অবিশ্বাস্য ফর্মে রয়েছেন ৩৫ বছর বয়সী বিরাট কোহলি। বিশ্বকাপে ফাইনালের আগেই করে ফেলেছেন সাতশরও বেশি রান! সর্বশেষ চার ম্যাচে তার ব্যাট থেকে এসেছে যথাক্রমে ৮৮, ১০১*, ৫১ ও ১১৭ রান! এর মধ্য দিয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে চলতি ত্রয়োদশ ওয়ানডে বিশ্বকাপে রান চার্টে ১ নম্বরে উঠে গেছেন তিনি। ১০ ম্যাচে তার রান ৭১১। প্রথম ব্যাটার হিসেবে এক বিশ্বকাপে ৭০০ রান করারও কৃতিত্ব দেখান তিনি। এর আগে এক বিশ্বকাপ আসরে সর্বোচ্চ ৬৭৩ রান করার গৌরব ছিল শচীন টেন্ডুলকারের।
এবার কোহলির শীর্ষ রান সংগ্রাহক হওয়া প্রায় শতভাগ নিশ্চিত। তার পরের তিনজনই বিশ্বকাপ থেকে এরই মধ্যে বিদায় নিয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার কুইন্টন ডি কক (৫৯৪) এবং নিউজিল্যান্ডের রাচিন রবীন্দ্র (৫৭৮) ও ড্যারিল মিচেলের (৫৫২) পক্ষে আর কোহলিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া সম্ভব নয়। ৫৫০ রান নিয়ে চার্টের পাঁচে থাকা রোহিত শর্মার পক্ষে কোহলিকে ধরা কঠিনই। কেননা ফাইনালে কোহলি শূন্য করলেও রোহিতকে করতে হবে ১৬২ রান। একইভাবে কোহলিকে টপকাতে অস্ট্রেলিয়ার ডেভিড ওয়ার্নারকে করতে হবে ১৮৪ রান, যদি কোহলি শূন্য করেন।
কাজেই চোখ বন্ধ করেই বলে দেয়া যায়, এবারের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান করার গৌরবের অধিকারী হচ্ছেন কোহলিই, যিনি শচীনকে টপকে এ আসরে ওয়ানডে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ৫০টি সেঞ্চুরি, বিশ্বকাপের এক আসরে টানা আটটি ফিফটি ছাড়ানো স্কোরসহ অসংখ্য রেকর্ড গড়েছেন।
রাউন্ড রবিন লিগের অষ্টম রাউন্ড পর্যন্ত রান চার্টে ১ নম্বরে ছিলেন ডি কক। ৯ ম্যাচে ৫৯১ রান করে চার্টের শীর্ষে অবস্থান করছিলেন তিনি। যদিও বেঙ্গালুরুতে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৫১ রানের ইনিংস খেলে ডি ককের কাছ থেকে ব্যাটনটা নিয়ে নেন কোহলি। পরে সেমিফাইনালে খেললেন ১১৭ রানের রাজসিক ইনিংস। ডি কককে ১২০ রানে পেছনে ফেলেন তিনি। ডি ককের সামনে সুযোগ ছিল কোহলিকে ধরার কিংবা টপকে যাওয়ার। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে ডি কক করেন মাত্র ৩ রান! আর প্রোটিয়ারা বিদায় নেয়ায় তার সব সুযোগও শেষ।
রানের লড়াইয়ে কোহলির কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করলেন ডি কক। অথচ এ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ চারটি সেঞ্চুরির মালিক তিনি। ১০৭ স্ট্রাইক রেটে রান করা এ ব্যাটারকে কেউ ধরতে পারবে, এমনটি মনেই হয়নি। ‘কিং কোহলি’ অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছুটে পেছনে ফেলেন ডি কক ও রাচিনকে।
