানকার উচ্চতা কেবল ভূগোলের পরিমাপ নয়। এই উচ্চতায় ফুটবলের গতি বদলে যায়, গতিপথ বদলে যায়, খেলোয়াড়ের ফুসফুসও বিদ্রোহ করে ওঠে। কিন্তু প্রতিভা এখানে তীক্ষ্ণ হয়ে জ্বলে উঠেছে বারবার।

এ মাঠেই আগামী ১১ জুন শুরু হবে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। পেলে-ম্যারাডোনার স্মৃতি যে মাটিতে মিশে আছে, সেই মাটিতে আলো, সংগীত, ইতিহাস ও ফুটবল আবারো এক হয়ে উঠবে পৃথিবীর সম্মিলিত উৎসব। এটি কেবল আরেকটি বিশ্বকাপ নয়। প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ—মেক্সিকো, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে আয়োজন করছে ফুটবলের এ মহাযজ্ঞ। কিন্তু পুরো উৎসবের প্রথম দরজাটি খুলবে মেক্সিকো। সহস্র বছরের সংস্কৃতি, রঙ, মায়া, ব্যথা ও আনন্দ নিয়ে লাতিন আমেরিকার হৃদয় নিজেই পৃথিবীকে আহ্বান জানাবে।

মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়ামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হবে ম্যাচ শুরুর ৯০ মিনিট আগে। মেক্সিকোর হাজার বছরের সভ্যতা, গান, রঙ আর উৎসব—সবকিছু ঘনীভূত হয়ে নেমে আসবে সেই সবুজ মাঠে। প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে থাকবে একটি গল্প, প্রতিটি সুরের পেছনে থাকবে শতাব্দীর স্মৃতি। এ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের নেতৃত্বে থাকবে ব্যালিখ ওয়ান্ডার স্টুডিও। এ প্রতিষ্ঠানটি পৃথিবীর বড় বড় অনুষ্ঠানের নেপথ্যে থেকে মানুষকে বিস্মিত করে এসেছে। আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে মেক্সিকোর বিখ্যাত ‘পাপেল পিকাদো’ শিল্প। কাগজ কেটে তৈরি করা রঙিন অলংকার, যা মেক্সিকোর উৎসব-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাধারণ চোখে এটি হয়তো শুধু নকশা করা রঙিন কাগজ। কিন্তু মেক্সিকোর মানুষের কাছে এটি স্মৃতি, শেকড় ও উদযাপনের ভাষা। সেই শিল্পকেই এবার রূপ দেয়া হবে বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতীকী অবয়বে।

ব্যালিখ ওয়ান্ডার স্টুডিও এ অনুষ্ঠানকে দেখছে এক মহাদেশীয় সাংস্কৃতিক সংলাপ হিসেবে। তাই মেক্সিকো, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র তিনটি দেশের উদ্বোধনী আয়োজন আলাদা হলেও তাদের মধ্যে থাকবে একটি অভিন্ন সৃজনশীল সুতো। যেন তিনটি দেশ তিনটি আলাদা কবিতা লিখলেও সেগুলো মিলেমিশে তৈরি করবে একই মহাকাব্য।

মেক্সিকোর উদ্বোধনী মঞ্চে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠবে সংগীত। লাতিন আমেরিকার আবেগ, পপ সংস্কৃতি, আধুনিক বৈশ্বিক বিট এবং আদিবাসী ঐতিহ্যের সুর একসঙ্গে মিশে যাবে সেখানে। মঞ্চে উঠবেন আলেহান্দ্রো ফার্নান্দেস, বেলিন্দা, ড্যানি ওশান, জে বালভিন, লিলা ডাউনস ও টাইলা। সঙ্গে থাকবে দুটি ব্যান্ড দল লস অ্যাঞ্জেলেস আসুলেস ও মানা। মেক্সিকোর লোকগান থেকে আফ্রিকান পপ, রেগেটন থেকে আধুনিক বিশ্বসংগীত সবকিছু একত্র হয়ে ফুটবলকে তুলে ধরবে বৈশ্বিক মানবসংযোগের ভাষা হিসেবে।

আলেহান্দ্রো ফার্নান্দেসের কণ্ঠে থাকবে মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী গভীরতা। অন্যদিকে বেলিন্দা মঞ্চে আনবেন আধুনিক পপের উজ্জ্বলতা। জে বালভিনের উপস্থিতি পুরো অনুষ্ঠানকে নিয়ে যাবে তরুণ প্রজন্মের ডিজিটাল স্পন্দনের দিকে। লস অ্যাঞ্জেলেস আসুলেসের সুরে থাকবে রাস্তার উৎসব, নাচ, পারিবারিক আনন্দ ও লাতিন জীবনের উষ্ণতা। আর টাইলা যেন এ আয়োজনকে আফ্রিকার সঙ্গেও যুক্ত করবেন, দেখিয়ে দেবেন ফুটবল পুরো বিশ্বের সম্মিলিত হৃৎস্পন্দন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ভেতরে থাকবে মেক্সিকোর আদিবাসী শিল্পীরা, যারা হয়তো কোনোদিন এ রকম বৈশ্বিক মঞ্চে আসেননি। থাকবে আধুনিক লোকশিল্পের পরিবেশনা। যে শিল্প মেক্সিকোর রাস্তায়, মেলায়, গ্রামের উঠোনে টিকে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। নৃত্য থাকবে। শিল্প থাকবে। রঙ থাকবে। মেক্সিকোর প্রতিটি প্রদেশের একটি টুকরো একসঙ্গে এসে মিলে যাবে সেই মঞ্চে।

