টানা দুটি (২০২২ ও ২০২৪) সাফ শিরোপা জয়ের পর বিদেশের লিগে কদর বাড়তে থাকে বাংলাদেশের মেয়েদের। তাই তো ভুটানের শীর্ষ লিগে আসন্ন মৌসুমে খেলার জন্য বাংলাদেশ থেকে ডাক পেয়েছেন মোট ছয়জন নারী ফুটবলার!

ভুটানের ক্লাব ট্রান্সপোর্ট ইউনাইটেডে খেলার জন্য এ মাসেই বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) ছাড়পত্র পান গোলরক্ষক রুপনা চাকমা ও ডিফেন্ডার মাসুরা পারভীন। তাদের সঙ্গে ভুটানে খেলতে যাচ্ছেন আরো চারজন। ২০২৪ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সেরা খেলোয়াড় ঋতুপর্ণা চাকমা, মিডফিল্ডার মনিকা চাকমা, ফরওয়ার্ড মাতসুশিমা সুমাইয়া ও সাবেক অধিনায়ক সাবিনা খাতুনকে ছাড়পত্র দিয়েছে বাফুফে। এ চারজনকেই নিচ্ছে ভুটান প্রিমিয়ার লিগের পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন পারো এফসি।

শুক্রবার বণিক বার্তাকে এমনটাই জানিয়েছেন সর্বশেষ সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের সেরা ফুটবলারের পুরস্কার পাওয়া ঋতুপর্ণা। কয়েকদিন আগেই তারা বাফুফের কাছ থেকে ছাড়পত্র পান। তিনি বলছিলেন, ‘আমরা ৬ এপ্রিল ভুটান যাচ্ছি। আমাদের বাফুফে থেকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে।’

এখন দেশ ছাড়ার অপেক্ষা। রুপনা-মাসুরার ট্রান্সপোর্ট ইউনাইটেডের হয়ে খেলার কথা থাকলেও এখনো তাদের ভুটান যাওয়ার দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। তবে ঋতুপর্ণা, মনিকা, সুমাইয়া ও সাবিনার ৬ এপ্রিল ভুটানের বিমান ধরার কথা রয়েছে। ওইদিনই এশিয়ান কাপ বাছাইপর্ব সামনে রেখে বাংলাদেশ দলের ক্যাম্প শুরু হবে।

ঋতুপর্ণা বললেন, ‘বিদেশী লিগে খেলা সবসময়ই আনন্দের।’ সেখান থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশের হয়ে আরো সাফল্য বয়ে আনতে চান। তিনি বলেন, ‘বিদেশী লিগে খেলতে পারলে অনেক কিছুই শেখা যায়। আমাদের অনেক অভিজ্ঞতাও হয়। সেই অভিজ্ঞতা আবার জাতীয় দলে কাজে লাগাতে পারি।’

এদিকে ছুটিতে থাকা নারী দলের কোচ পিটার বাটলারও মনিকা-সাবিনাদের ভুটান লিগে খেলার খবর পেয়ে খুশি। সাবিনাদের শুভকামনা জানিয়ে তিনি এক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘খুবই ভালো। তাদের জন্য শুভকামনা রইল।’

বাফুফে সূত্রে জানা গেছে, সাবিনা, ঋতুপর্ণা, মনিকা, মাসুরা, রুপনা, সুমাইয়া ছাড়াও তরুণ খেলোয়াড় মোসাম্মাৎ সাগরিকা ভুটানের লিগে খেলার প্রস্তাব পেয়েছেন। শিগগিরই ছাড়পত্র পেয়ে যেতে পারেন তিনি। তিনিও পেয়ে গেলে মোট সাতজন যাবেন ভুটানে।

বিদেশী ক্লাবের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের নতুন নয়। এর আগে মালদ্বীপ ও ভারতের ঘরোয়া নারী লিগে খেলেছেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক সাবিনা। কলকাতা ইস্ট বেঙ্গলের জার্সিতে মাঠে নামার সুযোগ হয়েছে সানজিদা আক্তারের। কৃষ্ণা রানী সরকারও খেলেছেন ভারতের লিগে।

গত বছরের আগস্টে ভুটানের ক্লাব রয়্যাল থিম্পু কলেজ এফসির হয়ে খেলতে যান বাংলাদেশের সাবিনা, ঋতুপর্ণা, মারিয়া মান্দা ও মনিকা। তখন এএফসি উইমেন্স চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার জন্য তাদের নিয়েছিল ভুটানের ক্লাবটি।

আগামী ১৫ এপ্রিল ভুটানের নারী লিগ শুরু হওয়ার কথা। এই লিগ প্রায় ছয় মাস চলে। ভুটানের লিগ চলাকালে এ খেলোয়াড়েরা জাতীয় দলের ক্যাম্পে ডাক পেলে তারা ঢাকায় ফিরে আসবেন।

