ভারতের আইপিএল, পাকিস্তানের পিএসএল, অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজের সিপিএল বিশ্বের জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টি-টোয়েন্টি লিগ। এসব টুর্নামেন্টে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক পরিশোধ করা হয়নি—এমন খবর কমই শোনা যায়। অথচ ২০১২ সালে যাত্রা করা বাংলাদেশের ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টুর্নামেন্ট বিপিএলে পারিশ্রমিক পরিশোধ নিয়ে বিতর্ক যেন নিত্যসঙ্গী। প্রায় প্রতিবারের মতো চলতি একাদশ বিপিএলেও বেশ কয়েকটি ফ্র্যাঞ্চাইজির বিরুদ্ধে পারিশ্রমিক পরিশোধ না করার অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে রীতিমতো বিব্রতবোধ করছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।

টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই পারিশ্রমিকের ৫০ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করার কথা প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজির। এরপর টুর্নামেন্ট চলাকালে ২৫ শতাংশ ও শেষ হলে বাকি ২৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করার কথা রয়েছে। যদিও ৭ ফ্র্যাঞ্চাইজির বেশির ভাগই তাদের স্থানীয় খেলোয়াড়দের প্রথম কিস্তির পারিশ্রমিক পরিশোধ করেননি বলে অভিযোগ উঠেছে।

রংপুর রাইডার্স ও সিলেট স্টাইকার্স ২৫ শতাংশ করে টাকা দিয়েছে বলে জানা গেছে। ফরচুন বরিশালেরও বাকি আছে। ঢাকা ক্যাপিটালসের অনেকেই ৫০ শতাংশ টাকা পেয়েছেন। খুলনা টাইগার্সও ৪০-৫০ শতাংশ টাকা পরিশোধ করেছে। যদিও টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই তাদের ৫০ শতাংশ আর চলাকালে তাদের ২৫ শতাংশ টাকা পাওয়ার কথা।

বিপিএলে এবার মাঠের বাইরের ঘটনাই বেশি আলোচনায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা পারিশ্রমিক ইস্যু নিয়ে। দীর্ঘ সময় পর বিপিএলে ফেরা ‘দুর্বার রাজশাহী’ আছে বিতর্কের কেন্দ্রে। সিলেট পর্ব শেষে দলগুলো চট্টগ্রামে পা রাখার পরপরই চাউর হয় এ বিতর্ক। টাকা না পেয়ে রাজশাহীর খেলোয়াড়রা অনুশীলন বয়কটও করেছেন বলে শোনা যায়। অন্য কিছু দলের বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ রয়েছে। এসব নিয়ে বিব্রত বিসিবি পরিচালক ও বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব নাজমুল আবেদীন ফাহিম।

জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে শুক্রবার দুর্বার রাজশাহী ও সিলেট স্ট্রাইকার্সের ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমে কথা বলেন ফাহিম। বিপিএলে পারিশ্রমিকজনিত সমস্যাকে নিজেদের ব্যর্থতা মেনে নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরাও এসব কারণ নিয়ে বিব্রতকর। শুধু ক্রিকেট বোর্ড নয়, পুরো ক্রিকেট সম্প্রদায় কিন্তু এসব নিয়ে বিব্রত। আমাদের সবার জন্যই এগুলো শিক্ষা। আশা করি, সামনে এসব বিষয় সেভাবেই অ্যাড্রেস করব যেন আর না হয়। অনেকগুলো কাজ আমাদের করা উচিত ছিল। যেগুলো হয়তো আমরা সময়মতো করিনি। তবে এটাও বিষয় যে এবার একটা বিশেষ সময়ে অনেক ব্যাপারেই আমরা চাপে ছিলাম। হয়তো অনেক ব্যাপারেই যেসব নিয়ম অনুসরণের কথা ছিল, সেগুলো করতে পারিনি। তবে এগুলোও শিক্ষা। সামনে অবশ্যই এ শিক্ষা কাজে লাগাব।’

