কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে গত ৩০ অক্টোবর নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে মোহনীয় এক শটে গ্যালারির প্রায় ১৫ হাজার দর্শককে স্তব্ধ করে দেন ২০ বছর বয়সী ঋতুপর্ণা চাকমা। তার বাম পায়ের সেই জাদুকরী গোলটাই বাংলাদেশকে দ্বিতীয়বারের মতো এনে দেয় সাফ শ্রেষ্ঠত্ব। এছাড়া টুর্নামেন্টজুড়ে ঝলমলে পারফরম্যান্সে তিনি পান সেরা খেলোয়াড়ের ‘গোল্ডেন বল’ পুরস্কার। গোটা দেশের ক্রীড়াঙ্গনেরই প্রিয় মুখ তিনি। বলা যায়, যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে। রাঙ্গামাটির পাহাড়ি জনপদ থেকে উঠে আসা ঋতুপর্ণা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন দর্শন নিয়ে। পাশাপাশি সাফজয়ী দলের কৃতী ডিফেন্ডার নিলুফা ইয়াসমিন নীলাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন ইতিহাস নিয়ে। এ দুই সাফ চ্যাম্পিয়ন ফুটবলারকে নিয়ে গর্বিত ঢাবি পরিবার। তেমনি তারা দুজনও ঢাবিতে পড়তে পেরে গর্বিত। নিজেদের ক্যারিয়ার, স্বপ্ন আর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে খেলাধুলা নিয়ে তারা দুজন কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রকিবুল ইসলাম
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ঠিকমতো করতে পারি না: ঋতুপর্ণা চাকমা
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয় ও দক্ষিণ এশিয়ার সেরা খেলোয়াড় হিসেবে আপনাকে অভিনন্দন ধন্যবাদ আপনাকে।
ফুটবলের ব্যস্ততার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ছেন। কতটা চ্যালেঞ্জিং?
চ্যালেঞ্জিং অবশ্যই। বেশির ভাগ সময়ই আমি খেলা নিয়ে থাকি। পড়া বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসও ঠিকমতো আমি করতে পারি না। টোটালি করি না। সেক্ষেত্রে এটা আমার জন্য বড় চ্যালেঞ্জিং। আর এই যে চ্যাম্পিয়ন হলাম...। এখন তো নানা ইস্যু নিয়ে অনেক ব্যস্ততা।
খেলোয়াড় হিসেবে এখন খ্যাতির চূড়ায়। আবার পড়ছেন দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুটি বিষয় নিয়ে কি আপনি গর্বিত?
হ্যাঁ, অবশ্যই। খেলাটা আমার গৌরবের জায়গা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াটাও গৌরবের ব্যাপার। আমি সত্যিই দুটি কারণে গর্বিত। কারণ, এটা বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান বিশ্ববিদ্যালয়। এখানের স্টুডেন্ট হিসেবে পড়ার সুযোগ পেয়েছি, যা সত্যিই আনন্দের, গৌরবের।
একই সঙ্গে খেলাধুলা ও পড়াশোনা—দুটি বিষয় আপনি কীভাবে সামলান?
সামলানো অনেক কঠিন, আগেই বলেছি। আমার জন্য অনেক চ্যালেঞ্জিং এটা। আসলে এই যে সাফে খেলতে গেলাম এজন্য আমি সেকেন্ড সেমিস্টারে পরীক্ষাই দিতে পারি নাই। দুটো একসঙ্গে করা আসলেই অনেক কঠিন আমার জন্য।
শিক্ষকরা কি হেল্প করেন আপনাকে?
হ্যাঁ, অবশ্যই। তাদের হেল্প ছাড়া সম্ভব না।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?
অবশ্যই প্রয়োজন। এখানে যদি প্রতি বছর ফুটবল ও অন্যান্য টুর্নামেন্ট চালু করা হয় তাহলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বিনোদন পাবে এবং তাদের শরীর ও মনন বিকাশে এটা সহায়ক হবে।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে খেলাধুলার সুযোগ-সুবিধা নিয়ে মূল্যায়ন করুন। যে সুবিধা আছে, তা যথেষ্ট কিনা?
আমি আসলে এ বিষয়ে তেমন কিছু জানিই না (হেসে)।
যেসব তরুণ-তরুণী খেলাধুলায় ভালো করতে চায় কিংবা জাতীয় দলে সুযোগ পেতে চায় তাদের প্রতি আপনার বার্তা কী?
আমার একটাই বার্তা—নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে ও কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আমি মনে করি পরিবারেরও একটা সাপোর্ট দরকার।
বাংলাদেশকে কোথায় দেখতে চান কিংবা নিজের বড় স্বপ্ন কী?
আসলে আমার ক্যারিয়ার মাত্রই শুরু। আমি আরো দীর্ঘদিন বাংলাদেশের হয়ে খেলতে চাই। বাংলাদেশকে শুধু সাফেই নয়, এশিয়ায় ও এর বাইরেও ভালো একটা অবস্থানে নিয়ে যেতে চাই।
মেসিডোনিয়ার ক্লাবে খেলার প্রস্তাব পেয়েছেন...