ভুটানের লিগে মেয়েদের ডাক পাওয়া নিয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নারী উইংয়ের চেয়ারপারসন মাহফুজা আক্তার কিরণ বলেন, ‘মেয়েরা ৬ জন ভুটানে খেলবে। আমরা তাদের এনওসি দিয়েছি। এরপর আমরা যখন জাতীয় দলের জন্য তাদের ডাকব তারা যোগ দেবে।’

এটা সাফল্য হিসেবে দেখছেন কিনা কিংবা এটা আমরা উদযাপন করতে পারি কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই। তারা যত বেশি বাইরে খেলবে তাদের মানও ততই বাড়বে। তারা বেশি করে বাইরে ডাক পাওয়া মানেই এটা বুঝতে হবে যে তারা এখন ভালো অবস্থানে রয়েছে। আমরা চাইব মেয়েরা আরো বেশি করে বাইরে খেলুক।’

এ বিষয়টি নিয়ে সাবিনা, ঋতুপর্ণাদের সাবেক ‘গুরু’ গোলাম রব্বানী ছোটনের কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘খুবই ভালো দিক, খুবই ভালো। আরো বেশি করে খেলোয়াড় বাইরে খেললে সেটা আমাদের জন্য ভালো। আসলে আরো আগে থেকেই তাদের বাইরে খেলার সুযোগ আসতে পারত। যদিও অনেকেই খেলে আগে থেকেই।’

মেয়েদের ইউরোপের লিগে দেখতে চান কিনা, এমন প্রশ্ন করলে তিনি জানান, ইউরোপে খেললে নিজেদের মানটা বুঝতে পারত মেয়েরা। দেশের নারী ফুটবলে সাফল্যের কাণ্ডারি এ কোচ বলেন, ‘যখন তারা বড় কোনো লিগ খেলবে তখন নিজেদের লেভেলটা বুঝতে পারবে, সেই অনুযায়ী নিজেদের তৈরি করতে পারবে।’

এদিকে গত বৃহস্পতিবার মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে এএফসির সদর দপ্তরে নারী এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের ড্র অনুষ্ঠিত হয়। এই ড্রতে বাংলাদেশ ‘সি’ গ্রুপে পড়েছে স্বাগতিক মিয়ানমার, বাহরাইন ও তুর্কমেনিস্তানের সঙ্গে। ফিফা র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে মিয়ানমার ও বাহরাইন। মিয়ানমার ৫৫ নম্বরে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাহরাইনের অবস্থান ৯২। বাংলাদেশ রয়েছে ১৩৩ নম্বরে আর তুর্কমেনিস্তান ১৪১ নম্বরে। তাই পিটার বাটলারের দলের জন্য কাজটা কঠিনই হতে পারে।

এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের জন্য ৫৫ জন ফুটবলারকে জাতীয় দলের ক্যাম্পে ডাকা হয়েছে। ৬ এপ্রিল শুরু হবে জাতীয় দলের ক্যাম্প। ক্যাম্পে যোগ দেয়ার কথা ছিল সাবিনা, ঋতুপর্ণাসহ বিদ্রোহী ফুটবলারদেরও। কোচ বাটলারের অধীনে আর খেলবেন না বলে আলটিমেটাম দিয়েছিলেন ১৮ সিনিয়র ফুটবলার। যদিও বাফুফে এতে নমনীয় হয়নি। এখন এই ফুটবলারদের বাটলার কীভাবে স্বাগত জানান, সেটাই দেখার বিষয়। এরই মধ্যে সাবিনাসহ ৬ জন যাচ্ছেন ভুটানে। তাই আপাতত এ পরিস্থিতি এড়াতে পারলেন তারা ৬ জন।

এশিয়ার ৩৪টি দেশ অংশ নেবে বাছাইপর্বে। আট গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলবে দেশগুলো। ছয় গ্রুপে আছে ৪টি করে দল। বাকি দুই গ্রুপে আছে ৫টি করে দল। আট গ্রুপের চ্যাম্পিয়নরা চূড়ান্ত পর্বে যোগ দেবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে। আগামী ২৩ জুন থেকে ৫ জুলাই এএফসি এশিয়ান কাপের বাছাইপর্ব হবে মিয়ানমারে। এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্ব আগামী বছর ১-২১ মার্চ অস্ট্রেলিয়ায়।

২০২৩ সালে অলিম্পিক বাছাই খেলতে সাফ চ্যাম্পিয়ন নারী দলকে আর্থিক কারণ দেখিয়ে মিয়ানমারে না পাঠানোয় নেতিবাচক সমালোচনার মধ্যে পড়েছিল বাফুফে। এবার এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের খেলা সেই মিয়ানমারেই পড়েছে। এবার কি দল পাঠাবে বাফুফের নতুন প্রশাসন?

বিদ্রোহী ফুটবলারদের বাদ দিয়ে নতুনদের নিয়ে গড়া দল নিয়ে সম্প্রতি আরব আমিরাত সফরে যান বাটলার। ফল ভালো হয়নি মোটেও। স্বাগতিক আরব আমিরাতের সঙ্গে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলে দুটিতেই ৩-১ গোলে হেরেছে আফিদা খন্দকারের নেতৃত্বাধীন দল।