শেষ বলে প্রয়োজন দুই রান। ক্রিকেটার থেকে শুরু করে বাউন্ডারি লাইনের বাইরের দর্শক, এমনকি রাস্তা দিয়ে যাওয়া পথচারীরাও দাঁড়িয়ে গেছেন। সবার মাঝে টান টান উত্তেজনা। শেষ পর্যন্ত দুই রান না, ছক্কা হাঁকালেন ব্যাটার। খাতাকলমে ‘অপরাজেয়’ দলটিই জিতল বটে, কিন্তু সত্যিকার অর্থে জয় হলো দুই দলেরই। জিতে গেল নারী মুক্তি, নারীর প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক অন্য রকম ক্রিকেট আয়োজন।

ব্যতিক্রমী এ ক্রিকেট ম্যাচের ক্রিকেটার, আম্পায়ার এমনকি ধারাভাষ্যকার, সবাই ছিলেন নারী। ক্রিকেটাররা সবাই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের নারী শ্রমিক। কেউ গৃহকর্মী, কেউবা তৈরি পোশাক খাতের অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক। যাদের বলা হয় হোমবেজড আরএমজি শ্রমিক।

‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ২০২৪’ উপলক্ষে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের ১৬ দিনব্যাপী প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে এ ম্যাচের আয়োজন করে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অক্সফাম ইন বাংলাদেশের এমপাওয়ারিং ওমেন থ্রু সিভিল সোসাইটি অ্যাক্টরস (ইডব্লিউসিএসএ), সুনীতি ও ট্রোসা প্রকল্প। মূলত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের নারী শ্রমিকদের শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্তি, শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের পক্ষে এবং নারী শ্রমিকের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধেই এ প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করা হয়। ব্যতিক্রমী এ আয়োজনের গণমাধ্যম সহযোগী ছিল বণিক বার্তা।

আট সদস্যের ‘অপরাজেয়’ ও ‘সংশপ্তক’—এই দুই দলে ভাগ হয়ে মাঠে নেমেছিলেন ঢাকার গৃহকর্মী ও অপ্রাতিষ্ঠানিক তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকরা। ৮ ওভারের ম্যাচে আগে ব্যাট করতে নামা সংশপ্তক ৬ উইকেটে ৫৬ রান তোলে। সেই রান তাড়া করতে নেমে মাত্র ১২ রানে তিন উইকেট হারালেও শেষ পর্যন্ত দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় অপরাজেয় দল। দুই উইকেট হাতে রেখে শেষ বলে জয় তুলে নেয় অপরাজেয়। ব্যাট হাতে ৩৪ রান ও বল হাতে ২ উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচসেরা হন পরাজিত দল সংশপ্তকের সালমা আক্তার রাণী।

শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ ম্যাচের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বলেন, ‘এটি সাধারণ কোনো ক্রিকেট ম্যাচ বলা যায় না। এই যে নারীরা বের হয়ে এসেছে, তাদের অধিকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে এবং এমন একটি উদ্যোগে অংশ নিয়েছে, এটাই মুক্তির পথ। আমি বলব এ ক্রিকেট ম্যাচটি দেশের আপামর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের নারী শ্রমিকদের মুক্তির আন্দোলনের অংশ।’

প্রতিনিয়ত নানা বৈষম্যের শিকার হন এসব নারী শ্রমিক। তাদের কাজের নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে না, থাকে না কোনো ধরনের স্বাস্থ্য সুবিধা। নেই ন্যূনতম মজুরিও। প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানিসহ নানা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয় দেশের বিশাল এ শ্রমশক্তিকে। কিন্তু শ্রম আইনে যুক্ত না থাকায়, শ্রমিক হিসেবে প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা পান না তারা। গৃহকর্মী ও পোশাক শ্রমিকদের বাইরেও এ অনুষ্ঠানের অংশ ছিলেন চা-বাগানের নারী শ্রমিক এবং প্রান্তিক নারী মৎস্যজীবী। সারা দেশের প্রায় তিন শতাধিক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের নারী শ্রমিক উপস্থিত ছিলেন দিনব্যাপী এ আয়োজনে।