চুক্তি নিয়ে আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না দেখে ৩২ বছর বয়সী মোহাম্মদ সালাহ ধরেই নেন, লিভারপুলে তার সময় শেষ। তাই কিছুদিন আগে লিভারপুল সমর্থকদের কাছ থেকে একরকম বিদায়ও নিয়ে নেন। যদিও তার মতো খেলোয়াড়কে হাতছাড়া করতে চায়নি অল রেডরা। মিসরীয় স্ট্রাইকারকে আরো দুই বছরের জন্য রেখে দিচ্ছে ইংল্যান্ডের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ক্লাবটি। বৃহস্পতিবার ক্লাবের সঙ্গে নতুন চুক্তিপত্রে সই করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন সালাহ।
২০২৪-২৫ মৌসুম শেষেই সালাহর চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যেত। ফলে মৌসুম শেষে তিনি যেকোনো ক্লাবে চাইলে যেতে পারতেন। যদিও একেবারে শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে তাকে ধরে রাখল অল রেডরা। তার মতোই চুক্তির শেষ মৌসুম চলছে ডাচ ডিফেন্ডার ভার্জির ফন ডাইক ও ইংলিশ ডিফেন্ডার ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার-আর্নল্ড। ডাইকের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন হতে পারে, আর আলেক্সান্ডার-আর্নল্ডের রিয়াল মাদ্রিদে নাম লেখানোর গুঞ্জন রয়েছে।
যখন বিদায় নেয়ার আলোচনা তুঙ্গে ছিল তখনো বুটের ধার একটুও কমেনি সালাহর। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত সব ধরনের প্রতিযোগিতায় ৪৫ ম্যাচে ৩২ গোল করেছেন তিনি, এর মধ্যে ২৭ গোলই ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে করা। পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরো ২২ গোল। লিভারপুল চলতি প্রিমিয়ার লিগের শিরোপার ঘ্রাণ পাচ্ছে। অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সই হয়তো তার ব্যাপারে লিভারপুল কোচের মন পাল্টাতে সাহায্য করেছে।
চুক্তি সইয়ের পর প্রতিক্রিয়ায় সালাহ বলেছেন, ‘আমি অবশ্যই শিহরিত। এ মুহূর্তে আমাদের দলটা অসাধারণ। অতীতেও দলটা মহান ছিল। আমি এ কারণেই চুক্তিতে সই করেছি যে আমাদের আরো শিরোপা জেতার ও ফুটবল উপভোগ করার সুযোগ আছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এখানেই আমি সেরা সময়টা কাটিয়েছি, যা ছিল দারুণ। আমি এখানে আট বছর খেলেছি, আশা করি সেটি ১০ বছর হবে। এখানে আমার জীবন ও ফুটবল দুটোই উপভোগ করছি। ক্যারিয়ারের সেরা সময়টা এখানেই কাটিয়েছি।’
সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সমর্থকদের আমি বলতে চাই, এখানে আমি অনেক সুখী। আমরা একসঙ্গে আরো অনেক শিরোপা জিততে পারব—এ বিশ্বাস আছে বলেই চুক্তিতে সই করেছি। আমাদের পাশে থাকুন, সমর্থন করুন; আমরা নিজেদের নিংড়ে দেব এবং আশা করি ভবিষ্যতে আরো অনেক শিরোপা এনে দেব।’