নিউজিল্যান্ডের ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যাটার রাচিন ১০ ইনিংসে ৬৪.২২ গড়ে ও ১০৬.৪৪ স্ট্রাইক রেটে করেছেন ৫৭৮ রান। ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ১৩৪ রানের রাজসিক ইনিংস খেলা আরেক কিউই ব্যাটার ড্যারিল মিচেল ৫৫২ রান নিয়ে আছেন চার্টের ৪ নম্বরে। এক সেঞ্চুরি ও তিন হাফ সেঞ্চুরিতে ৫৫০ রান করে চার্টের শীর্ষ পাঁচ পূর্ণ করেছেন ভারতীয় দলনায়ক রোহিত শর্মা। রোহিত এবার একটি সেঞ্চুরি করে শচীন টেন্ডুলকারকে টপকে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ সাত সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েছেন। ছয়টি সেঞ্চুরি নিয়ে তার পরেই আছেন ওয়ার্নার।
এরপর ভারতের শ্রেয়াস আইয়ার (৫২৬ রান), দক্ষিণ আফ্রিকার রাসি ফন ডার ডুসেন (৪৪৮ রান), অস্ট্রেলিয়ার মিচেল মার্শ (৪২৬ রান) ও দক্ষিণ আফ্রিকার এইডেন মার্করাম (৪০৬ রান)।
রানের মতো উইকেট শিকারের রাজত্বও এক ভারতীয়র। তিনি পেস বোলার মোহাম্মদ শামি। অবিশ্বাস্য, অভাবনীয় বোলিং করে চলেছেন এ ডানহাতি পেস তারকা। মাত্র ৬ ইনিংসে ৯.১৩ গড় ও ৫.০১ ইকোনমি রেটে ২৩ উইকেট নিয়ে চার্টের ১ নম্বরে তিনি। অথচ এক ম্যাচ আগেও কেউ এমনটা কল্পনাও করতে পারেননি। ১৬ উইকেট নিয়ে ছিলেন তালিকার অনেক নিচের দিকে। এরপর শামি ম্যাজিক। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে একাই তুলে নেন ৭ উইকেট। এটা বিশ্বকাপে এক ম্যাচে যুগ্মভাবে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের রেকর্ড। বীরত্বপূর্ণ এ বোলিংয়ে তিনি এবারের আসরে উইকেট শিকারিদের চার্টে উঠে যান ১ নম্বরে। নাটকীয়ভাবে দুইয়ে নেমে যান অস্ট্রেলিয়ার লেগ স্পিনার অ্যাডাম জাম্পা, যিনি ২২ উইকেট নিয়ে এবারের আসরে শীর্ষ শিকারি হওয়া নিয়ে মোটামুটি নিশ্চিতই ছিলেন।
তালিকায় এর পরই আছেন শ্রীলংকার দিলশান মাদুশঙ্কা (৯ ম্যাচে ২১ উইকেট), দক্ষিণ আফ্রিকার জেরাল্ড কোয়েৎজি (৮ ম্যাচে ২০ উইকেট), ভারতের জসপ্রীত বুমরাহ (১০ ম্যাচে ১৮ উইকেট), পাকিস্তানের শাহিন শাহ আফ্রিদি (৯ ম্যাচে ১৮ উইকেট) ও দক্ষিণ আফ্রিকার মার্কো ইয়ানসেন (৯ ম্যাচে ১৭ উইকেট)।
জাম্পার সামনে শীর্ষে ওঠার সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আজ ফাইনালে শিরোপার লড়াইয়ে নামছে দুই দল। এ লড়াইয়ের ভেতরে থাকবে খণ্ড খণ্ড ব্যক্তিগত লড়াইও। শামি ও জাম্পার মধ্যে হবে উইকেটের শীর্ষস্থান দখলের লড়াই।
শামির উত্থানটা বিস্ময়করই। সম্প্রতি শুধুই টেস্টের বোলার হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ওয়ানডে ও টি২০ দলে সুযোগ পাচ্ছিলেন না। চলতি বিশ্বকাপে তাকে স্কোয়াডে নেয়া হলে সমালোচনা হয়। প্রশ্ন ওঠে, প্রায় এক বছর সাদা বলের ক্রিকেট না খেলা শামিকে নেয়ার সিদ্ধান্ত না দলকে ডোবায়। বিশ্বকাপেও সুযোগ পাচ্ছিলেন না। অবশেষে পঞ্চম ম্যাচে সুযোগ মেলে তার। প্রথম ম্যাচেই বাজিমাত। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে নেন ৫ উইকেট। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। রোলারকোস্টারে চেপে ছুটছেন তিনি, টানছেন দলকেও। সর্বশেষ সেমিফাইনালে ৭ উইকেট নিয়ে নিউজিল্যান্ডের স্বপ্নকে ধ্বংস করেছেন শামিই। তাই এখন শামির জয়গান।