মেসিডোনিয়া থেকে আমাকে ও সাবিনা (জাতীয় দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন) আপুকে অফার করছে, আমরা তাতে রাজিও হয়েছি। এখন ওনারা (মেসিডোনিয়ান ক্লাব কর্তৃপক্ষ) ভিসার জন্য কাজ করছেন, ডিসেম্বরে ওনারা আমাদের জানাবেন।
ফুটবলে আপনার আইডল কে?
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।
ব্যাচমেটরা আমাকে আলাদাভাবে দেখে: নিলুফা ইয়াসমিন নীলা
ফুটবলে জাতীয় দলে খেলার পাশাপাশি পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আপনার অনুভূতি কী?
বেশ ভালো লাগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা একটা সম্মান আছে। আমার ব্যাচমেটরা আমাকে আলাদাভাবে দেখে। অন্যদের থেকে আলাদাভাবে দেখে। টিচাররাও অনেক স্নেহ করেন। নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারি না। তারা মাঝেমধ্যে একটু শাসন করেন, তবে অনেক হেল্পফুল। ব্যাচমেটরাও অনেক হেল্পফুল। তাদের সহযোগিতা থাকে বলেই পড়াশোনায় তেমন অসুবিধা হয় না। বড় ভাই, আপুরা অনেক আদর করেন।
একই সঙ্গে খেলাধুলা ও পড়াশোনা কীভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন?

আমার ব্যাচমেটরা অনেক হেল্পফুল। ওদের বললেই আমাকে নোটস দেয়। সাহায্য করে। টিচাররাও অনেক সাহায্য করেন, ফোন দিলে বুঝিয়ে দেন। তারা বলেন, যদি কিছু বুঝতে না পারো তবে চেম্বারে এসে দেখা করবা বুঝিয়ে দেব।
বিশ্ববিদ্যালয়ে কি খেলেন? খেলাধুলা শিক্ষার্থীদের কতটা সাহায্য করে?
বিশ্ববিদ্যালয়ে তো আন্তঃবিভাগ ও নানা রকমের খেলা হয়ই। আন্তঃহল যে খেলা হয় সেখানে দেখি মেয়েরা অনেক অংশগ্রহণ করে। মহিলা হলগুলো অংশগ্রহণ করে, আমি নিজেও গতবার অংশ নিয়েছি। অনেক মেয়েই অংশ নেয়। আবার যখন আন্তঃবিভাগ খেলা হয় তখন মেয়েরা অংশ নেয় না, কারণ একটা বিভাগে মেয়েদের একটা টিম করা সম্ভব হয় না। ছেলে ও মেয়ে উভয়েরই যদি আন্তঃবিভাগ খেলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলা চলমান থাকে তাহলে শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো হয়। কারণ খেলাটা মানসিক আর শারীরিক একটা ব্যায়ামের ব্যাপারও। খেলাধুলা করলে পড়াশোনায়ও মনোযোগ বসে।
ফুটবলে বাংলাদেশকে নিয়ে কী স্বপ্ন দেখেন?
আমরা তো এখন সাউথ এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন। পরপর দুইবার। এখন যদি আমরা এশিয়ান লেভেলে ফাইট করার চেষ্টা করি তাহলে অটোমেটিক সাউথ এশিয়ায়ও চ্যাম্পিয়ন থাকব এবং সেই সঙ্গে এশিয়ায় ভালো করব। এশিয়ান লেভেলে ভালো খেলতে আমাদের এখনই প্রস্তুতি নেয়া লাগবে। সামনে যে উইমেন্স কোয়ালিফায়ার আছে ওগুলোয় অংশগ্রহণ করা আমাদের উচিত। সাউথ এশিয়া থেকে কোনো দলই এখন পর্যন্ত ওয়ার্ল্ডকাপ কোয়ালিফাই খেলতে পারে নাই। সেক্ষেত্রে আমাদের টার্গেট থাকবে ওয়ার্ল্ড কাপ কোয়ালিফাই খেলা। ওয়ার্ল্ড কাপ খেলা তো পরের ব্যাপার, আগে এশিয়ান লেভেলে চ্যাম্পিয়ন হতে হবে। ভালো পজিশনে যেতে হবে। তারপর ওয়ার্ল্ড কাপ কোয়ালিফাই, আর যদি কপালে থাকে (হাসি) সর্বোচ্চ আসরে খেলার ইচ্ছা থাকে সবার।
ফুটবলে আপনার আইডল কে?
আমি তো ডিফেন্স খেলি, দেশে মাসুরা পারভিন আমার প্রিয় খেলোয়াড়। ডিফেন্সে উনি খুবই ভালো। ওর অ্যাটিটিউডও খুব ভালো। মাঠে ও মাঠের বাইরে খেলা নিয়ে খুব সিরিয়াস। বেশ অ্যাকটিভ পারফরমার।
বিশ্ব পর্যায়ে বললে, মার্সেলোর (ব্রাজিলীয় ডিফেন্ডার) খেলা আমার ভালো লাগে। ওনাকে আইডল হিসেবে মানি। রোনালদোকেও ভালো লাগে।ব্যাচমেটরা আমাকে আলাদাভাবে দেখে: নিলুফা ইয়াসমিন নীলা










