ইংলিশ ফুটবল ক্লাব চেলসি এফসির মালিকানা বদলে গেল। রুশ ধনকুবের রোমান আব্রামোভিচের জায়গায় নতুন মালিক আমেরিকান ব্যবসায়ী টড বোয়েলির নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়াম। ক্লাবটি কেনা-বেচার চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে এক বিবৃতিতে দিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে চেলসি এফসি। এতে শেষ হলো আব্রামোভিচের সঙ্গে ইংলিশ ক্লাবটির দুই দশকের পথচলা।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চেলসি ফুটবল ক্লাব নিশ্চিত করেছে যে, টড বোয়েলির নেতৃত্বে ক্লিয়ারলেক ক্যাপিটাল, মার্ক ওয়াল্টার ও হ্যানসজর্গ উইস ক্লাবের নতুন মালিক হতে সম্মত হয়েছেন।
ক্লাবটি কিনতে বোয়েলিদের খরচ হচ্ছে ৪২৫ কোটি পাউন্ড, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৪৫ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা।
চেলসির বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মোট বিনিয়োগ থেকে ২৬ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকায় (২.৫ বিলিয়ন পাউন্ড) ক্লাবের শেয়ার কিনে নেবে নতুন মালিকপক্ষ। সেই অর্থ জমা হবে যুক্তরাজ্যের একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে, যেখানে লেনদেন বন্ধ রয়েছে। আব্রামোভিচের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, চেলসি বিক্রির শতভাগ অর্থই দান করে দেয়া হবে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য। তাই এ অর্থ দাতব্য কাজেই শুধু ব্যবহার করা যাবে।
এছাড়া নতুন মালিকপক্ষ শুরুতেই ক্লাবে ১৮ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা (১.৭৫ বিলিয়ন পাউন্ড) বিনিয়োগ করবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। মালিকানা হস্তান্তরের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে মে মাসের শেষ দিক পর্যন্ত সময় লাগবে। কেননা এখানে যুক্তরাজ্য সরকার ও ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ উভয়েরই অনুমোদন লাগবে।
টড বোয়েলি হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের বেসবল দল লস অ্যাঞ্জেলেস ডজার্সের অন্যতম মালিক। এছাড়া হোল্ডিং প্রতিষ্ঠান এলডিরিজ ইন্ডাস্ট্রিজের সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং ন্যাশনাল বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এনবিএ) দল লস অ্যাঞ্জেলেস লেকার্সেও আংশিক শেয়ার আছে তার।
চেলসি কেনার ব্যবসায়িক গ্রুপের মধ্যে থাকা ক্লিয়ারলেক ক্যাপিটাল একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান। মার্ক ওয়াল্টার একজন মার্কিন ব্যবসায়ী এবং গুগেনহেইম পার্টনার্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। হ্যানসজর্গ উইস একজন সুইস বিলিয়নেয়ার।
চেলসি কেনার দৌড়ে বোয়েলির প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন এনবিএর দল বোস্টন সেল্টিকসের সহমালিক ও আমেরিকান ব্যবসায়ী স্টিফেন পাগলিউকা ও আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনস গ্রুপের (আইএজি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান স্যার মার্টিন ব্রাউটন। ১৪ এপ্রিল শেষ হয় দরপত্র জমাদানের মেয়াদ। যখন বোয়েলির সঙ্গে আলোচনা চলছিল ঠিক তখন ব্রিটিশ ধনকুবের স্যার জিম র্যাটক্লিফ চেলসি ক্লাব কিনতে ৪.২৫ বিলিয়ন পাউন্ডের প্রস্তাব দেন। তবে শেষ পর্যন্ত বোয়েলির কাছে পরাস্ত হন তিনি। যাচাই-বাছাইয়ের পর চেলসি বিক্রির দেখভালের দায়িত্বে থাকা আমেরিকান ব্যাংক রেইন গ্রুপ বোয়েলির নেতৃত্বাধীন ব্যবসায়ী গ্রুপকে পছন্দ করে নেয়।
এর আগেও চেলসি কেনার চেষ্টা করেন বোয়েলি। ২০১৯ সালে তিনি আব্রামোভিচকে ২.২ বিলিয়ন পাউন্ডের প্রস্তাব দিয়েছিলেন! তখন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ঢোকার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন এ ব্যবসায়ী। অবশেষে তার ইচ্ছা পূরণ হলো।
২০০৩ সালের জুনে ব্রিটিশ ব্যবসায়ী কেন ব্যাটসের থেকে ১৪ কোটি পাউন্ডে ফুটবল ক্লাব চেলসি কিনে নেন আব্রামোভিচ। কিন্তু সম্প্রতি ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে যুক্তরাজ্য সরকার নাখোশ হোন দেশটির ওপর। যার কারণে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ সব রুশ ধনকুবের ও তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর যুক্তরাজ্য সরকার নিষেধাজ্ঞা দেয়। অভিযোগ আনা হয় চেলসির মালিক আব্রামোভিচের বিরুদ্ধেও। যার প্রভাব পড়ে এ ধনকুবেরের ব্যবসা-বাণিজ্যে। নিষিদ্ধ হন যুক্তরাজ্যে এবং বিক্রি করতে বাধ্য হন প্রিয় ক্লাবটি। এখন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষ ও যুক্তরাজ্য সরকারের অনুমোদন পেলেই আব্রামোভিচ সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে। শুরু হবে চেলসির সঙ্গে বোয়েলির নতুন অধ্যায়।
চেলসি ইংলিশ ফুটবলের একটি পরাশক্তি। ২০২১ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ মুকুট জয় করে তারা। এবার ব্লুজরা হেরেছে কোয়ার্টার ফাইনালে। কিন্তু আব্রামিভোচ মালিক হওয়ার আগে ক্লাবটির তেমন কোনো অর্জন ছিল না। না চ্যাম্পিয়নস লিগ, না প্রিমিয়ার লিগে। যে চেলসি ১৯৫৪-৫৫ মৌসুমের পর আর লিগ শিরোপা জিততে পারেনি, সেই তারাই গত দুই দশকে লিগ শিরোপা জিতেছে পাঁচবার। কখনো চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল খেলতে না পারা ক্লাবটি এর মধ্যে তিনবার খেলেছে ফাইনাল, সেরার খেতাব জিতেছে দুবার। এফএ কাপ জিতেছে পাঁচবার। সব মিলিয়ে আব্রামোভিচ যুগে ১৯টি শিরোপা জেতে ক্লাবটি।
১৪ কোটি পাউন্ডে (প্রায় ১৭ কোটি ডলার) কেনা ক্লাবটির ব্র্যান্ড ভ্যালু এখন ৩২০ কোটি ডলার (ফোর্বস)। বিবিবি, চেলসি এফসি










