ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে অনুষ্ঠিত ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে প্রথম দুই আসরের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে প্রথমবার দেখা হয় নবাগত বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের। ডাবলিনে সেই ম্যাচে ২৫ রানে ৫ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে ১৮২ রানে গুটিয়ে দিয়েছিলেন ফাস্ট বোলিং গ্রেট কোর্টনি ওয়ালশ। ম্যাচে ৭ উইকেটের জয় পায় ক্যারিবীয়রা। সেই থেকে এখন পর্যন্ত ৫০ ওভারের ফরম্যাটে ৪৪ বারের মুখোমুখিতে উভয় দল সমান ২১টি করে ম্যাচ জিতেছে! টেস্ট আর টি-টোয়েন্টিতে যোজন যোজন পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশ এই ফরম্যাটেই কেবল ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে সমানে সমান লড়েছে।
প্রথম ১৩ ওয়ানডের ম্যাচে দুটি ছিল ফলহীন। বাকি ১১টিতে জিতেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এর পরও লড়াইয়ের ফল ২১-২১! অর্থাৎ পরের দিকের লড়াইগুলোয় বেশির ভাগই জিতেছে বাংলাদেশ। ১৪তম ম্যাচে প্রথম জয়ের দেখা পায় টাইগাররা। ২০০৯ সালে ডমিনিকার উইন্ডসর পার্কে প্রথমবারের মতো ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে দেয় বাংলাদেশ। সেই জয়ের নায়ক ছিলেন স্পিনার আব্দুর রাজ্জাক। মোহাম্মদ আশরাফুল আর সাকিব আল হাসানের ফিফটিতে বাংলাদেশ ২৪২ রানের পুঁজি গড়ার পর ৩৯ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ক্যারিবীয়দের হারিয়ে দেন।
প্রথম জয়ের পর পরের ৩০ ম্যাচের মধ্যে বাংলাদেশ জিতেছে ২০টি! এমনকি ২০২২ সালের সর্বশেষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরেও ৩-০ ব্যবধানে স্বাগতিক দলকে হোয়াইটওয়াশ করার কৃতিত্ব দেখায় তামিম ইকবালের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ। ব্যাট হাতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে তামিম হয়েছিলেন সিরিজসেরা খেলোয়াড়। যদিও তিন ম্যাচে ভিন্ন ভিন্ন তিনজন ছিলেন ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’। এক ম্যাচে মেহেদী হাসান মিরাজ (৩/৩৬), এক ম্যাচে নাসুম আহমেদ (৩/১৯) ও তৃতীয় ম্যাচে তাইজুল ইসলাম (৫/২৮) ম্যাচসেরা হন।
প্রায় আড়াই বছর পর আবারো ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাঠে ওয়ানডে সিরিজ খেলতে নামছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ সিরিজের সাফল্যের কথা সগৌরবে মনে রেখেই এবার খেলতে নামছে টাইগাররা। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে জ্যামাইকায় সম্প্রতি জেতা টেস্ট ম্যাচের আত্মবিশ্বাস। ১৫ বছর পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাঠে টেস্ট জিতেছে মেহেদী হাসান মিরাজের দল। আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় সেন্ট কিটসে শুরু হবে প্রথম ওয়ানডে।
অবশ্য ২০২২ সালে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের নায়কদের মধ্যে তামিম ইকবাল ও তাইজুল এবার দলে নেই। তামিম অনেকদিন ধরে জাতীয় দলের বাইরে। আর তাইজুল টেস্ট খেলে দেশে ফিরবেন, তিনি ওয়ানডে সিরিজের স্কোয়াডে নেই।
এখন পর্যন্ত ১১টি ওয়ানডে সিরিজে মুখোমুখি হয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও বাংলাদেশ। এর মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজ পাঁচটি ও বাংলাদেশ ছয়টি সিরিজ জিতেছে! সর্বশেষ পাঁচ সিরিজের মধ্যে চারটিই জিতেছে টাইগাররা। এই চারটির মধ্যে আবার দুটিই এসেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে। পরিসংখ্যানের বিচারে, এবার সিরিজ জয়ের আশা করতেই পারে বাংলাদেশ দল।
