‘কিছু সিদ্ধান্ত থাকে, যেটা ফুটবলীয় চুক্তির বাইরে। আল হিলালে ভালোই ছিলাম। পরিবার ভালো ছিল। কিন্তু কিছু ঘটনায় সিদ্ধান্তটি নিতেই হলো। অনুশীলনে নিজেকে অসুখী লাগছিল। ফেরার সুযোগটা পেয়ে যাওয়ার পর দ্বিতীয়বার ভাবিনি। এখানে পা রাখার পর থেকেই মনে হচ্ছে, ১৭ বছর বয়সে ফিরে গেছি। খুব ভালো লাগছে এবং খেলার জন্য মুখিয়ে আছি।’

শৈশবের ক্লাব সান্তোসে ফেরার পর প্রথম প্রতিক্রিয়ায় এ কথা বলেছেন ব্রাজিলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা নেইমার। তিনি ইউরোপ ও এশিয়ার অধ্যায় শেষ করে ফিরলেন সান্তোসে। এ যেন ঘরের ছেলের ঘরে ফেরা। তাই তো সান্তোসের হোম ভিলা বেলমিরোয় খুব বড় একটা ইলেকট্রনিক ব্যানারে লেখা রয়েছে ‘দ্য প্রিন্স ইজ ব্যাক’।

তাকে বরণ করতে সান্তোসে প্রস্তুতির কোনো কমতি ছিল না। এআই প্রযুক্তির সাহায্যে গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে স্টেডিয়ামের বাইরে—নেইমারের মাথায় মুকুট। ছয় মাসের চুক্তিপত্রে সইয়ের পরই আনুষ্ঠানিকভাবে সান্তোসের হয়ে গেলেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ‘দ্য প্রিন্স ইজ ব্যাক’ নামে একটি ভিডিও ছেড়েছিল সান্তোস। এর আগে এআই প্রযুক্তির সাহায্যে পেলের কণ্ঠস্বরে নেইমারকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে একটি ভিডিও ছাড়া হয়েছিল। সেটারই দ্বিতীয় সংস্করণে প্রয়াত কিংবদন্তির প্রতি নেইমারকে বলতে শোনা যায়, ‘কিং পেলে, আপনার ইচ্ছা আমার জন্য নির্দেশ। সিংহাসন ও মুকুট আপনারই আছে। কারণ আপনি চিরকালীন। কিন্তু পবিত্র ১০ নম্বর জার্সিটা পরা হবে সম্মানের, যেটা সান্তোস ও এ পৃথিবীর জন্য অনেক কিছু। আপনার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারকে সম্মান দিতে আমি সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।’

সৌদি আরবে আল হিলালের পাট চুকিয়ে শৈশবের ক্লাবে নেইমারের ফেরার খবরটা কয়েকদিন ধরেই চাউর হয়ে যায়। এখন আর বিষয়টি গুঞ্জন নয়, সত্যিই ঘটল এমনটি। বার্সেলোনা, পিএসজিতে খেলার পর সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি আল হিলালে নাম লিখিয়েছিলেন। সাফল্য ও ব্যর্থতায় মোড়ানো ‘বিদেশ’ অধ্যায় শেষ করে এবার তিনি ফিরলেন নিজ দেশে।

নেইমারকে বরণ করে নিতে শুক্রবার কনসার্টের আয়োজন করেছিল সান্তোস। ভিলা বেলমিরোয় ২০ হাজার দর্শক উপভোগ করেছেন সেই কনসার্ট। তার আগে শুক্রবার ব্রাজিলের স্থানীয় সময় সকালে সাও পাওলোয় অবতরণ করে নেইমারের ব্যক্তিগত বিমান। কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে হেলিকপ্টারে করে সান্তোসে ফিরেছেন এ ফরওয়ার্ড। বৃষ্টির মধ্যেই মাঠের মাঝে মঞ্চে উঠেছেন তিনি। দর্শকদের উদ্দেশে হাত নেড়েছেন। ঘরের ছেলেকে তারা বরণ করেছেন পরম ভালোবাসায়। মাটিতে মাথা ও হাত নুইয়ে নিজের বিখ্যাত গোল উদ্‌যাপন ভঙ্গিমার পর সান্তোসের মাটিতে চুমুও খেয়েছেন। সমর্থকদের উদ্দেশে নেইমার বলেছেন, ‘আমি খুবই সুখী। এখানে দারুণ সময় কেটেছে। সামনে তেমন সময় আরো আছে। (ড্রিবল করতে) সাহসের অভাব হবে না।’