কিংবদন্তি পাকিস্তানি ফাস্ট বোলার ওয়াসিম আকরামের কথাই শুনুন, ‘আমি এত ভালো সিমে বল করতে কাউকে দেখিনি। শামিকে ঘুম থেকে উঠে বল করালেও বোধ হয় এভাবেই বল করবে। এক কথায় অবিশ্বাস্য।’
অথচ দলে সুযোগ পাওয়ার পরও শামির বিশ্বকাপ খেলা ছিল ঘোর অনিশ্চিত। স্ত্রী হাসিন জাহানের করা মামলায় আদালতে গিয়ে আগাম জামিন নিতে হয় শামিকে। তবেই খেলার সুযোগ পান বিশ্বকাপে। সেই শামি এখন একের পর এক ম্যাচে ভারতের জয়ের নায়ক।
শামির দুর্বার ছুটে চলা। অথচ প্রথম চার ম্যাচে বেঞ্চেই বসে কাটান তিনি। ছিলেন সুযোগের অপেক্ষায়। ভারতীয় সহ-অধিনায়ক হার্দিক পান্ডিয়া বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচে চোট পেয়ে ছিটকে গেলে কপাল খুলে যায় শামির। সুযোগ পেয়েই ধর্মশালায় নিউজ়িল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি নেন ৫ উইকেট। পরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৪ উইকেট ও শ্রীলংকার বিপক্ষে ৫ উইকেট শিকার করেন।
ইডেনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নেন ২ উইকেট। বড় বড় দলকে কাবু করলেও পুচকে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৪১ রানে উইকেটশূন্য ছিলেন! চমকটা হয়তো সেমির জন্যই জমা রেখেছিলেন ৩৩ বছর বয়সী এ পেসার। ৫৭ রানে ৭ উইকেট শিকার করে ফাইনালে তুললেন ভারতকে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে ভারতের একমাত্র বোলার হিসেবে ৫০ উইকেট জমা হলো তার নামের পাশে। ১৭ ম্যাচে তার শিকার ৫৪ উইকেট। জহির খান ২৩ ম্যাচে নেন ৪৪ উইকেট। আজ তিনটি উইকেট পেলে ওয়াসিম আকরাম (৫৫) ও লাসিথ মালিঙ্গাকে টপকে অলটাইম তালিকায় চারে উঠে যাবেন শামি। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৭১ উইকেট শিকার করেন অস্ট্রেলিয়ার গ্লেন ম্যাকগ্রা।
বুধবার রেকর্ড গড়ার পর শামি বলেছেন, ‘সুযোগের অপেক্ষা করছিলাম। খুব বেশি সাদা বলের ক্রিকেট খেলার সুযোগ পাইনি। তবে সুযোগ পেলে কাজে লাগানোর চেষ্টা করি। লিগ পর্বে নিউজ়িল্যান্ডের বিপক্ষেই প্রথম সুযোগ পেয়েছিলাম। অনেকে বোলিংয়ে বৈচিত্র্যের কথা বলেন। কিন্তু আমার লক্ষ্য থাকে শুধু সঠিক জায়গায় বল ফেলা। আমি বিশ্বাস করি ঠিক জায়গায় বল রাখতে পারলে নতুন বলে উইকেট আসবেই। ম্যাচের যেকোনো সময়ই উইকেট আসতে পারে।’
আজ নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে শামির জীবনের একটি সেরা স্পেলের অপেক্ষায় থাকবে গোটা ভারতবর্ষ। কোহলি-রোহিতের ব্যাটে সুর ওঠার পাশাপাশি শামির বলের সুইং, রিভার্স সুইং আর ইয়র্কারে ভর করে ভারত পেতে পারে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বজয়ের গৌরব।










