কারো ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত সম্ভবত বিদায় নেয়া। আর খেলোয়াড়ের নাম যদি সেই ক্লাবেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে ওঠে, তাহলে সেখানেই বিষাদ না থেকেই পারে না। তবে মোহামেদ সালাহ ও লিভারপুল এখন দাঁড়িয়ে যে বিন্দুতে, সেখানে বিষাদের চেয়ে তিক্ততাই যেন বেশি! সালাহ লিভারপুলের হয়ে তার শেষ ম্যাচটি এরই মধ্যে খেলে ফেলেছেন—এ আশঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে অ্যানফিল্ডে।
সালাহর দিকে এখন শুধু অ্যানফিল্ড নয়, তাকিয়ে আছে পুরো ফুটবল বিশ্ব। তিনি বেঞ্চে থাকুন, গ্যালারিতে বসে থাকুন কিংবা মাঠে নামুন—তাতে বিশেষ কিছু বদলাবে না। আলোটা তার দিকেই থাকবে। কারণ আজ তিনি আফ্রিকা কাপ অব নেশনস খেলতে মিসরের জাতীয় দলের সঙ্গে যোগ দিতে যাচ্ছেন। কিন্তু তার আগে লিভারপুলের সামনে ছিল এক বড় ম্যাচ—যেটি হয়ে উঠতে পারে লাল জার্সিতে তার শেষ ম্যাচ।
পরপর তিন ম্যাচ শুরুর একাদশে না থাকা, লিডসের বিপক্ষে ৩-৩ ড্রয়ের পর বিস্ফোরক মন্তব্য, এরপর ইন্টার মিলানের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগ ম্যাচে স্কোয়াডেই না থাকা—সব মিলিয়ে সালাহ-লিভারপুল সম্পর্ক এখন প্রকাশ্য সংকটে। যদিও অনুশীলনে ফিরেছিলেন তিনি, তবু অনিশ্চয়তা কাটেনি। নিজেই বলেছিলেন, তিনি খেলবেন কিনা জানেন না—শুধু সময়টা উপভোগ করতে চান।
পরিস্থিতিটা সত্যিই বিস্ময়কর, কারণ সালাহ লিভারপুলের ইতিহাসে কেবল একজন তারকা নন, তিনি এক যুগের প্রতীক। ক্লাবের সর্বকালের গোলদাতার তালিকায় তার ওপরে কেবল ইয়ান রাশ ও রজার হান্ট। প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসে তার অবস্থানও কিংবদন্তিদের পাশে। দুটি লিগ শিরোপা, একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, চারটি গোল্ডেন বুট—৩৩ বছর বয়সেও তার পারফরম্যান্স নেমে যাবে এমনটা ভাবা যায়নি। তার ওপর গত মৌসুমে সালাহর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ভর করেই লিগ শিরোপা জেতে লিভারপুল। ‘ইজিপশিয়ান কিং’-এর এমন বিদায় কারো কল্পনায়ও ছিল না।
গত মৌসুমে লিভারপুল যখন শিরোপা জিতে উড়ছিল, তখন নীরবে তৈরি হচ্ছিল আরেক গল্প। সালাহ, ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার-আর্নল্ড ও ভ্যান ডাইকের চুক্তি শেষের পথে। ট্রেন্ট চলে গেছেন, অন্য দুজন এখনো আছেন অ্যানফিল্ডে। কিন্তু কেউই যেন নতুন বাস্তবতায় স্বস্তিতে নেই। ভ্যান ডাইকের প্রভাব আর আগের মতো দেখা যাচ্ছে না। ট্রেন্ট এখনো মাদ্রিদে নিজেকে খুঁজছেন, আর সালাহ যেন ধীরে ধীরে হয়ে পড়েছেন বিচ্ছিন্ন। রাইট ফ্ল্যাংকে এখন সালাহর জায়গায় খেলছেন সবোলাই। চলতি মৌসুমে সালাহর গোলসংখ্যা কম। নতুন ফরোয়ার্ডদের সঙ্গেও বোঝাপড়া নেই। ডান প্রান্তে রক্ষণে সহায়তার অভাব স্পষ্ট। একসময় সালাহ–ট্রেন্ট–হেন্ডারসনের ডান দিকের ত্রিভুজ ছিল লিভারপুলের সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র। নতুন ব্যবস্থায় সেই সমন্বয় ভেঙে গেছে। আর্নে স্লটের ৪-২-৩-১ ছকে সালাহর কাছ থেকে যে পরিমাণ রক্ষণাত্মক অবদান চাওয়া হচ্ছে, তা তিনি দিতে পারছেন না; বা দিতে আগ্রহী নন। এখানেই উঠে আসে বড় প্রশ্নটি—নিজেদের ‘রাজা’ ছাড়া বর্তমান প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়নরা কি আসলে ভালো খেলছে? অনেকের মতে, সালাহ না থাকায় দলটি এখন বেশি ভারসাম্যপূর্ণ, খেলার গতি আরো ছন্দময়, এমনকি খেলোয়াড়রাও যেন এ কাঠামোতে স্বস্তিতে। কিন্তু সেই যুক্তির বিপরীতে আছে লিডসের বিপক্ষে লজ্জাজনক ৩-৩ ড্র, যেখানে ২-০ ও ৩-২ লিডও ধরে রাখতে পারেনি অলরেডরা। সেই ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো জরুরি ছিল স্লটের শিষ্যদের জন্য এবং চ্যাম্পিয়নস লিগে সান সিরোয় ইন্টারের বিপক্ষে ১-০ জয় সেই প্রত্যাবর্তনেরই ইঙ্গিত দিয়েছে। এখন প্রশ্ন, এ ধারাবাহিকতা কি সালাহকে নিয়েই আসবে, নাকি তাকে ছাড়াই?
সালাহর প্রতিক্রিয়াও পরিস্থিতিকে সহজ করেনি, উল্টো তার বিস্ফোরক মন্তব্যে ক্লাবের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে যাওয়ার অভিযোগকেও অতিশয়োক্তি বলা যাচ্ছে না। ক্লাবের ভেতরে কেউ কেউ তাকে জোর করে বের করে দিতে চাইছে—এমন অভিযোগও শোনা গেছে। তবে এ ভজঘট পাকানো অবস্থার দায় শুধু সালাহর একার নয়। লিভারপুল যদি ভবিষ্যৎকে সত্যিই ‘পোস্ট-সালাহ’ ধরে এগোতে চায়, তাহলে কেন তাকে নতুন চুক্তির প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল—সে প্রশ্নও থেকে যায়।
সব জল্পনার মধ্যেই সালাহকে ব্রাইটনের বিপক্ষে গতকালের প্রিমিয়ার লিগ ম্যাচের স্কোয়াডে ডাকা হয়েছে। এটি কি সম্পর্ক জোড়ার প্রথম ধাপ, নাকি বিদায়ের আগের শেষ দৃশ্য—তা জানাবে সময়ই। ডান প্রান্তে বল পায়ে আগুনে গতিতে ছুটছেন সালাহ, আর সমর্থকরা গাইছেন, ‘রানিং ডাউন দ্য উইং/দ্য ইজিপশিয়ান কিং’—এ দৃশ্য আর কখনো দেখা যাবে কিনা সেটাও অনিশ্চিত।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—এই অধ্যায়ে কেউই পুরোপুরি জয়ী নয়। না সালাহ, না লিভারপুল।










