কাতারের লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামে আজ বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স। লিওনেল মেসিদের হারিয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পেরা শিরোপা জিতলেই মাত্র দ্বিতীয় কোচ হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়বেন ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম। সফল হলে তিনি ছুঁয়ে ফেলবেন কিংবদন্তি ইতালিয়ান কোচ ভিত্তোরিও পোৎজোকে, যিনি একমাত্র কোচ হিসেবে দুটি বিশ্বকাপ জিতেছেন।

মাত্র দুটি জাতি টানা দুবার বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব দেখিয়েছে। ইতালি ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে এবং ব্রাজিল ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে টানা বিশ্বকাপ মুকুট ঘরে তোলে। তৃতীয় দল হিসেবে টানা দুবার বিশ্বকাপ জিতে তাদের পাশে বসার সুযোগ এসেছে ফ্রান্সের সামনে।

‘দ্য ওল্ড মাস্টার’ পোৎজোর কীর্তি নিয়ে অতটা প্রচার হয়নি, ফলে তিনিও আলোতে আসেননি। ‘ফুটবল অ্যান্ড দ্য ওয়্যার’ নেটওয়ার্কের সভাপতি ও সহপ্রতিষ্ঠাতা ইতিহাসবিদ ড. অ্যালেক্স আলেক্সান্দ্রু বলেন, এটা সত্য যে ইচ্ছেকৃতভাবেই করা হয়েছে যাতে খুব কম মানুষই তার সম্পর্কে জানতে পারে। ১৯৩০-এর দশকে চরম ডানপন্থা ও ফ্যাসিজমের সময় পোৎজোর পাওয়া সফলতাকে মোটেও কৃতিত্ব দিতে চায়নি ফিফা ও ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশন, ফলে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পোৎজোকে নিয়ে কোনো আলোচনাও ছিল না।

পোৎজো ১৯১২ সালের অলিম্পিকে যখন প্রথমবার ফুটবল দলের দায়িত্ব নেন তখন ইতালিতে ফ্যাসিস্টরা ক্ষমতায় যায়নি। এমনিতে তিনি কখনই ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টিতেও যোগ দেননি। এর পরও বেনিতো মুসোলিনির স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে তাকে জড়িয়ে গল্প তৈরি করা হয়েছে।

ইতালির জার্সিতে সগৌরবে শোভা পায় চার তারকা, এর মধ্য দিয়ে তারা চারটি বিশ্বকাপ জয়ের গৌরবই করে। তার মানে, ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালের দুটি বিশ্বকাপও গণনায় ধরে আজ্জুরিরা। কিন্তু পোৎজোকে স্বীকৃতি দিতে এতটা অস্বস্তি কেন?

‘হাউ টু উইন ওয়ার্ল্ড কাপ’ বইয়ে এ নিয়ে ইতালির ফুটবল বিশেষজ্ঞ জন ফুট বলেন, দেখুন, এখানে খানিকটা খটকা তো লাগবেই। কেননা ফ্যাসিস্ট আমলে ট্রফি জিতেছেন বলেই পোৎজোর অর্জনকে এতটা বড় করে দেখা হয় না। বলা হয়, তাকে এটা করতে জোর করা হয়নি, তিনি এতে অংশ নিয়েছেন। 

আবার ১৯২২ সালে ক্ষমতা দখলের পর মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট সরকার ফুটবলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার গুরুত্ব বুঝতে পারল এবং দ্রুতই তারা জাতীয় ফুটবল দলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করল। ফুটবলে সর্বোচ্চ সাফল্য আনতে বিনিয়োগ করা হলো। ১৯২৯ সালে সিরি-এ লিগকে স্বীকৃতি প্রদান করা হলো, যাতে এখান থেকে তরুণ খেলোয়াড় উঠে আসে। ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান করা হলো মিলিশিয়া জেনারেল গিওর্গিও ভাকারোকে। যদিও জাতীয় দলের ‘পোস্টার বয়’ হয় উঠলেন পোৎজো।

১৯৩৪ সালে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় আসরের স্বাগতিক হলো ইতালি। ফ্যাসিজমের জাতীয়তাবাদী মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেয়া আর বিশ্বের মাঝে নিজেদের আধুনিক ও স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে তুলে ধরতে তারা সেবার বিশ্বকাপ জিততে মরিয়া হয়। পোৎজোর উচ্চমানের ট্যাকটিকস আর স্বাগতিক দর্শকদের কারণে ইতালির সাফল্য আসে। যদিও গুজব রয়েছে—মুসোলিনি এখানে প্রভাব রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে রেফারিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

যদিও এসব অভিযোগ কখনই প্রমাণিত হয়নি।

ইতালিতে বিশ্বকাপ জয়ের পরও দুরন্ত ছুটছিল পোৎজোর দল। ১৯৩৮ সালে ফ্রান্সের মাটিতে তারা জিতে নেয় বিশ্বকাপও। এর মধ্য দিয়ে প্রথম কোচ হিসেবে বিদেশের মাটিতে বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস গড়েন পোৎজো। এরপর অবশ্য সেই রেকর্ডটি ভেঙে গিয়েছে। কিন্তু একমাত্র কোচ হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের নজির আর নেই। এবার কি দেশম ছুঁয়ে ফেলবেন এই কীর্তিমানের কীর্তিটা?