এক মাসের ব্যবধানে দু-দুটি সাফ মুকুট জয়ের গৌরব অর্জন করল বাংলাদেশের মেয়েরা। গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে টাইব্রেকারে মহানাটকীয়তার পর যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ ও ভারত। এবার সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালেও প্রতিপক্ষ সেই ভারত। এবারো মীমাংসা হলো টাইব্রেকারে। গতকাল ফাইনালে দুর্দান্ত কামব্যাকে ভারতকে হারায় লাল-সবুজ কিশোরীরা। ১-১ গোলে ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকারে ৩-২ গোলের জয় তুলে নেয় অর্পিতা বিশ্বাসের দল।
নির্ধারিত সময়ের খেলায় শুরুর দিকে এক গোল হজম করে পরে দ্বিতীয়ার্ধে সমতায় ফেরে বাংলাদেশ। টাইব্রেকারেও শুরুতে বিপর্যয়। বাংলাদেশের প্রথম শট মিস করে ফরোয়ার্ড সুরভী আকন্দ প্রীতি। যদিও পরে গোলকিপার ইয়ারজান বেগমের দুর্দান্ত তিনটি সেভে সাফ শিরোপা জিতে নেয় বাংলাদেশ।
টুর্নামেন্টসেরা খেলোয়াড় প্রীতি টাইব্রেকারে স্পট কিক থেকে গোল করতে ব্যর্থ হয়। এরপর ভারতের অধিনায়ক সবিতা রানী দারুণ এক গোলে দলকে এগিয়ে দেয়। মূল খেলায় বাংলাদেশের সমতাসূচক গোল করা মারিয়াম বিনতে হান্না টাইব্রেকারে গোল করলে প্রাণ ফেরে লাল-সবুজ শিবিরে। ভারতের দ্বিতীয় শট নেয়া এলেনা দেবির শট রুখে দেয় ইয়ারজান। পরের শটে গোল করতে ভুল করেনি বাংলাদেশের থুইনুয়ে মারমা। ইয়ারজান আরেকবার বীরত্বে দেখিয়ে রুখে দেয় ভারতের বোনিফিলিয়া সুলাইয়ের শট।
স্কোরলাইন যখন ২-১ তখন আবার নাটকীয়তা। আলপি আক্তার হতাশ করে বাংলাদেশকে। এরপর ভারতের অন্বিতা রঘুরমণ গোল করে ২-২-এ সমতা আনে। পঞ্চম শটে বাংলাদেশকে গোল উপহার দেয় সাথী মুন্ডা (৩-২)। ভারতের তখন বাঁচা-মরা। দিব্যানি লিন্ডার মহাগুরুত্বপূর্ণ সেই শটটি রুখে দিয়ে বাংলাদেশকে অনূর্ধ্ব-১৬ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা উপহার দেয় গোলকিপার ইয়ারজান বেগম।
এবারের চার দলের আসরে রাউন্ড রবিন লিগে ভারতকে ৩-১ গোলে হারায় সাইফুল বারী টিটুর শিষ্যরা। তাই গতকাল মনস্তাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশের মেয়েরাই এগিয়ে ছিল। ফাইনালেও জিতল লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। ম্যাচের চতুর্থ মিনিটে আনুশকা কুমারী বাম পায়ের মোহনীয় এক গোলে এগিয়ে দিয়েছিল ভারতকে। প্রথমার্ধে সেই গোল পরিশোধ করতে পারেনি প্রীতি, আলপিরা। অবশেষে ম্যাচের ৭০ মিনিটে লাল-সবুজে ঢেউ জাগল মারিয়ামের গোলে। অনন্য বীথির করা কর্নারে ছোট বক্সের ভেতর থেকে নেয়া শটে গোল করে মারিয়াম।
এরপর ভারত চাপ তৈরি করে গেলেও গোল আর আদায় করতে পারেনি। সমতা আনার পর বাংলাদেশও নিজেদের খেলায় ছন্দ খুঁজে পায়। এ সময় তারা ভারতের গোলমুখে একের পর আক্রমণে যায়। ৯০ মিনিটে দুই দল আর কোনো গোলের দেখা পায়নি। অতিরিক্ত সময়ের খেলাও সাফে নেই। ফলে টাইব্রেকারে শিরোপার মীমাংসা হয়। রোমাঞ্চকর এ স্পট কিকের লড়াইয়ে ভারতীয় কিশোরীদের কাঁদিয়ে শিরোপার উৎসব করে বাংলাদেশের কিশোরী অর্পিতা, প্রীতি, মারিয়াম, থুইনুয়েরা।