যদিও অনেকটা খর্বশক্তি নিয়ে নামতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। নিয়মিত অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, অভিজ্ঞ মিডল অর্ডার ব্যাটার মুশফিকুর রহিম চোটের কারণে দলে নেই। তামিম ইকবাল আর সাকিব আল হাসানও নেই। তরুণদের নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে ফিল সিমন্সের দল। তবে সাদা বলের সিরিজে তাদের প্রেরণা জোগাবে লাল বলের সিরিজটা।
দুই দলের ওয়ানডে লড়াইয়ে দলীয় সর্বোচ্চ স্কোর ৩৩৮। সেন্ট কিটসে ২০১৪ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে ৩৩৮ রানের সৌধ গড়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দিনেশ রামদিন ১২১ বলে ১৬৯ রানের অবিশ্বাস্য ইনিংস খেলেন সেদিন। জবাবে বাংলাদেশ ৮ উইকেটে ২৪৭ রান তুলতে সমর্থ হয়। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ স্কোর ৩২২ রান। ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের টন্টনে বাংলাদেশকে ৩২২ রানের টার্গেট ছুড়ে দেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। রান তাড়া করতে নেমে সাকিব আল হাসানের সেঞ্চুরিতে (৯৯ বলে ১২৪*) ভর করে ৪১.৩ ওভারেই ৩ উইকেট হারিয়ে জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ-বাংলাদেশ ওয়ানডে লড়াইয়ে মোট পাঁচবার তিনশোর্ধ্ব স্কোর হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ওয়েস্ট ইন্ডিজের, আর দুটি বাংলাদেশের গড়া। সর্বনিম্ন রানের মধ্যে পাঁচটির তিনই ওয়েস্ট ইন্ডিজের। সর্বনিম্ন ৫৮ রানের স্কোরটা বাংলাদেশের। ২০১১ বিশ্বকাপে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ১৮.৫ ওভারে ৫৮ রানে অলআউট হওয়ার লজ্জায় ডুবেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। ওই বছর অক্টোবরে চট্টগ্রামে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৬১ রানে অলআউট করে সেই লজ্জা ফিরিয়ে দিয়েছিল টাইগাররা।
দুই দলের ওয়ানডে ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রান করেছেন বাংলাদেশের তামিম ইকবাল। তিনি ৩২ ম্যাচ খেলে ৪৩.১৪ গড়ে ১ হাজার ২০৮ রান করেছেন। তামিম সেঞ্চুরি করেছেন দুটি আর ফিফটি ৯টি। আর কেউ এক হাজার রান করতে পারেননি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯৭২ রান করেছেন মুশফিকুর রহিম। তিনি খেলেছেন ২৯ ম্যাচ। মুশফিকের গড় ৪৬.২৮। এছাড়া সাকিব আল হাসান ২১ ম্যাচে ৮৩৪ রান করেছেন ৫৫.৬০ গড়ে। চার ও পাঁচে রয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের শাই হোপ (৭৭৮) ও ক্রিস গেইল (৬৬১)।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ-বাংলাদেশ ওয়ানডে লড়াইয়ে যুগ্মভাবে সবচেয়ে বেশি উইকেট শিকারের রেকর্ডটা কেমার রোচ ও মাশরাফি বিন মর্তুজার। দুজনই নিয়েছেন সমান ৩০ উইকেট এবং দুজনই খেলেছেন সমান ১৯টি ম্যাচ। মাশরাফি অবসর নিয়েছেন আর রোচ ওয়ানডে খেলেন কদাচিৎ। উইকেট শিকারে এরপর তিনটি পজিশনই বাংলাদেশের দখলে। মুস্তাফিজুর রহমান ১৬ ম্যাচে ২৮ উইকেট, মেহেদী হাসান মিরাজ ১৬ ম্যাচে ২৬ উইকেট ও সাকিব আল হাসান ২১ ম্যাচে ২৪ উইকেট নিয়েছেন। মিরাজ ৪ কিংবা ৫টি উইকেট নিলেই এই সিরিজেই এক নম্বরে উঠে যেতে পারেন।










