দক্ষিণ আফ্রিকার চিরায়ত পেস ও বাউন্সি উইকেট বিশ্বের বেশিরভাগ দলের কাছেই রীতিমতো এক বিভীষিকার নাম। অন্য সব দেশে খেলে সফলতা মিললেও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সাফল্য নিয়ে ফেরা কঠিন সব সময়ই। অতি সম্প্রতি রোহিত শর্মার ভারত ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হয়ে ফিরেছে। ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্যও। ২০০২ সালের প্রথম ট্যুর থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রতিবারই দ্বিপাক্ষিক সিরিজ কিংবা বৈশ্বিক আসর থেকে দুঃস্বপ্ন নিয়ে দেশে ফিরেছের বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। সেই ‘মরু’তেই এবার ফুল ফুটালেন তামিম, সাকিব, তাসকিনরা; লিখলেন ক্রিকেটের নতুন রূপকথা। ওয়ানডে সিরিজে দক্ষিণ আফ্রিকাকে তাদেরই মাঠে প্রথমবারের মতো হারিয়ে দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনলেন ক্রিকেটাররা।

 

আগের ট্যুরগুলোতে বাংলাদেশের ফলাফল তুলে ধরলেই এবারের সিরিজ জয়ের মাহাত্ম্য কতখানি তো পরিষ্কার হয়ে যাবে। ২০০২ সালেই ফেরা যাক। সেবার প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। সেবার ওয়ানডে কিংবা টেস্ট কোনো ফরম্যাটেই দাঁড়াতে পারেনি ক্রিকেটের নবীন দল বাংলাদেশ। তিন ওয়ানডেতে বাংলাদেশ যথাক্রমে ১৩৩, ১৫৪ ও ১৫১ রান তুলতে সমর্থ হয়। ফলে হারতে হয় ১৬৮ রান, ১০ উইকেট ও ৭ উইকেটের ব্যবধানে। সেবার দুই টেস্টেই ইনিংস ব্যবধানে হার নিয়ে অবনত মাথায় দেশে ফেরে খালেদ মাসুদ পাইলটের দল।

 

২০০৮ সালে টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিল আরো লজ্জাজনক। সিরিজের দুই টেস্টেই পরাজয় ইনিংস ব্যবধানে। সেঞ্চুরিয়নে দ্বিতীয় টেস্টে তরুণ সাকিব আল হাসান ৬ উইকেট নিলেও তাতে দলের ইনিংস পরাজয় রুখতে পারেননি তিনি। ব্লোয়েমফন্টেইনেও সাকিব ৫ উইকট নেন, যদিও দল ফলোঅনের লজ্জাবরণ করে। সেবার তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজেও বাংলাদেশ হোয়াইটওয়াশ হয়। হার যথাক্রমে ৯ উইকেট, ৭ উইকেট ও ৭ উইকেটে।

 

২০১৭ সালের প্রথম টেস্টে খানিকটা উন্নতি করে বাংলাদেশ। ওই টেস্টে হার ৩৩৩ রানের। যদিও দ্বিতীয় টেস্টে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়া বাংলাদেশ আবার হেরে যায় ইনিংস ব্যবধানে। সেবার তিন ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশ হেরেছে যথাক্রমে ১০ উইকেট, ১০৪ রান ও ২০০ রানের ব্যবধানে!

 

২০০২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনটি ট্যুরের সবগুলো সিরিজেই ধরাশায়ী হয়েছে বাংলাদেশ। ১৯ ম্যাচের মধ্যে একটিতেও জেতা হয়নি। এছাড়া ২০০৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে কানাডার কাছে লজ্জাজনক এক হার দিয়ে শুরু। এরপর শ্রীলংকার কাছে ১০ উইকেটে, দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ১০ উইকেটে, নিউজিল্যান্ডের কাছে ৭ উইকেটে ও কেনিয়ার কাছে ৩২ রানে হেরেছে বাংলাদেশ। বৃষ্টির কল্যাণে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচে এক পয়েন্ট তুলে নেয়াটাই ছিল সেই বিশ্বকাপের অর্জন। সেবারের ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে যথারীতি একটা তদন্ত কমিটিও গঠন করতে হয়েছিল!