২০১৭ সালে ইতালির এএস রোমা থেকে লিভারপুলে নাম লেখান সালাহ। সেই থেকে তিনি ক্লাবটির কিংবদন্তি হয়ে উঠেছেন। গোলমুখে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সে নাম লিখিয়েছেন রেকর্ডবুকে। তিনি ক্লাবের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। এখন পর্যন্ত ৩৯৪ ম্যাচে করেছেন ২৪৩ গোল। অ্যানফিল্ড অধ্যায়ে সাতটি বড় শিরোপা জিতেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ, উয়েফা সুপার কাপ, এফএ কাপ ও লিগ কাপ। এর বাইরে ব্যক্তিগত অর্জনও তার অনেক। তিনবার ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে জিতেছেন গোল্ডেন বুট। এছাড়া সতীর্থদের ভোটে (পিএফএ) বর্ষসেরা হয়েছেন দুবার, ফুটবল লেখকদের ভোটে বর্ষসেরা হয়েছেন দুবার। আরো দুই বছর চুক্তিবদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে শোকেসটা আরো সমৃদ্ধ করার অঙ্গীকার করেছেন সালাহ।
লিভারপুলে সালাহর খেলা ৩৯৪ ম্যাচের মধ্যে ২৮১টি প্রিমিয়ার লিগে। এছাড়া চ্যাম্পিয়নস লিগে ৭৫ ম্যাচ, এফএ কাপে ১২ ম্যাচ, লিগ কাপে ১১ ম্যাচ, ইউরোপা লিগে নয় ম্যাচ, কমিউনিটি শিল্ডে তিন ম্যাচ, ফিফা বিশ্বকাপে দুই ম্যাচ ও উয়েফা সুপার কাপে দুই ম্যাচ খেলেছেন লিভারপুলের জার্সিতে। ক্লাবের ইতিহাসে ২৮তম খেলোয়াড় হিসেবে ৪০০ ম্যাচ খেলতে যাচ্ছেন মিসরীয় ফুটবল জাদুকর।
লিভারপুলের ১৩৩ বছরের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলের মালিক হিসেবে গর্ব করতেই পারেন সালাহ। তার নামের পাশে এখন পর্যন্ত ২৪৩ গোল। তার সামনে শুধুই ইয়ান রাশ ও রজার হান্ট। প্রিমিয়ার লিগ (১৮২) ও চ্যাম্পিয়নস লিগে (৪৫) লিভারপুলের রেকর্ড গোলদাতা সালাহ। এছাড়া এফএ কাপে ছয়টি, ইউরোপা লিগে পাঁচটি, লিগ কাপ ও কমিউনিটি শিল্ডে চারটি গোল করেছেন তিনি। প্রিমিয়ার লিগে আট মৌসুমের মধ্যে পাঁচবারই ন্যূনতম ৩০ গোল করেছেন সালাহ।
ক্লাবের হয়ে মোট ১০৯টি অ্যাসিস্ট রয়েছে সালাহর, যার এক-পঞ্চমাংশই চলতি মৌসুমে করা। মাত্র একটি মৌসুম ছাড়া বাকি প্রতি মৌসুমেই অন্তত ডাবল ফিগারে অ্যাসিস্ট করেছেন সালাহ। সাদিও মানেকে ১৭টি, রবার্তো ফিরমিনোকে ১৪টি, কডি গাকপোকে ১০টি অ্যাসিস্ট করেছেন।
আগের চুক্তিতে সপ্তাহে ৩ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড পারিশ্রমিক পেতেন সালাহ। নতুন চুক্তিতে তার পারিশ্রমিক কমানোর বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানা গেছে।
২০২৩ সালে ১৫ কোটি পাউন্ড ফি দিয়ে তাকে দলভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিল সৌদি আরবের ক্লাব আল-ইত্তিহাদ। যদিও সেই প্রস্তাবে লিভারপুল রাজি হয়নি। সৌদি আরবের ক্রীড়ামন্ত্রী প্রিন্স আব্দুলআজিজ বিন তুর্কি আল-ফয়সাল বলছিলেন, ফরওয়ার্ডটি তাদের জন্য হতে পারেন ‘বড় এক উপহার’ এবং সালাহকে পেলে তারা খুবই খুশি হবেন। যদিও গত জানুয়ারিতে লিভারপুল কোচ আর্নে স্লট জানান, তিনি চান সালাহ লিভারপুলেই থাকুক এবং তিনি মনে করেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো বিচক্ষণতা সালাহর আছে।
‘মিসরীয় রাজা’ নামে ডাকা হয় সালাহকে। তিনি লিভারপুলে আরো দুই মৌসুম থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। চুক্তি সইয়ের পর তার প্রতি ভালোবাসা দেখিয়ে অ্যানফিল্ডে একটি সিংহাসন রাখা হয়, যাতে বসে আছেন ‘রাজা’ সালাহ।
—বিবিসি ও এফসি লিভারপুল










