সদ্যসমাপ্ত নবম বিপিএলের সবচেয়ে গৌরবদীপ্ত দিকটি হলো শীর্ষ ছয় রান সংগ্রাহকের সবাই বাংলাদেশী। প্রতিবার যেখানে বিদেশীরা আধিপত্য করেন, সেখানে এবার শীর্ষ ছয়টি জায়গা দখল করে আছেন স্থানীয় ক্রিকেটাররা। হয়তো এ বিপিএলের এটাই সেরা সাফল্য। এছাড়া বোলিংয়েও শীর্ষ পাঁচের চারটিই দখল করেছেন দেশীরা। 

গত বৃহস্পতিবার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে ফাইনালে চারটি হাফসেঞ্চুরির তিনটিই এসেছে স্থানীয় ক্রিকেটারদের ব্যাট থেকে, আর একটি বিদেশী ব্যাটারের করা। আবার কুমিল্লার মুস্তাফিজুর রহমান ও সিলেটের রুবেল হোসেন ফাইনালে দুটি করে উইকেট শিকার করে ছিলেন নিজ নিজ দলের সেরা পারফরমার। ফাইনালকেই গোটা আসরের প্রতীকী চিত্র বলা যেতে পারে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আসন্ন টি২০ ও ওয়ানডে সিরিজ সামনে রেখে শান্ত, লিটন, সাকিব, মুশফিকদের ফর্ম বাংলাদেশকে আশাবাদী করে তুলছে। 

নবম বিপিএলে সবচেয়ে বেশি রান করার গৌরব অর্জন করলেন সিলেট স্ট্রাইকার্সের ওপেনিং ব্যাটার নাজমুল হোসেন শান্ত। তিনি ১৫ ম্যাচে ৫১৬ রান করেছেন ৩৯.৬৯ গড়ে। তার সতীর্থ তৌহিদ হৃদয় ১৩ ম্যাচে করেছেন ৪০৩ রান। সিলেটকে ফাইনালে তোলার ক্ষেত্রে দুর্দান্ত ভূমিকা রেখেছেন শান্ত ও হৃদয়। ফাইনালেও হেসেছে শান্তর ব্যাট। তিনি করেন ৪৫ বলে ৬৪ রানের ঝলমলে ইনিংস। যদিও এদিন বিফলে যায় তার ও মুশফিকুর রহিমের হাফসেঞ্চুরি। ৫২ বলে ৭৯ রানের টর্নেডো ইনিংস খেলে ফাইনালে কুমিল্লাকে জেতান ক্যারিবিয়ান হার্ড হিটার জনসন চার্লস। 

১৩ ম্যাচে ৪২৫ রান করে তালিকার দুইয়ে রংপুরের রনি তালুকদার। ফাইনালে ৩৯ বলে ৫৫ রান করে তালিকার শীর্ষ পাঁচে ঢুকে পড়েছেন কুমিল্লার লিটন কুমার দাস। ১৩ ম্যাচে ৩৭৯ রান করেছেন তিনি ৩১.৫৮ গড়ে। আর ফরচুন বরিশাল অধিনায়ক সাকিব আল হাসান ১৩ ম্যাচে ৩৭৫ রান নিয়ে ৫ নম্বরে। তার দল এলিমিনেটর ম্যাচে রংপুর রাইডার্সের কাছে হেরে বিদায় নেয়ায় শীর্ষ রান সংগ্রাহক হওয়ার রেস থেকে তিনি ছিটকে যান। তালিকার পাঁচে থাকা ঢাকা ডমিনেটর্স অধিনায়ক নাসির হোসেন ১২ ম্যাচে ৩৬৬ রান করেছেন ৪৫.৭৫ গড়ে। যদিও তার দল রাউন্ড রবিন লিগ থেকে বিদায় নেয়ায় এ রেস থেকে তিনি ছিটকে যান। বল হাতেও ১৬টি উইকেট নেন নাসির। তার দল প্লে-অফে খেললে নিশ্চিতভাবেই তিনি টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার জিতে নিতেন। 

