লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পেকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার নেইমারকে বিক্রি করতে পারে প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। ২০১৭ সালে ২২২ মিলিয়ন ইউরোয় নেইমারকে দলভুক্ত করেছিল ফরাসি জায়ান্টরা। ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডকে বিক্রিতে বার্সেলোনা রাজি না হওয়ায় তার চুক্তিতে থাকা রিলিজ ক্লজের ২২২ মিলিয়ন ইউরো পরিশোধ করে খেলোয়াড়টিকে প্যারিসে নিয়ে যায় পিএসজি। তবে এই পাঁচ বছরে তিনি ক্লাবের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি, এনে দিতে পারেননি অধরা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা। আবার ক্লাবের ভবিষ্যৎ হিসেবে পরিচিত কিলিয়ান এমবাপ্পেও চান না নেইমার থাকুক পিএসজিতে। তাই নেইমারকে এই শীতকালীন দলবদলে কিংবা চলতি মৌসুম শেষে বিক্রি করে দিতে পারে ফ্রেঞ্চ লিগ চ্যাম্পিয়নরা।
তবে নেইমারের দলবদল খুব সহজ হবে কি? পিএসজিতে খেলে প্রতি মৌসুমে ৩৭ মিলিয়ন ডলার আয় করেন তিনি। তার দলবদলের ক্ষেত্রে এটি বড় একটি বাধা। কেননা খুব কম ক্লাবই তাকে এই পরিমাণ অর্থ দিয়ে দলে ভেড়ানোর সামর্থ্য রাখে। লা পেরিসিয়ানরা গত মৌসুমে তার জন্য ১৫০ মিলিয়ন ইউরো ফি চেয়েছিল। গুঞ্জন রয়েছে, এবার দরটা অনেক কমিয়ে দিতে পারে ফরাসি জায়ান্টরা।
বিশ্বকাপ শেষেই মেসির সঙ্গে আগামী মৌসুমের শেষ পর্যন্ত চুক্তির আগ্রহ দেখায় পিএসজি। যদিও কথা উঠেছে, তিনি বার্সেলোনায় ফিরে যেতে পারেন। সেই সঙ্গে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে রক্ষার জন্য সম্ভাব্য সব প্রস্তুতিই নিয়ে রাখবে ফরাসি জায়ান্টরা। উল্লেখ্য, বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটজয়ী এমবাপ্পের জন্য প্রতিবারের মতো এবারো প্রস্তাব দিতে পারে স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ। গতবার রিয়াল প্রস্তাব দিলে পিএসজি তার বেতন-বোনাস আকাশচুম্বী বানিয়ে খেলোয়াড়টিকে ধরে রাখতে সমর্থ হয়।
গত গ্রীষ্মেই পিএসজির সঙ্গে তিন বছরের জন্য নতুন চুক্তিতে সই করেন ২৪ বছর বয়সী এমবাপ্পে। যদিও তাকে ঘিরে গুঞ্জন লেগেই থাকে। বিশেষ করে, কখনো কোচের সঙ্গে বিবাদ, কখনোবা নেইমার ইস্যুতে তিনি ক্লাবের প্রতি বিরাগভাজন হয়ে থাকেন এবং তখন তার চলে যাওয়ার গুঞ্জন তৈরি হয়। সম্প্রতি কাতার বিশ্বকাপে আলো ছড়ানোর পর তার দলবদল নিয়ে ফের গুঞ্জন উঠেছে।
কাতার বিশ্বকাপে ৮ গোল করা এমবাপ্পেকে ধরে রাখতে হলে নেইমারকে বিক্রি করতে হতে পারে পিএসজিকে। গুঞ্জন রয়েছে, এমবাপ্পে নিজেই চান যেন নেইমারকে ছেড়ে দেয় ক্লাবটি। পিএসজি তাকে বিক্রি করতে খুব অনিচ্ছুক নয়, কেননা তাকে বিক্রি করে এখনো বড় অংকের ফি পাওয়া সম্ভব। ২০২৬ সাল পর্যন্ত পিএসজির সঙ্গে চুক্তি রয়েছে নেইমারের এবং এটি আরো এক বছর বাড়িয়ে নেয়ার অপশন রয়েছে।
চলতি মৌসুমে মেসি, নেইমার ও এমবাপ্পের (এমএনএম ত্রয়ী খ্যাত) অনবদ্য পারফরম্যান্সে ভর করে পিএসজি যেন উড়ছে। তারা সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৬২ ম্যাচে সম্মিলিতভাবে ৪৭ গোল করেছেন, অ্যাসিস্ট করেন ৩২ গোলে। ফ্রেঞ্চ লিগ ওয়ানে ১৫ রাউন্ড শেষে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে পিএসজি। দ্বিতীয় স্থানধারী লেনসের চেয়ে চার পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছে ক্রিস্টোফার গালতিয়ারের দল। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শেষ ষোলোয় উঠেছে ফরাসি জায়ান্টরা, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ বায়ার্ন মিউনিখ।
