সাফল্যের সমার্থক নাম অলিম্পিক লিওঁ ফেমিনিন। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এ দলটি নারী ফুটবলের পরাশক্তি হয়ে উঠেছে। ঘরোয়া ও ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতা মিলে মোট ৩৮টি শিরোপা জয় করে তারা। নারীদের চ্যাম্পিয়নস লিগে তাদের রেকর্ড অতুলনীয়, অদ্বিতীয়। ২০১১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যবর্তী ১১ বছরে তারা আটবার জিতেছে চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা।

রেকর্ড ১২তম বারের মতো চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালের হাতছানি লিওঁর সামনে। গতকাল রাতে চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনালের প্রথম লেগে তারা আর্সেনালের মাঠ এমিরেটসে খেলতে নামে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লিওঁর প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগ কিংবা মাঠের সাফল্যে লিওঁকে চ্যালেঞ্জ জানাতে তৈরি আরো কয়েকটি ক্লাব। স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনা টানা তৃতীয়বারের মতো ইউরোপিয়ান মুকুট জয়ের কাছাকাছি। তারাও লিওঁর মতো সেমিফাইনাল খেলবে। সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ইংলিশ ক্লাব চেলসি।

জঁ-মিশেল অলাসের প্রায় দুই দশকের আবেগঘন যাত্রা শেষে লিওঁর দায়িত্ব নিয়েছেন কোরিয়ার-আমেরিকান বিজনেস টাইকুন মিচেলে ক্যাং। তার অধীনে ক্লাবটিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হচ্ছে।

প্রায় ৩০ বছর ধরে একজন অন্তঃপ্রাণ লিওঁ ছিলেন অলাস। মালিকানায় আসার পর ১৯৮৭ সালে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। সিটি মেয়র ও ফর্মুলা ওয়ান কিংবদন্তি অ্যালাইন প্রোস্টের অনুরোধে তিনি লিওঁর পুরুষ দলের দায়িত্ব নেন। তার চৌকস নেতৃত্বে চলতি শতাব্দীর প্রথম দিকে দোর্দণ্ডপ্রতাপ দেখায় লিওঁ, যারা ২০০১-০২ থেকে টানা আট মৌসুম ফরাসি লিগ ওয়ানের শিরোপা জিতে নেয়। এ সময় তারা চারবার রানার্সআপও হয়।

ছেলেদের মতোই মেয়েদের ফুটবলেও সাফল্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় তিনি ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন অলিম্পিক লিওঁ ফেমিনিন। তার মালিকানায় ও দূরদর্শিতায় ক্লাবটি বিদেশী তারকা খেলোয়াড়দের মন কাড়তে সমর্থ হয়। ফ্রান্সে প্রথম তারাই মিশ্র লিঙ্গের একাডেমি চালু করে। তিন বছরের মধ্যেই আসে সাফল্য। ২০০৬-০৭ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ জিতে নেয় তারা। এরপর বাকিটা ইতিহাস।

২০২২ সালে অলিম্পিক লিওঁ গ্রুপের বৃহদংশ শেয়ারের মালিকানা কিনে নেয়ার মধ্য দিয়ে ক্লাবটির কর্তৃত্ব চলে যায় ঈগল ফুটবলের হাতে। এর মধ্য দিয়ে অলিম্পিক লিওঁতে অলাসের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। পুরুষ ও নারী উভয় দলেই। পরের বছর ক্লাব সভাপতির পদও ছাড়েন অলাস। ৩৬ বছর এ পদ সামলেছেন তিনি।

২০২৩ সালে মেয়েদের দলের মালিকানা আবারো হাতবদল হয়। কর্তৃত্বে চলে আসেন মিচেলে ক্যাং, যিনি মূলত হেলথকেয়ার আইটি খাতের সফল ব্যবসায়ী হিসেবে বিলিয়ন ডলার উপার্জন করেছেন। তিনি অলিম্পিক লিওঁ নারী দলের দায়িত্ব নেয়ার পরই এটিকে পুরুষ দল থেকে সম্পূর্ণরূপে ‘স্বাধীন’ ও আলাদা করে ফেলেন। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ভিনসেন্ট পনসত বলেন, ‘আমি মনে করি আমাদের দলে নতুন প্রাণের সঞ্চারের প্রয়োজন ছিল, প্রয়োজন ছিল নতুন একটি প্রকল্পের। বৈশ্বিক এক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ঠিক সেটাই নিয়ে এসেছেন মিচেলে ক্যাং। এখন আমরা চেলসি, আর্সেনাল, ম্যানসিটি কিংবা বার্সেলোনার মতো। তুমুল প্রতিযোগিতা রয়েছে এবং আমাদের স্বপ্ন ইউরোপের অন্যতম সেরা হওয়া। মিচেলে যদি না আসতেন, আমি মনে করি আমাদের জন্য কাজটি কঠিন হতো। কারণ এখন বিশ্ব অনেক দ্রুত ছুটছে।’

ক্যাংকে নারী ফুটবলের ‘প্রথম টাইকুন’ হিসেবে অভিহিত করেছে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস। যদিও তিনি অপেক্ষাকৃত একটু দেরিতে ফুটবলে এসেছেন। ২০১৯ সালে বিশ্বকাপজয়ী যুক্তরাষ্ট্র দলের সঙ্গে সাক্ষাতের পরই মূলত তিনি খেলার প্রতি আকৃষ্ট হন। এর পরই কিনিসকা স্পোর্টস ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের পোর্টফোলিও সমৃদ্ধ হতে থাকে। লিওঁ ছাড়াও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল উইমেনস সুপার লিগের দল ওয়াশিংটন স্পিরিটের বৃহদংশ শেয়ারের মালিক ২০২২ সাল থেকে। উইমেনস চ্যাম্পিয়নশিপের দল লন্ডন সিটি লায়নেস কিনে নেন ২০২৩ সালে।

মিচেলে ক্যাং যে শুধু মালিকানা পেতেই আগ্রহী, তেমনটি নয়। গত বছর শীর্ষ নারী অ্যাথলিটদের স্বাস্থ্যের উন্নতিকল্পে এক প্রকল্পের জন্য ৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেন তিনি। লিওঁকে নিয়েও বড় স্বপ্ন তার। ১৫ থেকে ১৮ হাজার দর্শক ধারণক্ষম স্টেডিয়ামে তিনি শুধুই নারীদের জন্য আলাদা ‘উইমেনস সেন্টার’ বানাতে চান। এমনকি লিওঁর খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাজ করা স্টাফের সংখ্যাও তিনি অনেক বাড়িয়েছেন। লিওঁর মিডফিল্ডার ও যুত্তরাষ্ট্র দলের অধিনায়ক লিন্ডসে হিপস বলেন, ‘মিচেলে অবিশ্বাস্য। মেয়েদের খেলায় আমি এমন কিছু আগে দেখিনি। তিনি যেভাবে বিনিয়োগ করেন, এমনকি যেভাবে কথা বলেন তা সবার চেয়ে আলাদা।’ —বিবিসি