স্টেডিয়ামের দর্শকরাও এখানে কেবল দর্শক হয়ে থাকবেন না। ফিফা বলছে, পুরো অনুষ্ঠানে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। গ্যালারির প্রতিটি মানুষও এ মহোৎসবের সহনির্মাতা। ৪ ঘণ্টা আগে স্টেডিয়ামের গেট খুলে দেয়া হবে। ম্যাচ শুরুর অনেক আগেই দর্শকরা ঢুকে পড়বেন নানা ধরনের প্রি-ম্যাচ বিনোদন, বিশেষ প্রদর্শনী, ইন্টার‌্যাকটিভ অভিজ্ঞতা ও পুরস্কারভিত্তিক কার্যক্রমে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রথম ম্যাচেই মুখোমুখি হবে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা। মেক্সিকো সিটির এ স্টেডিয়াম নিজেও ইতিহাসের অংশ হতে যাচ্ছে। এটিই হবে পৃথিবীর প্রথম স্টেডিয়াম, যেখানে তিনটি আলাদা ফিফা বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজন করা হবে। সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটা এক স্থাপত্য যেন আবারো নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করবে। অতীতের কিংবদন্তিরা যেখানে একসময় খেলেছেন, সেখানেই এবার নতুন প্রজন্মের বিশ্বকাপ শুরু হবে আলো, সংগীত, ঐতিহ্য ও আবেগের মধ্য দিয়ে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেছেন, বিশ্বকাপ এমন একটি মুহূর্ত, যা পুরো পৃথিবী একসঙ্গে অনুভব করে। তার ভাষায়, উদ্বোধনী আয়োজন সেই সম্মিলিত অনুভূতির প্রথম প্রকাশ। মেক্সিকো সিটি থেকে শুরু হয়ে টরন্টো ও লস অ্যাঞ্জেলেস পর্যন্ত বিস্তৃত এ অনুষ্ঠানগুলো দেখাবে কীভাবে ভিন্নতা ও ঐক্য একই সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে।

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানগুলো বহুদিন ধরেই ফুটবলের বাইরের আরেকটি প্রতিযোগিতা। কে কত বড়, কত ব্যয়বহুল বা কত প্রযুক্তিনির্ভর আয়োজন করতে পারে তারও এক নীরব লড়াই চলে সেখানে। কিন্তু মেক্সিকো এবার অন্য পথে হাঁটতে চাইছে। তারা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে, কিন্তু প্রযুক্তিকে কেন্দ্র বানাচ্ছে না। তারা মূলত নিজেদের সংস্কৃতিকেই সামনে আনছে।

এ আয়োজনের ভেতরে তাই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বার্তাও লুকিয়ে আছে। এমন এক সময়ে বিশ্ব ক্রমেই বিভক্ত হয়ে উঠছে ভাষা, জাতি, সীমান্ত, অভিবাসন ও পরিচয়ের প্রশ্নে ঠিক তখন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি দাঁড়াতে চাইছে সংযোগের প্রতীক হয়ে। এখানে আফ্রিকার শিল্পী, লাতিন আমেরিকার সুর, উত্তর আমেরিকার মঞ্চ এবং বৈশ্বিক দর্শক একসঙ্গে মিলিত হবে। ফুটবল যেন আবারো প্রমাণ করতে চাইবে, মানুষের মধ্যে দূরত্ব যতই বাড়ুক, আনন্দের ভাষা এখনো অভিন্ন।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ মোট ১০৪টি ম্যাচ হবে ১৬টি ভিন্ন শহরে। মেক্সিকো সিটির উদ্বোধনী রাত থেকে শুরু হয়ে এ যাত্রা শেষ হবে ১৯ জুলাই নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের ফাইনালে। কিন্তু পুরো মহাযজ্ঞের স্মৃতিতে প্রথম যে দৃশ্যটি সবচেয়ে গভীরভাবে থেকে যেতে পারে, সেটি হয়তো হবে সেই উদ্বোধনী রাত। যখন স্টেডিয়ামের আকাশে উড়বে রঙিন পাপেল পিকাদো, আলো ঝলমলে মঞ্চে গাইবেন শিল্পীরা, হাজারো দর্শক একসঙ্গে চিৎকার করবে পৃথিবী বুঝে যাবে আবার শুরু হয়ে গেছে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’।