৩০ বছর বয়সী নেইমার বৈচিত্র্যময় এক খেলোয়াড়, যিনি স্ট্রাইকার, উইঙ্গার কিংবা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলতে সক্ষম। সামর্থ্য আর তারকাখ্যাতির জন্যই তিনি পিএসজিতে উচ্চ পারিশ্রমিক পান, যদিও তা মেসি কিংবা এমবাপ্পের মতো নয়। নেইমারের চেয়ে পাঁচ বছরের বড় হলেও মেসি সদ্যসমাপ্ত বিশ্বকাপেই দেখিয়েছেন, শীর্ষ ফুটবলে এখনো দাপটের সঙ্গে খেলে যাওয়ার সামর্থ্য রাখেন তিনি। কাতারে তিনি সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও জিতেছেন। আর এমবাপ্পে যেকোনো কোচেরই চাহিদার শীর্ষে থাকার মতো এক খেলোয়াড়।
এমবাপ্পের সামর্থ্য নিয়ে কোনো সংশয় নেই কারো। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে হ্যাটট্রিক করে তিনি দুনিয়াকে নিজের সামর্থ্যের কথা আরেকবার জানিয়ে দিয়েছেন। তাকে রাখতে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে মরিয়া হবেন পিএসজি প্রেসিডেন্ট নাসের আল খেলাইফি। দেখা যাক, গ্রীষ্মের দলবদলে তিনি কী সিদ্ধান্ত নেন।
গত অক্টোবরে স্প্যানিশ ক্রীড়াবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মার্কার এক খবরে বলা হয়, পিএসজি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করায় ক্লাবটি ছাড়তে পারেন এমবাপ্পে। অথচ গত বছর মে মাসেই বিশ্বের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক দিয়ে তার সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করে পিএসজি। তাহলে এমন কী ঘটেছিল যে তিনি পিএসজি ছাড়তে চান?
গুঞ্জন রয়েছে, বেতন-ভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি এমবাপ্পেকে একটি প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল পিএসজি। সেটি হলো, তার মতো প্রকল্প তৈরি করবে প্যারিস জায়ান্টরা এবং অচিরেই তারা নেইমারকে বিক্রি করে দেবে। পিএসজির নতুন প্রকল্পে এমবাপ্পেই হতে চেয়েছেন কেন্দ্রবিন্দু। তখন ক্লাবটি তাকে আশ্বস্ত করে এই বলে, মেসি ও নেইমারের চুক্তি বাতিল করার মতো ৫০০ মিলিয়ন ইউরো তৈরি রেখেছে তারা। ক্লাবটি নেইমারকে বিক্রি করতে উদ্যোগীও হয়, যদিও ওই সময় ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টারের জন্য ভালো দাম পাওয়া যায়নি। আবার তাকে বেশি দাম দিয়ে কিনলে উয়েফার ফাইন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে নিয়ম ভাঙার ভয়ে অনেকেই এগিয়ে আসেনি।
নেইমারকে বিক্রি করতে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি মিডফিল্ডার চুয়ামেনিকেও কিনতে ব্যর্থ হয় পিএসজি। এতে ক্ষুব্ধ হন এমবাপ্পে। আবার সেন্টার স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেও অসন্তুষ্ট তিনি। জাতীয় দলে তিনি সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলেন না, এই পজিশনে খেলেন করিম বেনজেমা কিংবা অলিভিয়ার জিরু। কিন্তু ক্লাবে তাকে খেলতে হয় সেন্টার স্ট্রাইকার হিসেবে, তার দুই পাশে খেলেন মেসি ও নেইমার। লা কি’প বলছে, ক্লাবের ওপর থেকে এমবাপ্পের বিশ্বাস পুরোপুরি উঠে যায়। এতেই তিনি ক্লাবটি ছাড়তে উদ্যোগী হন। তবে পরে মন খানিকটা স্থির করেন এবং এখন চান যেন নেইমারই চলে যান পিএসজি ছেড়ে।
যদিও এ কথা বলাই বাহুল্য যে এমবাপ্পে ও পিএসজির নাটক কখনো শেষ হওয়ার নয়। অনেকেরই ধারণা, কখনো না কখনো তিনি ঠিকই নাম লেখাবেন রিয়াল মাদ্রিদে, যেটিকে তিনি সবসময়ই স্বপ্নের ক্লাব বলে এসেছেন।
উল্লেখ্য, ইউরোপের ফুটবলে শীতকালীন দলবদল শুরু হয়েছে ১ জানুয়ারি, চলবে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত।
স্পোর্ট, স্কাই স্পোর্টস, মার্কা










