আসন্ন আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যুক্তরাষ্ট্র পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। উত্তর আমেরিকার ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর যুক্তরাষ্ট্রে ২ জুন শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপ আসর। সংক্ষিপ্ত ভার্সনের এ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের রেকর্ড মোটেও উজ্জ্বল নয়। প্রতিবার প্রতিশ্রুতি দেয়া ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়ে দেশে ফেরা যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তবে এবার বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আগে খুব বড় আশা দেখাননি বাংলাদেশ দলনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও হেড কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। দুজনই বলেছেন, দলের প্রথম লক্ষ্য গ্রুপ পর্ব পার হওয়া। 

বাংলাদেশের কোচ ও অধিনায়কের প্রথম লক্ষ্য গ্রুপ পর্ব পার হওয়া, সেটি পারলে আরো অনেক দূর এগোতে চান তারা। বুধবার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচাকে ক্যানভাস বানিয়ে ক্রিকেট তারকাদের দলীয় ফটোসেশন হলো। তাদের সঙ্গে যোগ দিলেন কোচিং স্টাফ সদস্য, বোর্ড কর্মকর্তারাও। আনুষ্ঠানিকতা শেষে সংবাদ সম্মেলনে কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে ও অধিনায়ক শান্ত খুব বড় আশা দেখাননি। দুজনই বলেছেন, প্রথম লক্ষ্য গ্রুপ পর্ব পার হওয়া। তবে মনের কোণে বড় স্বপ্নও যে তারা পুষছেন, সেই আভাসটুকু মিশে ছিল তাদের কথায়। 

হাথুরুসিংহে বলেন, ‘আমি জানি, এদেশে আমাদের নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে। কারণ আইসিসি টুর্নামেন্টগুলোর বাইরে আমরা ভালো খেলছি। আমাদের জন্যও একই রকম, এই দেশ, সমর্থকদের মতো কোচিং স্টাফ ও ক্রিকেটারদেরও আশা অনেক উঁচুতে। প্রথম পদক্ষেপ অবশ্যই কঠিন গ্রুপ পর্বটি পার হয়ে পরের ধাপে যাওয়া। খুবই শক্তিশালী গ্রুপে আছি আমরা। আমরা এটা পেরোতে পারি, যেটা আমাদের প্রথম লক্ষ্য, এটা পারলে সেখান থেকে আরো এগোতে চেষ্টা করব।’

দলের লক্ষ্য নিয়ে অধিনায়ক শান্ত বলেন, ‘আমি যে কথাটি বলেছিলাম, তারপরও বাংলাদেশের সবাই প্রত্যাশা করবেই। যেটা খুবই স্বাভাবিক। আমি নিজেও প্রত্যাশা করি, আমাদের দলের প্রতিটি ক্রিকেটার প্রত্যাশা করে যে আমরা অনেক ভালো ক্রিকেট খেলব। আমার মনে হয়, আমরা সুন্দরভাবে ছোট ছোট পরিকল্পনা নিয়ে এগোই যে গ্রুপ পর্ব কীভাবে পার করব। অতদূর না ভেবে ছোট ছোট করে ভাবলে পরিকল্পনা করা সহজ হয়। আমরা যে গ্রুপে আছি, আমাদের জন্য এটা কঠিন হবে। আমরা যদি এটা পার করতে পারি, তখন আমরা আলাদা করে পরিকল্পনা করতে পারব। টি-টোয়েন্টিতে আমি বিশ্বাস করি, কোনো ছোট দল, বড় দল নেই। নির্দিষ্ট দিনে ভালো ক্রিকেট খেলতে পারলে যেকোনো দলকে হারানো সম্ভব।’

গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের কঠিন দুই চ্যালেঞ্জ প্রথম দুই ম্যাচেই। ৮ জুন ডালাসে প্রতিপক্ষ শ্রীলংকা, তিনদিন পর নিউইয়র্কে লড়াই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। এ দুটি চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাথুরুসিংহে বললেন, ‘আমাদের প্রস্তুতি দারুণ হয়েছে। খুবই ভালো। চট্টগ্রামে ক্যাম্প হয়েছে, এরপর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচের সিরিজ। বেশির ভাগ ক্রিকেটারকেই আমরা নির্দিষ্ট যে ধরনের পরিস্থিতিতে দেখতে চাই, এ পাঁচ ম্যাচে তা দেখার সুযোগ হয়েছে আমাদের। ব্যক্তিগত কিছু পারফরম্যান্স নিয়ে কিছু দুর্ভাবনার জায়গা আছে। এছাড়া প্রস্তুতি ভালো হয়েছে। অনেক কিছুই আমরা পেয়েছি।’

বিশ্বকাপ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তিন ম্যাচের সিরিজ খেলবে বাংলাদেশ। এরপর ওয়ার্মআপ ম্যাচও আছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। সব মিলিয়ে সেখানকার কন্ডিশন ও পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে চান কোচ হাথুরুসিংহে। তিনি বলেন, ‘ওই দেশটির কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়াটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমার মনে হয় না, কেউ সেখানে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে খেলা সবার জন্যই নতুন। কন্ডিশনকে ভালোভাবে বোঝা, আবহাওয়ার সঙ্গে ও ভিন্ন টাইমজোনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়া, এসব জরুরি। অনুশীলন সেশনগুলো আমাদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ক্রিকেটারদের বিশ্রামও দিতে হবে। ওয়ার্কলোডের কথা ভেবে তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে তরতাজা রাখতে হবে। তবে মূল মনোযোগ থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের কন্ডিশনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা।’