সাফ অনূর্ধ্ব-১৫/অনূর্ধ্ব-১৬/অনূর্ধ্ব-১৭ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে এটা বাংলাদেশের দ্বিতীয় শিরোপা। ভারতও জিতেছে দুটি শিরোপা। এছাড়া অতিথি দল রাশিয়া ও নেপাল একবার করে শিরোপা জিতেছে।
গত বছর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৭ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন হয় রাশিয়ার মেয়েরা। এবারই প্রথমবারের মতো হলো অনূর্ধ্ব-১৬ ক্যাটাগরির সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। নেপালের ললিতপুরে লাল-সবুজের কর্তৃত্বে শেষ হলো এ আসর।
এবারের সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নেপাল, ভারত, বাংলাদেশ ও ভুটান। রাউন্ড রবিন লিগ শেষে টেবিলের শীর্ষ দল হিসেবে ফাইনালে ওঠে বাংলাদেশ ও ভারত। ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে শিরোপার স্বাদ পেল বাংলাদেশ।
সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারের রেসে ছিল ভারতের আনুশকা কুমারী ও বাংলাদেশের সুরভী আকন্দ প্রীতি। যদিও ফাইনালে এক গোল করে প্রীতিকে পেছনে ফেলে ট্রফি জিতে নেয় আনুশকা। খালি হাতে ফিরছে না প্রীতিও। সে জিতেছে আসরের সেরা খেলোয়াড়ের ট্রফি। আর আসরের সেরা গোলকিপার হয়েছে ফাইনালে বাংলাদেশের জয়ের নায়ক ইয়ারজান বেগম।
জয়ের অনুভূতি প্রকাশ করে বাফুফের ভিডিওতে ইয়ারজান বলে, ‘আজ অনেক ভালো লাগছে আমার। প্রথম টুর্নামেন্ট খেলছি। আর বেস্ট গোলকিপার হওয়ার অনুভূতিটা অনেক। এ পর্যায়ে আসার জন্য আমার কোচকে ধন্যবাদ জানাই। আজ অনেক খুশি আমি। প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলে সেরা গোলকিপার হইছি। আমি আমার বাবা ও কোচকে এ জয় উৎসর্গ করছি।’
বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক অর্পিতা শিরোপা জয়ের অনুভূতি ব্যক্ত করে বলে, ‘ফাইনালের আগে প্রথমে যখন ট্রফির সঙ্গে ছবি তোলা হয় তখন আমি খুব শিহরিত ছিলাম। সামনে আনা হলে আমিই প্রথম দেখি। তখন আমার ভেতরে কাজ করছিল—ট্রফিটা আমিই নেব। ভারতের অধিনায়ক ট্রফিটা ধরেনি, আমি ধরেছি। এতে আমার মধ্যে অনুভূতি জাগে—যেহেতু আমি ট্রফিটা ধরেছি, এটা আমিই বাংলাদেশে নিয়ে যাব। খেলোয়াড়দের বলেছি, আমি যেহেতু ট্রফিটা ধরেছি, এটা আমরাই নেব। আমি সার্থক হয়েছি যে ট্রফিটা আমাদের কাছেই ধরে রাখতে পেরেছি।’
সেরা খেলোয়াড় প্রীতি বলে, ‘সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারের জন্য আক্ষেপ করছি না। কারণ আমাদের কাছে চ্যাম্পিয়ন হওয়াটাই বড়। আমাদের বিশ্বাস ছিল, ইয়ারজান ভালো কিছু সেভ দেবে এবং আমরা জিতব। ইনশা আল্লাহ আমরা জিতছি। আমরা দুই মাস কষ্ট করে টুর্নামেন্টে আসছি, তার ফল আল্লাহ দিছে আমাদের।’
জাতীয় দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুনের মতো বড় খেলোয়াড় হতে চায় প্রীতি। সে বলে, ‘আমার টার্গেট ভবিষ্যতে সাবিনা আপুর মতো বড় খেলোয়াড় হব।’