 

দেশটিতে ২০০৭ সালের টি২০ বিশ্বকাপে অবশ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৬ উইকেটে হারানোর সুখস্মৃতি রয়েছে টাইগারদের। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের বাকি স্মৃতি নিশ্চিতভাবেই ভুলে যেতে চেয়েছেন ক্রিকেটাররা। যদিও তামিম-তাসকিনদের বীরত্বে আর লজ্জায় মুখ লুকাতে হবে না। দক্ষিণ আফ্রিকা সফর নিয়ে আর বিব্রতও হতে হবে না বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে।

 

এবার সফরের শুরু থেকেই ছিল ইতিবাচক আবহ। ছুটি বাতিল করে সাকিব আল হাসানের ফেরা, কোচিং স্টাফে অ্যালান ডোনাল্ড ও অ্যালবি মরকেলের যুক্ত হওয়া—সবকিছু যেন বাংলাদেশকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলছিল। তাইতো সিরিজ শুরুর আগে অধিনায়ক তামিম ও হেড কোচ রাসেল ডোমিঙ্গো বলছিলেন, এবার খালি হাতে ফিরতে চান না তারা। তারা কথা রেখেছেন, তাদের স্বপ্নপূরণ হয়েছে।

 

সেঞ্চুরিয়নে প্রথম ওয়ানডেতেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে পর্যুদস্ত করার মধ্য দিয়ে এবারের স্বপ্নযাত্রার শুরু। জোহানেসবার্গে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে হারলেও সেই সেঞ্চুরিয়নে আবার গর্জে ওঠে টাইগাররা। বোলিংয়ে তাসকিন, সাকিবদের অনবদ্য পারফর্যান্সের পর ব্যাটিংয়ে সুপারস্পোর্ট পার্কের সবুজে রীতিমতো ফুল ফুটিয়েছেন তামিম, লিটন আর শেষ দিকে সাকিব।

 

ইতিহাস হাতছানি দিয়ে ডাকছিল টাইগারদের। জয় শেষে তামিম বলেছেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় সিরিজ জেতা খুবই কঠিন। ওদের গত সিরিজ দেখুন, পূর্ণশক্তির ভারতের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানে জিতেছে। আমাদের একটা বিশ্বাস অবশ্যই ছিল যে আমরা জিততে পারি। তবে সিরিজ জিততে আমাদের অনেক ভালো খেলতে হতো এবং আমার তা পেরেছি। আমরা যে চারজন সিনিয়র ক্রিকেটার আছি, ১৫ বছর ধরে একসঙ্গে খেলছি, আমাদের জন্য এটা বিরাট অর্জন। আমি এই জয়কেই সবার উপরে রাখবো। এটা অনেক বড় জয়।

 

জয় শেষে ৫ উইকেট পাওয়া তাসকিনকে প্রশংসায় ভাসিয়ে অধিনায়ক তামিম বললেন, আমি খুবই গর্বিত, বিশেষ করে বাংলাদেশের একজন বোলার ৫ উইকেট পেয়েছে এবং বাংলাদেশের জন্য সিরিজ জিতেছে ও সিরিজসেরা খেলোয়াড় হয়েছে। তাসকিন কঠোর পরিশ্রম করেছে এবং মানসিকতার যে পরিবর্তন এনেছে তার ফল পাচ্ছে।

 

আসলে মানসিকতার পরিবর্তন এসেছে গোটা দলের মধ্যেই। বছরজুড়ে লিটন দাসের ইতিবাচক ব্যাটিং, সেঞ্চুরিয়নে প্রথম ওয়ানডেতে মেহেদী হাসান মিরাজের অলরাউন্ড পারফরম্যান্স, তরুণ পেসার শরিফুল ইসলামের প্রতিভার সাক্ষর রেখে চলা, তামিমের সামনে থেকে নেতৃত্বদান আর চ্যাম্পিয়ন অলরাউন্ডার সাকিবের প্রতিটি বিভাগেই অবদান রেখে চলা বদলে দিয়েছে বাংলাদেশকে।