ফুটবলের দলবদলে টাকা ঢালায় ‘খ্যাতি’ আছে ইউরোপের চেলসি, ম্যানচেস্টার সিটি, প্যারিস সেন্ট জার্মেই, বার্সেলোনা কিংবা রিয়াল মাদ্রিদের মতো দলের। এক্ষেত্রে ইংলিশ ক্লাব লিভারপুল চিরাচরিতভাবে একটু ‘রক্ষণশীল’। বেশি খরুচে ক্লাবের সমালোচনা করতেও দেখা গেছে লিভারপুলের সাবেক কোচদের। তবে এবারের গ্রীষ্মকালীন দলবদলে তারা বেশ সাহসী। এরই মধ্যে ৪০ কোটি ডলার খরচ করে ফেলেছে অল রেডরা। লিভারপুলের সিইও বিলি হোগান স্বীকার করেছেন, ২০২৪-২৫ মৌসুমে ২০তম লিগ শিরোপা জয়ই তাদের আধুনিক পাওয়ারহাউজের মতো চলতে উদ্বুদ্ধ করছে।

দলবদলে এবার যেন টাকার বস্তা নিয়ে মাঠে নেমেছে লিভারপুল। চলতি গ্রীষ্মকালীন দলবদলে এখন পর্যন্ত খরচ ৪০ কোটি ৫০ লাখ ডলার (প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা), যা ভেঙে দিয়েছে তাদের অতীতের অনেক রেকর্ড। জার্মান ক্লাব এনট্র্যাখট ফ্রাঙ্কফুর্টের ফ্রেঞ্চ স্ট্রাইকার হুগো একিতিকের দলবদলই লিভারপুলের খরচ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। তাকে কিনতে প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়নদের খরচ প্রায় ১০ কোটি ৬৪ লাখ ডলার।

২০২৪-২৫ মৌসুমে দলবদলে ৪ কোটি ২০ লাখ ইউরো খরচ করেছিল লিভারপুল। তার আগের মৌসুমে খরচ করে ১৭ কোটি ২০ লাখ ইউরো, যা ছিল দলটির ইতিহাসে দলবদলে তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়। চলতি দলবদলের আগে লিভারপুলের সবচেয়ে বেশি খরুচে মৌসুম ছিল ২০১৮-১৯ মৌসুম। সেবার লিভারপুল খরচ করেছিল ১৯ কোটি ২২ লাখ ইউরো। লিভারপুলের এ খরচের খাতা অবশ্য প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর তুলনায় সামান্যই বলা যায়। যেমন ২০২৩-২৪ মৌসুমে লিভারপুল ১৭ কোটি ২০ লাখ ইউরো খরচ করলেও নতুন মালিকের অধীনে চেলসির খরচ ছিল ৪৬ কোটি ৪১ লাখ ইউরো!

লিগ প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় লিভারপুল সবসময়ই খরচে পিছিয়ে ছিল। তবে এবার তারা চমকে দিয়েছে সবাইকে। ডাচ কোচ আর্নে স্লট আসার পর প্রথম মৌসুমে তেমন খরচ না করলেও এবার তারা দেদার খরচ করছে। ফলে এরই মধ্যে তারা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। হুগো একিতিকের আগে লিভারপুল দলে ভিড়িয়েছে ফ্লোরিয়ান ভির্টৎস (১২ কোটি ৫০ লাখ ইউরো), মিলোজ কেরকেজ (৪ কোটি ৬৯ লাখ ইউরো), জেরেমি ফ্রিমপং (৪ কোটি ইউরো), আরমিন পেচসি (১০ লাখ ৭৮ হাজার ইউরো)। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত লিভারপুলের খরচ প্রায় ৩০ কোটি পাউন্ড বা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।

লিভারপুলের এ খরচ চলতি মৌসুমে সব লিগ মিলিয়ে কোনো দলের সর্বোচ্চ তো বটেই, এমনকি ২০১৬ সালের পর প্রিমিয়ার লিগের কোনো ক্লাবের দলবদলে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খরচও বটে। শেষ পর্যন্ত শীর্ষে উঠতে না পারলেও খুব শিগগির এককভাবে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসার সুযোগ রয়েছে লিভারপুলের।