বোলিংয়েও বাংলাদেশীদের দাপট। শীর্ষ পাঁচের চারজনই বাংলাদেশী। দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ার ম্যাচে সিলেটের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে রংপুর। তাতে হাসান মাহমুদের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের রেকর্ড পড়ে হুমকির মুখে। ফাইনালে এক উইকেট নিয়ে হাসান মাহমুদকে দুইয়ে ঠেলে দিয়ে শীর্ষস্থান দখল করেন কুমিল্লার স্পিনার তানভির ইসলাম। ১২ ম্যাচে ১৭.৫৮ গড়ে তিনি নিয়েছেন ১৭ উইকেট। হাসান মাহমুদ সমান ১৭টি উইকেট নিলেও উইকেটপ্রতি রান দেন ২৪.৮২, যেখানে তানভির দেন ১৭.৫৮। 

নাসির হোসেন ১২ ম্যাচে ১৮.০৬ গড়ে ১৬ উইকেট নিয়ে তিনে অবস্থান করছেন। ১৫ উইকেট নিয়ে এর পরই রংপুরের আফগান পেসার আজমতউল্লাহ ওমরজাই। ফাইনালে দুই উইকেট শিকার করে সিলেটের রুবেল হোসেন উঠে আসেন ৫ নম্বরে। তাতে পাকিস্তানি তারকা ফাস্ট বোলার মোহাম্মদ আমির (১১ ম্যাচে ১৪ উইকেট) নেমে যান ৬ নম্বরে। আমির রাউন্ড রবিন লিগ শেষ হওয়ার আগেই পাকিস্তান সুপার লিগে অংশ নিতে দেশে ফিরে যান। ফলে শীর্ষ উইকেট শিকারির রেস থেকে তিনি ছিটকে যান।

এবারের বিপিএলে স্থানীয়দের উজ্জ্বল পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও নবম বিপিএলের টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান রকিবুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছি এবং এটিই হলো বড় প্রাপ্তি। ক্রিকেটের দৃষ্টিকোণ থেকে বড় প্রাপ্তি এই যে, এবারের বিপিএলে আমাদের ঘরোয়া ব্যাটার ও বোলাররা ওইভাবে আগের মতো নির্ভরশীল ছিল না বিদেশীদের ওপর। তারা নিজেদের অবস্থান থেকে নিজেদের মেলে ধরেছে এবং এটা আমাদের জন্য বিশাল প্রাপ্তি।’ 

প্রতিবারই দু-একজন তরুণ উঠে আসে বিপিএল দিয়ে। এবার কাকে দেখছেন? এ নিয়ে রকিবুল বলেন, ‘‌তানভিরের (কুমিল্লার তানভির ইসলাম) কথা বলব।’

সামগ্রিকভাবে দেশীদের পারফরম্যান্সে তিনি খুশি। এ বর্ষীয়ান ক্রিকেট বিশ্লেষক ও কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘আমাদের পেস বোলাররাও ধারাবাহিকভাবে ভালো বোলিং করেছে। ব্যাটিংয়ে নাজমুল শান্ত, জাকির হোসেন...। শান্তর ওপর আস্থা রেখেছিল জাতীয় দল, অনেকে অনেক কথা বলেছে তা নিয়ে। সেই আস্থার প্রতিদান সে দিয়েছে। এ বিপিএলে ৫০০ রান কিন্তু বিরাট ব্যাপার, রেকর্ড। আগে কেউ কখনো ৫০০ করতে পারেননি, তাই ব্যাটার হিসেবে শান্তকে অনেক অনেক সাধুবাদ। জাকির ভালো খেলেছে। আবার প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড় লিটন, মুশফিক রানে ফিরে এসেছে, মাহমুদউল্লাহও রান পেয়েছে।’