মানবাধিকার লঙ্ঘনে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জুড়ি নেই। সৌদি আরব, কাতার, আরব আমিরাতসহ আরব দেশগুলোর মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে পশ্চিমারা সরব। এই ইস্যুতে বহির্বিশ্বে তাদের ভাবমূর্তি মোটেও ভালো নয়। বিশেষ করে সৌদি আরব সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে বলে দাবি করে আসছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা, যা দেশটির ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। এ কলঙ্ক ঢাকতেই তারা বিভিন্ন ক্রীড়া ইভেন্ট আয়োজনে মনোযোগী হচ্ছে। এ তিন দেশ মিলে এবার রাগবি বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চায়।
খেলাধুলার পেছনে সবচেয়ে বেশি অর্থ ঢালছে এখন সৌদি আরব। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ক্রীড়াঙ্গনে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে শুরু করেছেন, যেটিকে বলা হচ্ছে ‘স্পোর্টস ওয়াশিং’। ফুটবল, গলফ, বক্সিং, টেনিস, রেসিংসহ আরো অনেক খেলায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইউরোপের বরেণ্য ফুটবলার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, নেইমার, করিম বেনজেমাকে দেশটির লিগে উড়িয়ে আনা। রোনালদোকে তো বছরে ২০ কোটি পাউন্ড পারিশ্রমিক দিয়ে এনেছে আল হিলাল ক্লাব, যদিও এ অর্থের বড় অংশই দিচ্ছে সৌদি আরব সরকার। আর্জেন্টাইন সুপারস্টার লিওনেল মেসিকেও টার্গেট করা হয়েছিল। যদিও তিনি পেট্রোডলারের ঝনঝনানির মোহে না পড়ে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে ইন্টার মায়ামিতে খেলছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যেকোনো মূল্যে বড় ক্রীড়া আসর আয়োজনে মরিয়া। অনেক বিতর্ক ছিল, অনেক চাপ ছিল, ইউরোপের অনেক দেশ বিরোধিতা করেছিল; তবু ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনে অনড় ছিল কাতার। পরিশেষে সফলভাবেই আসরটি আয়োজন করে তারা। ইতিহাসের অন্যতম সেরা এ আসরে চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। ২০৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের স্বাগতিক হয়েছে সৌদি আরব। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত ক্রিকেটের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, অ্যাথলেটিকসের বিশ্ব ট্রায়াথলন চ্যাম্পিয়নশিপ, বিশ্ব সাঁতার চ্যাম্পিয়নশিপের মতো বৈশ্বিক ক্রীড়া আসর আয়োজন করেছে। এছাড়া নানা ধরনের ক্রীড়া ইভেন্ট সেখানে লেগেই থাকে।
সৌদি আরব, কাতার ও আরব আমিরাত মিলে এবার রাগবি বিশ্বকাপ আয়োজনের পরিকল্পনা করছে। তারা ২০৩৫ অথবা ২০৩৯ বিশ্বকাপের জন্য বিড করবে। এশিয়া মহাদেশের রাগবি নিয়ন্ত্রক সংস্থা এশিয়া রাগবি আয়োজন স্বত্ব পাইয়ে দিতে জোরালো সমর্থন জানাবে সৌদি, কাতার ও আরব আমিরাতকে। উপসাগরীয় দেশ তিনটির দাবি, সুযোগ দেয়া হলে ‘রাগবি ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ইভেন্ট’ আয়োজন করে দেখাবে তারা।
এশিয়া মহাদেশে এখন পর্যন্ত একবারই রাগবি বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০১৯ সালে নবম আসর হয়েছিল জাপানে। ওই আসরে দক্ষিণ আফ্রিকা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ২০২৩ সালে দশম রাগবি বিশ্বকাপ আয়োজন করে ফ্রান্স। ২০২৭ সালে পরবর্তী আসর বসবে অস্ট্রেলিয়ায়, ২০৩১ দ্বাদশ আসরের আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র।
