খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। গত বছরের সেপ্টেম্বর। পরাশক্তি ভারতের আধিপত্যের সমাপ্তি ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা জিতে নেয় বাংলাদেশের মেয়েরা। ফুটবলের বীরাঙ্গনারা দেশে ফিরলে ছাদ খোলা বাসে বিমানবন্দর থেকে নিয়ে আসা হয় ফুটবল ফেডারেশন ভবনে। চলছিল পুষ্পবৃষ্টি, অভিনন্দনে সিক্ত হচ্ছিলেন মেয়েরা। প্রধানমন্ত্রীও তাদের গণভবনে ডেকে নিয়ে পুরস্কৃত করেন। 

বর্তমান জাতীয় দলটিই বয়সভিত্তিক ফুটবলেও দেশকে একাধিকবার গৌরবে এনে দিয়েছে। নিকট অতীতে দেশের ফুটবলে সাফল্য বলতে যেটুকু তা মেয়েদের হাত ধরেই। তবে পরম তৃপ্তি আর স্বস্তি নেই সেই নারী ফুটবলে, শুরু হলো অস্থিরতা। নারী ফুটবলে সাফল্যের কাণ্ডারি, জাতীয় ও বয়সভিত্তিক দলের হেড কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন শুক্রবার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। একই দিন ফুটবল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় দলের কৃতী ফরওয়ার্ড সিরাত জাহান স্বপ্নাও। এর আগে আনুচিং মোগিনী ও সাজেদা খাতুনও ফুটবল ছেড়েছেন অকালে।

অপ্রতুল পারিশ্রমিক, সুযোগ-সুবিধা, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) কর্মকর্তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও অপেশাদারি কর্মকাণ্ডই কি এর পেছনে দায়ী? 

২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের কোচ ছোটন। নারীদের জাতীয় দল ও বয়সভিত্তিক দলগুলোকে নিয়ে ঈর্ষণীয় সব সাফল্য এনে দিয়েছেন দেশকে। গত বছরের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ মুকুট ছাড়াও তার অধীনে সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ (দুবার), সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ (একবার), এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ গার্লস রিজিওনাল চ্যাম্পিয়নশিপ (দুবার) ও বঙ্গমাতা অনূর্ধ্ব-১৯ উইমেনস ইন্টারন্যাশনাল গোল্ড কাপের শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ গত এপ্রিলে সিঙ্গাপুরে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৭ এশিয়ান কাপের বাছাই পর্ব (প্রথম রাউন্ড) সফলভাবে উতরে যায় বাংলাদেশের কিশোরীরা। 

গত বছর কাঠমান্ডুতে ফাইনাল শেষে হেড কোচ ছোটনকে এভাবেই মাথার ওপরে তুলে নিয়েছিল মেয়েরা। দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনা কোচের সেই গৌরবোজ্জ্বল দিন ফুরাল। তিনি দায়িত্ব থেকে সরে যাচ্ছেন। তার বর্তমান চুক্তি ৩১ মে পর্যন্ত। ১ জুন থেকে তিনি আর মেয়েদের কোচ থাকছেন না।

শুক্রবার ছোটন জানিয়েছেন, এ মাসের পর তিনি অবসরে চলে যাচ্ছেন। কারণ হিসেবে জানিয়েছেন, তিনি খুব ক্লান্ত। তার কথায়, টানা অনেকগুলো বছর নিজ পরিবার-পরিজন ছেড়ে শুধু ফুটবল নিয়ে থেকেছেন। এখন অনেক বেশি ক্লান্ত বোধ করছেন, তাই দায়িত্ব থেকে সরে যেতে চান। 

কিন্তু ক্ষোভের কারণ তো অবশ্যই রয়েছে। টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মলি বেতন পান ২০ হাজার ডলার (প্রায় ২০-২১ লাখ টাকা), আর হেড কোচ হিসেবে ছোটন পান এক লাখের মতো! বেতনটাও অনিয়মিত হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে। শুক্রবার পর্যন্ত এপ্রিলের বেতন পাননি নারী ফুটবলার ও কোচিং স্টাফের সদস্যরা। এমনকি তারা কোনো বোনাসও পান না। 

নারী ফুটবলারদের বেতনও কম। মাত্র ১০ হাজার টাকার মতো পান। সাফ জয়ের পর তাদের দাবি ছিল, বেতন বাড়িয়ে ৫০ হাজার করা হোক। সেই দাবির মুখে বাফুফে সভাপতি কাজী মো. সালাউদ্দিন বেতন বাড়িয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বটে, তবে তা বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। এরই মধ্যে কর্মকর্তাদের দুর্নীতির খবর বেরিয়ে আসে। বাফুফের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগকে সম্প্রতি নিষিদ্ধই করে দিয়েছে ফিফা। 

শুক্রবার ‘‌গুরু’ ছোটনের বিদায়ের কয়েক ঘণ্টা আগেই সাফজয়ী দলের তারকা ২২ বছর বয়সী স্বপ্না ফেসবুক পোস্ট করে ফুটবল থেকে বিদায় নেয়ার কথা জানান। তিনিও সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ জানাননি। স্বপ্নার ব্যাপারে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে ছোটন বলেছেন, ‌দুদিন আগেও স্বপ্না প্রশিক্ষণে পুরোদমে কঠোর পরিশ্রম করেছেন (অর্থাৎ ফুটবল নিয়েই তার ধ্যান-জ্ঞান ছিল)। মূলত দীর্ঘ আট মাস ধরে জাতীয় দলে কোনো খেলা না থাকাকেই দোষারোপ করলেন কোচ। 

মেয়েদের হতাশার কারণ স্পষ্ট। সম্প্রতি ঘটা করে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ করার ঘোষণা দিয়েও পরে তা আলোর মুখ দেখেনি। স্পন্সর জটিলতায় শুরুর আগেই বন্ধ হয়ে যায়। ফিফা উইন্ডোতে ফ্রেন্ডলি ম্যাচ তো দূরের কথা, পাশের দেশ মিয়ানমারেই অলিম্পিকের বাছাই পর্ব থেকে বাংলাদেশের নাম প্রত্যাহার করে নেয় বাফুফে। দল নিয়ে খেলতে যাওয়ার মতো টাকা ছিল না বলে তখন জানিয়েছিল বাফুফে।

ছোটন নিজেই জানালেন, মাঝের এ আট মাসে ভারতীয় নারী দল ৮-৯টা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ফেলেছে। জুলাইয়ে ভারতে হতে যাচ্ছে একটি আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট। সাফে রানারআপ হওয়া নেপালও খেলে ফেলেছে চারটি ম্যাচ। আর সাফজয়ী মেয়েরাই বসে আছে পুরো আট মাস। স্বপ্নার হতাশার কারণ স্পষ্ট করলেন তার কোচ ছোটন। 

আর নিজের সরে দাঁড়ানোর কারণ নিয়ে দেশের শীর্ষ এক সংবাদপত্রকে ছোটন বলেছেন, ‘‌আসলে এত বছর এ কাজটা করতে গিয়ে পরিবারকে সময় দিতে পারিনি। একের পর এক টুর্নামেন্ট এসেছে। মহিলা টিমের প্রতি সবার প্রত্যাশা বেড়েছে। চাহিদা বাড়ছে। আসলে সবার চাহিদা মেটানো কঠিন।’ 

ছোটন জানিয়েছেন, আপাতত কিছুদিন বিশ্রাম নেবেন তিনি, এরপর পরবর্তী করণীয় ঠিক করবেন।