এদিকে, নতুন অধিনায়ক শান্ত নবম আসরে ভালো করে সাকিব আল হাসান ও মাহমুদউল্লাহর মতো দুই জ্যেষ্ঠ ক্রিকেটারকে উপহার দিতে চান। 

সাকিব খেলবেন নিজের নবম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আসর। সেই ২০০৭ সালে টি-টোয়েন্টির প্রথম বিশ্ব আসর থেকে শুরু করে প্রতিটিতেই ছিল তার উপস্থিতি। তিনি ছাড়া সবক’টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করতে যাওয়া ক্রিকেটার আছেন আর শুধু রোহিত শর্মা। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ উইকেট সাকিবেরই দখলে। আবার রানেও শীর্ষ দশে আছেন তিনি। সব মিলিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের একজন গ্রেট সাকিব। তাদের পাশে থাকতে পারত মাহমুদউল্লাহর নামটিও। ২০০৭ থেকে টানা সাতটি বিশ্বকাপ তিনি খেলেছেন। ২০২১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত আসরে দলের অধিনায়কও ছিলেন। তবে ২০২২ আসরে বাদ পড়ে যান দল থেকে। আবার ফিরেছেন টি-টোয়েন্টি দলে। এবার খেলবেন বিশ্বকাপও।

৩৭ বছর বয়সী সাকিব ও ৩৮ বছর বয়সী মাহমুদউল্লাহর ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। সাকিব ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন, ২০২৫ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি দিয়ে ইতি টানবেন ক্যারিয়ারের।

বিশ্বকাপ খেলতে দেশ ছাড়ার আগে বুধবার সংবাদ সম্মেলনে এ দুজনের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপের কথা উঠতেই শান্ত বললেন, ‘জানি না, এটা তাদের শেষ বিশ্বকাপ কিনা। এটা ধারণা। তবে আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। তবে তারা এত লম্বা সময় ধরে খেলছেন, তরুণ ক্রিকেটার আমরা যারা আছি, তারা অবশ্যই চেষ্টা করব তাদের ভালো স্মৃতি উপহার দিতে। ভালো একটি বিশ্বকাপ শেষ করে আমরা তাদের উপহার দিলাম। অবশ্যই আমাদের তরুণদের দায়িত্ব এটি। সবার মধ্যে এ ব্যাপারটা অবশ্যই থাকে।’

বিশ্বকাপে তাদের কাছে বিশেষ কিছু চাওয়ার নেই শান্তর। শুধু তাদের ছোঁয়ায় আরো সমৃদ্ধ হতে চান নিজেরা। অধিনায়ক বলেন, ‘সাকিব ভাই, রিয়াদ ভাইয়ের কাছ থেকে বাড়তি বা অতিরিক্ত কিছু চাই না। ওনারা যেভাবে পারফর্ম করছে, যার ভূমিকা যেটি, তা করতে পারলে দল অবশ্যই লাভবান হবে। ওনাদের যে অভিজ্ঞতা আছে, এটা যদি প্রতিটি ক্রিকেটারের মধ্যে ছড়িয়ে দেন, তাহলে আমাদের দলের যে ছোট জায়গাগুলোতে উন্নতির দরকার আছে, ওই জায়গাগুলোয় খুব ভালো অবস্থানে থাকব।’

লেগ স্পিন বোলিংয়ের সঙ্গে আগ্রাসী ব্যাটিং করা রিশাদ হোসেনকে নিয়ে উচ্চাশা দলের। ফিল্ডিংয়ে দলের সেরাদের একজন। সব মিলিয়ে এ তরুণকে পরিপূর্ণ এক ক্রিকেটার বলে মনে করেন বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। তিনি বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই আমরা লেগ স্পিনার খুঁজছিলাম। এখন খুব ভালো একজন লেগ স্পিনার আমাদের আছে, যে সম্প্রতি প্রায় সব ম্যাচেই পারফর্ম করছে। বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাটিংয়ে ভালো করছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের দলের সেরা ফিল্ডারদের একজন সে। সব মিলিয়ে কমপ্লিট একটা প্যাকেজ। ও যদি ওর সেরাটা দিয়ে খেলতে পারে, তাহলে দল অনেক দূর এগোবে।’

তবে ব্যাটসম্যান রিশাদের কাছেই বেশি আশা শান্তর। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি যে কতটুকু সামর্থ্য ওর আছে। ওর ওই সহজাত খেলা যদি খেলতে পারে, ও যে জায়গায় ব্যাটিং করবে, দল হয়তো বাড়তি লাভবান হবে। বাড়তি কোনো চাপ তাকে দিতে চাই না। বাড়তি কিছু ওর কাছ থেকে আশাও করছি না। ও যে জিনিসটা পারে, সেটাই আশা করব। ও নিজের কাজটা ভালোভাবে করতে পারলেই দলের জন্য ভালো কিছু হবে।’