২০৩৫ সালের রাগবি বিশ্বকাপের বিডিং প্রক্রিয়া আগামী দুই বছরের মধ্যে শুরু হবে। সেই আসরের আয়োজক হতে এরই মধ্যে তদবির শুরু করে দিয়েছে ইউরোপের দেশ ইতালি ও স্পেন। শেষ পর্যন্ত এ দুই দেশের কেউ ২০৩৫ বিশ্বকাপের আয়োজক হয়ে গেলে ২০৩৯ বিশ্বকাপের জন্য বিড করবে সৌদি, কাতার ও আরব আমিরাত।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ তিনটির কারোরই রাগবি খেলুড়ে জাতি হিসেবে পরিচিতি নেই। আরো বিস্ময়কর তথ্য হলো, তারা কখনো বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতাও অর্জন করতে পারেনি। ফুটবল বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে স্বাগতিক দেশ সরাসরি মূল পর্বে খেলার সুযোগ পেলেও রাগবি বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে আয়োজন স্বত্ব পাওয়া দেশকেও বাছাই পর্ব পেরিয়ে আসতে হয়। ১৯৮৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত যে ১০ বার রাগবি বিশ্বকাপ হয়েছে, প্রতিবারই স্বাগতিক দেশ বাছাই পর্বের বাধা টপকেছে। সৌদি, কাতার ও আরব আমিরাতের পক্ষে বাছাই পর্ব পেরিয়ে মূল পর্বে ওঠা কঠিনই। বিশ্ব রাগবির নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি ফিফার নিয়ম অনুসরণ করে, তবেই স্বাগতিক হিসেবে খেলার সুযোগ আসতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি দেশের। তবে তার আগে তাদের আয়োজন স্বত্ত্ব পেতে হবে।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া অথবা মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া চাইলেই ২০৩৯ বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক হতে বিড করতে পারে। কিন্তু এশিয়া রাগবির পছন্দ মধ্যপ্রাচ্য।
রাগবি বিশ্বকাপ সাধারণত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে হয়ে থাকে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সেই সময়ের আবহাওয়া তীব্র গরম হওয়ায় সৌদি, কাতার ও আরব আমিরাতে ডিসেম্বরে বিশ্বকাপ হতে পারে। এমনকি ফাইনাল চলে যেতে পারে পরের বছর জানুয়ারিতে। ২০২২ সালে কাতারে ফুটবল বিশ্বকাপও ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
রাগবি বিশ্বকাপ আয়োজনের বিডে সফল হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী এশিয়া রাগবির সভাপতি কাইস আল দালাই। সংযুক্ত আরব আমিরাতের এ নাগরিক বলেছেন, ‘আমাদের উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতাদের বিশ্বাস, কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। আমি অন্যদের ছোট করে দেখছি না। হয়তো দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা ইউরোপের কোনো দেশ আগ্রহী হতে পারে। কিন্তু রাগবি ওয়ার্ল্ড যদি এ নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোয়, তবে আমি এখনই দেখতে পাচ্ছি, ২০৩৫ সালেই এটা ঘটতে পারে (মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশ যৌথ আয়োজক হতে পারে)।’
ফুটবল বিশ্বকাপের উদাহরণ টেনে আল দালাই আরো বলেছেন, ‘আমি একাধিক দেশে (রাগবি বিশ্বকাপ) আয়োজন মডেলের পক্ষে। ফিফা ২০০২ বিশ্বকাপ জাপান ও কোরিয়া আয়োজন করে দেখিয়েছে, ২০২৬ বিশ্বকাপ মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় হতে যাচ্ছে, এরপর ২০৩০ বিশ্বকাপ হবে তিন মহাদেশে। তাহলে রাগবি কেন নয়?’ তিনি মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের এ তিন দেশ ইতিহাসের সফলতম রাগবি বিশ্বকাপ আয়োজন করতে পারে। আল দালাই বলেন, ‘এখানে স্টেডিয়ামগুলো প্রস্তুত। এটা হতে পারে ইতিহাসের সেরা আসর।’
তিনি আরো বলেন, ‘ওয়ার্ল্ড রাগবির ৫২ ভোটের মধ্যে দুটি এশিয়া রাগবি, যে দুটি নিশ্চিতভাবেই আমাদের বিডের পক্ষেই যাবে।’
চলতি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) মেগা নিলামও সৌদি আরবের জেদ্দায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। আইপিএলকে টক্কর দিতে ৬ হাজার কোটি টাকার টি-টোয়েন্টি লিগ চালুর পরিকল্পনা করছে তারা। শোনা যাচ্ছে, দেশটি ২০৩৬ অলিম্পিকের আয়োজক হতেও বিড করবে।