সান্তোসের সহসভাপতি ফার্নান্দো বোনাভিদেস ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘এ চুক্তিপত্র প্রাথমিকভাবে ছয় মাসের। কিন্তু তাকে ধরে রাখতে আমরা সব রকম চেষ্টাই করব। আমরা যেটা চাচ্ছি, সে যেন আগামী বিশ্বকাপ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে থাকে।’

নেইমারের টার্গেট মূলত ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ। হয়তো সে কারণেই তিনি সান্তোসে পাড়ি জমালেন। বিশ্বকাপে খেলতে আগে তো ব্রাজিল দলে নিয়মিত হওয়া চাই। এ নিয়ে নেইমার বলেছেন, ‘আমি জাতীয় দলে ফিরতে চাই। অর্জনের জন্য এখনো একটি (বিশ্বকাপ) মিশন বাকি আছে, যেটা আমার শেষ সুযোগ বলে মনে করি। যা-ই হোক না কেন, আমি এটার পেছনে ছুটব।’

সান্তোসের বয়সভিত্তিক দলে খেলেই বেড়ে ওঠেন নেইমার। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত খেলেছেন ক্লাবটির মূল দলে। প্রথম স্পেলে ২২৫ ম্যাচ খেলে করেছেন ১৩৮ গোল। ‘নতুন পেলে’ তকমা নিয়ে তখনই তিনি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। এরপর ইউরোপযাত্রা। ২০১৩ সালে ৮ কোটি ৬২ লাখ ইউরো ফি দিয়ে তাকে সই করায় ওই সময় ইউরোপের অন্যতম সেরা ক্লাব বার্সেলোনা, যে ক্লাবের প্রাণভোমরা আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি লিওনেল মেসি আর উরুগুয়ের লুই সুয়ারেজ। তিনজন মিলে গড়ে তোলেন বিশ্বের ভয়ংকর ‘এমএসএন’ আক্রমণ ত্রয়ী। বার্সায় ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১২৩ ম্যাচ খেলে ৬৩ গোল করেছেন তিনি।

২০১৭ সালে ইতিহাস গড়ে নেইমারকে সই করায় ফরাসি ক্লাব পিএসজি। তাকে বার্সার রিলিজ ক্লজের ২২২ মিলিয়ন ইউরো পরিশোধ করে ‘ছিনিয়ে নেয়’ প্যারিসের ক্লাবটি। তাকে নিয়ে অবশ্য ক্লাবটির প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ফরাসিরা চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা জিততে পারেনি। এমনকি নেইমারের সাবেক সতীর্থ মেসিকে নিয়েও স্বপ্নপূরণ হয়নি তাদের। ১১২ ম্যাচে ৮২ গোল করা নেইমারের পিএসজি অধ্যায় শেষ হয় ২০২৩ সালে। পেট্রোডলারের হাতছানিতে তিনি পাড়ি জমান আল হিলালে। অবশ্য চোটের সঙ্গে লড়াই করতে করতেই শেষ হয় তার আল হিলাল অধ্যায়। সেখানে মাত্র ৩ ম্যাচ খেলেছেন তিনি।

২০২৩ সালে শীর্ষ লিগ থেকে অবনমিত হয়ে যায় সান্তোস, ফিরেছে পরের বছর। সান্তোসের বাসিন্দা ৪৩ বছর বয়সী অ্যান্ডারসন সুজা এ নিয়ে বলেছেন, ‘পেলের মৃত্যুর পর সান্তোস অবনমিত হয়ে যায়। আশা করি সে (নেইমার) কিছু আশার সঞ্চার করবে। মানুষের সেটা প্রয়োজন। তবে তার এটা জানা প্রয়োজন যে তাকে পারফর্ম করতে হবে, তাকে সেরা চেষ্টাটা করতে হবে। সান্তোসের সমর্থকরা তাকে ভালোবাসে, তবে তারা বোকা নয়।’

প্রায় এক যুগ পর সান্তোসে ফিরলেন নেইমার। প্রথম দফায় খেলেছেন ১১ নম্বর জার্সিতে, এবার ১০ নম্বর। গত বছর নভেম্বরে আল হিলালের হয়ে ম্যাচে চোট পাওয়ার পর আর মাঠে নামা হয়নি। সংবাদ সম্মেলনে নেইমার জানিয়েছেন, শারীরিকভাবে আগের চেয়ে ভালো বোধ করলেও এখনো শতভাগ ফিটনেস ফিরে পাননি।

ক্যাম্পেওনাতো পলিস্তায় আগামী বুধবার বোটাফোগোর মুখোমুখি হবে সান্তোস। এ ম্যাচে সান্তোসের হয়ে দ্বিতীয়বার অভিষেক হবে কি নেইমারের?