প্রতিবার টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ফ্রাঞ্চাইজিগুলোর কাছ থেকে ব্যাংক গ্যারান্টি নিয়ে থাকে বিসিবি। ফ্রাঞ্চাইজিগুলো খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক দিতে গড়িমসি করলে কিংবা অপারগ হলে ব্যাংক গ্যারান্টির অর্থ থেকে পরিশোধ করা হয়ে থাকে। কিন্তু এবার ফরচুন বরিশাল ছাড়া আর কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যাংক গ্যারান্টি জমা করেনি। এ বিষয়ে ফারুক আহমেদ নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি। তিনি খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক পরিশোধের ব্যাপারে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। যদিও বিসিবির চেষ্টা বিফলেই যায়। পারিশ্রমিক নিয়ে বিতর্ক ঠিকই উঠে পড়ে টুর্নামেন্ট চলাকালে।

এখন পর্যন্ত ফ্র্যাঞ্চাইজি থেকে আনুষ্ঠানিক চুক্তিপত্রও পাননি ক্রিকেটাররা! যেটি মূলত দিয়ে থাকে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল। এ নিয়ে ফাহিমকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘না, আমি অবগত নই। সত্যি বলতে এটা সম্পর্কে আমি জানি না।’

এ নিয়ে আরেক বোর্ড পরিচালক ইফতেখার আহমেদ বলেন, ‘যখন জেনেছি, আমরা ক্রিকেট বোর্ড ও প্রেসিডেন্টসহ সম্পৃক্ত হয়ে রাজশাহীর বিষয়টা সমাধান করা হয়েছে।’ এ বিষয়টি নিয়ে ফাহিম আরো বলেন, ‘যখন পারিশ্রমিক হবে না, আমাদের কানে কিন্তু আসবে। রাজশাহীর ক্ষেত্রে সেটা হয়েছে। আমাদের কানে এসেছে এবং সাথে সাথে আমরা কাজ করার চেষ্টা করেছি। আমি নিশ্চিত অন্যদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা যদি থেকে থাকে সমাধান করা হবে।’

এবারের বিপিএল হওয়ার কথা ছিল অন্য সব আসরের চেয়ে ব্যতিক্রম। মাঠে ও মাঠের বাইরের আয়োজন মিলে নতুন এক বিপিএলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিসিবি। অথচ এবারো বিতর্ক পিছু ছাড়ল না, আয়োজনও বেশ সাদামাটা। এ নিয়ে বিপিএলের সদস্য সচিব ফাহিম বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা ছিল সেরা বিপিএল আয়োজনের। আশা করেছিলাম, আমাদের এ যাত্রায় যারা যুক্ত হবেন, তারাও দায়িত্ব নেবেন। অনেক ক্ষেত্রেই হয়তো আমরা সেটা দেখতে পাইনি। তবে আমরা চেষ্টা করব বাকি যে সময় আছে, সেখানে এই পারিশ্রমিক ইস্যু বা অন্য যেকোনো বিষয় যেন আরো ভালো থাকে।’

বাংলাদেশের সাবেক তারকা পেস বোলার হাসিবুল হোসেন শান্ত এ নিয়ে বণিক বার্তাকে বলেছেন, ‘এটা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও গোটা বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্যই বিব্রতকর ব্যাপার। এ থেকে বের হয়ে আসার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। কেননা এ বিতর্কের জন্য আগের মতো বিদেশী ক্রিকেটাররা আসতে আগ্রহ বোধ করে না। বিপিএল নিয়ে যে নিয়মকানুন আছে তা পরিবর্তনের প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।’

এদিকে টাকার দাবিতে খেলোয়াড়রা অনুশীলন বয়কট করার পর বৃহস্পতিবার রাতে ২৫ শতাংশ টাকা নগদ পরিশোধ করেছে দুর্বার রাজশাহী। শিগগিরই ২৫ শতাংশের চেক দেয়ার কথা। টাকা পাওয়ার পরদিনই সিলেট স্ট্রাইকার্সের বিপক্ষে ৬৫ রানের দারুণ এক জয় তুলে নিয়েছে রাজশাহী।