চলতি দলবদলে আরো খেলোয়াড় কেনার গুঞ্জন আছে লিভারপুলের। নিউক্যাসল থেকে তারা কিনতে পারে সুইডিশ স্ট্রাইকার আলেক্সান্ডার ইসাককে। এ গুঞ্জন সত্যি হলে লিভারপুল খরচের দিক থেকে নিশ্চিতভাবে আরো ওপরে উঠে আসবে এবং ভেঙে দিতে পারে আরো কিছু রেকর্ডও। যেখানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে ইউরোপের সর্বকালের সর্বোচ্চ খরচের খাতায়ও (যেখানে ৪৬ কোটি ৪১ লাখ ইউরো নিয়ে সবার ওপরে চেলসি)।

ইসাককে চায় আরো কিছু ক্লাব। তবে তাকে সই করানোর ক্ষেত্রে লিভারপুল বেশ এগিয়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে ইএসপিএন। নিউক্যাসল যদিও বারবার বলে এসেছে, ইসাককে বিক্রি করবে না তারা। ‘ঊরুর সামান্য ইনজুরি’র কারণ দেখিয়ে তাকে সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রাক-মৌসুম সফরের ৩০ জনের স্কোয়াডেও রাখেননি নিউক্যাসল কোচ এডি হাউ। এটা জানা গেছে, ১৫ কোটি পাউন্ডের প্রস্তাব পেলে ইসাককে বিক্রি করবে ম্যাগপাইরা।

২০২২ সালে ৬৩ মিলিয়ন পাউন্ডে স্পেনের রিয়াল সোসিয়েদাদ থেকে তাকে কিনেছিল নিউক্যাসল। ক্লাবটির সঙ্গে ইসাকের চুক্তির মেয়াদ আরো তিন বছর বাকি রয়েছে। গ্রীষ্মজুড়েই ক্লাবটি বলেছে, খেলোয়াড়টিকে তারা বিক্রি করবে না। তবে বড় কোনো প্রস্তাব তাদের মনোভাব পাল্টে দিতে পারে। মূলত ইসাককে কিনতে না পেরেই ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে ২৩ বছর বয়সী হুগো একিতিকেকে কিনে নিয়েছে লিভারপুল। তবে এখনই ইসাকের আশা ছাড়েনি অল রেডরা।

কেনার বাইরে বিক্রিও চলছে। চলতি দলবদলে ইংলিশ সেন্টার-ব্যাক ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার-আর্নল্ডসহ মোট ছয়জন খেলোয়াড় বিক্রি করে লিভারপুল ঘরে তুলেছে ৮৭ মিলিয়ন ডলার। আলেক্সান্ডার-আর্নল্ড নাম লিখিয়েছেন স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদে।

এবারের আগ্রাসী ব্যয় ঐতিহ্যগতভাবে লিভারপুলের সঙ্গে মানানসই নয় সত্যি, তবে হোগান জোর দিয়ে বলেছেন, আর্থিক টেকসইতার ব্যাপারে নিজেদের নীতি থেকে সরে আসেনি লিভারপুল।

গত মৌসুমে আর্নে স্লটের শিরোপাজয়ী দলটি ঘিরে ভবিষ্যতের জন্য সংহত স্কোয়াড গঠনের আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়েছে আমেরিকান ফেনওয়ে স্পোর্টস গ্রুপ (এফএসজি)। হোগান বলেন, ‘২০তম লিগ শিরোপা জয়ের পর এটা প্রমাণিত হয়েছে যে আমরা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্লাব। আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে বড় ক্লাবের মতোই আচরণ করব আমরা। বেশকিছু বৈশ্বিক তারকা অ্যানফিল্ডে আসছেন এবং খেলছেন, প্রাক-মৌসুম সফরে হংকং ও জাপানের স্টেডিয়ামগুলো পূর্ণ হয়ে উঠবে, আমরা এটাই চাই।’ প্রাক-মৌসুম সফরে প্রথমেই হংকং পৌঁছেছে লিভারপুল।

কাউলুন স্টেডিয়ামে গতকাল ইতালির ক্লাব এসি মিলানের মুখোমুখি হয় ইংলিশ জায়ান্টরা। আগামী বুধবার তারা জাপানের ইয়োকোহামা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে জে লিগের দল ইয়োকোহামা এফএমের। এ দুটি ম্যাচই ওয়ার্ল্ড চ্যালেঞ্জ কাপের অংশ। অল রেডরা প্রিমিয়ার লিগ মিশন শুরু করবে ১৫ আগস্ট বোর্নমাউথের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। ইএসপিএন, বিবিসি