আইভরিয়ান ফুটবল স্টার ইয়া তোরে ২০০১ সালে যখন ইউরোপে পাড়ি জমান তখন সেটি সম্ভব হয়েছিল তার যুব ক্লাব এএসইসি মিমোসাস ও বেলজিয়ান ক্লাব বেভেরিনের মধ্যকার পূর্ব সম্পর্কের কারণে। এরপর তিনি অলিম্পিয়াকোস, মোনাকো, বার্সেলোনা ও ম্যানসিটির মতো ইউরোপের বড় বড় ক্লাবে খেলেছেন। ২০১০ সালে বার্সা থেকে ২৪ মিলিয়ন পাউন্ড ফি দিয়ে তাকে সই করায় সিটি। সেই তোরে দিদিয়ের দ্রগবার পর আইভরি কোস্টের সবচেয়ে বড় তারকা হয়ে ওঠেন। 

এছাড়া আইভরি কোস্ট থেকে বেশকিছু খেলোয়াড় বেভেরিনে গেছেন, তাদের অন্যতম ইয়া তোরে। তার ভাই কোলো তোরেকে সরাসরি মিমোসাস থেকে সই করায় ইংলিশ ক্লাব আর্সেনাল। 

আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে খেলোয়াড়দের ওপর নজর রাখার জন্য স্কাউট গ্রুপ নিয়োগ করে থাকে ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলো। তেমনি স্কাউট থাকে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাসহ লাতিন দেশগুলোতেও। এজন্য ক্লাবগুলোকে যথেষ্ট অর্থও ব্যয় করতে হয়। তবে ঠিকমতো স্কাউটিং না হলেই অর্থ ব্যয়টা ক্লাবের কাছে ‘‌অপচয়’ হিসেবে গণ্য হতে পারে। এজন্য স্কাউটিংয়ের কাজটি সহজ করার দিকে মনোযোগ দেয় ক্লাবগুলো। সরাসরি স্কাউটিং ছাড়াও বেশকিছু বিকল্প উপায় এখন চালু রয়েছে। 

আগে একজন খেলোয়াড়ের ওপর নজর রাখতে সরাসরি সেখানে প্রতিনিধি (স্কাউট) রাখতে হতো ইউরোপের ক্লাবকে। এখন কিন্তু মিমোসাসের কোনো খেলোয়াড়ের ওপর নজর রাখতে আবিদজান যাওয়া কিংবা রিটার্ন টিকিট নিয়ে ভাবতে হয় না। আগের সেই কষ্ট ও অধ্যবসায় অনেকটাই কমিয়ে এনেছে প্রযুক্তি।

অসংখ্য যুব খেলোয়াড়ের ম্যাচ এখন আর সরজমিন পরিদর্শন কিংবা মাঠে উপস্থিত থাকা লাগে না। তাই আপনাকে হাজার হাজার মাইল ভ্রমণ করারও প্রয়োজন পড়ছে না। এখন ল্যাপটপেই কিন্তু প্রতিটি খেলোয়াড়ের ব্যাপারে খুঁটিনাটি সব তথ্য জেনে নিতে পারছেন আপনি।

এ কাজটি সম্ভব করেছে যে পদ্ধতি তার নাম আইবল। এটি খেলোয়াড় স্কাউটিংয়ে এখন বিশ্বস্ত নাম। যুব ফুটবলে বিশ্বের প্রথম অনলাইন ভিডিও স্কাউটিং ফ্লাটফর্ম। ১২টিরও বেশি দেশের অন্তত ২০০ ক্লাবের পাঁচ হাজারেরও বেশি ম্যাচ ও ২৫ হাজার খেলোয়াড়ের সামগ্রিক তথ্য জড়ো করেছে এ প্লাটফর্মটি।   

এরই মধ্যে আইবল ব্যবহার করে অন্তত ১৫০ জন খেলোয়াড়কে দলভুক্ত করেছে ইতালির এসি মিলান, ফ্রান্সের লিল ও পর্তুগালের বেনফিকা। আইবলের পরিচালক ডেভিড হিকস জানালেন, আগে এএসইসি মিমোসাস ক্লাব প্রতিনিধিরা মাসে অন্তত একবার ইউরোপ সফরে যেতেন, কিন্তু খেলোয়াড়দের ব্যাপারে এখন তারা দেশে থেকেই মাসে অন্তত ৩০-৪০টি ফোনকল পেয়ে থাকেন। ভ্রমণ না করেই ক্লাব প্রতিনিধিরা বলে থাকেন, ‘‌আমরা এ খেলোয়াড়টির ওপর বেশ কয়েক মাস থেকেই চোখ রাখছি। আমরা তাকে পছন্দ করেছি। আপনারা চাইলে আরো তথ্য জানাতে পারেন।’ এরপর হয়তো ক্লাব প্রতিনিধিরা মিমোসাস সফরে যান কিংবা ট্রায়ালের জন্য খেলোয়াড়টিকে ইউরোপে আমন্ত্রণ জানান। 

আইবল কাজ করে উচ্চ রেজল্যুশনের ক্যামেরা ব্যবহার করে। এটি মাঠের পিচ থেকে এতটা উঁচুতে রাখা হয় যা ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত কাভার করতে পারে এবং এমন একটি কোণ তৈরিতে সক্ষম যা দিয়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) সফটওয়্যার কাজ করতে পারে। এ সফটওয়্যার প্রতিটি খেলোয়াড়কে অনুসরণ করে, প্রতিটি আক্রমণে তার সম্পৃক্ততার তথ্য ও খুঁটিনাটি তথ্য সন্নিবেশ করে একটি প্রোফাইল তৈরি করে থাকে। একই সঙ্গে ‘‌অপটা’র মতো পরিসংখ্যান তৈরি করে থাকে। 

এরপর কোনো নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের বয়স, উচ্চতা, গতি, সাম্প্রতিক ম্যাচ কিংবা অন্যান্য তথ্য আইবল থেকে খুঁজে নিতে পারেন স্কাউট কিংবা এজেন্ট। এছাড়া এ খেলোয়াড়টির ব্যাপারে কার সঙ্গে কথা বলতে হবে, সেই ব্যাপারটিও জেনে নেয়া যায় সহজে। ফলে স্কাউটরা তার ব্যাপারে দ্রুতই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে।

পশ্চিম আফ্রিকার শীর্ষ ২৫টি ফুটবল একাডেমি ও তাদের সংশ্লিষ্ট ক্লাবগুলো আইবল সিস্টেমের অংশ। কাজেই এসব খেলোয়াড়ের সব ম্যাচের ওপরই লিভারপুল কিংবা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও অন্য ইউরোপীয় শীর্ষ ক্লাবের চোখ থাকে। এসব ম্যাচ দেখার পরই স্কাউটরা কোনো খেলোয়াড়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। কাজেই আগে যেখানে কাঙ্ক্ষিত খেলোয়াড় না পেলে বহু ভ্রমণ আর অর্থ অপচয় হতো, এখন সেটি হওয়ার সম্ভাবনা কম। 

তার মানে, কোনো খেলোয়াড়কে সই করানোর জন্য আগের মতো এখন আর ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকার খুব বেশি প্রয়োজন নেই, যেমনটি ঘটেছিল বেভেরিনের ক্ষেত্রে। কিংবা প্রিমিয়ার লিগের মতো কোনো ক্লাবের এ কাজে খুব বেশি বাজেট রাখারও প্রয়োজন হয় না। হিকস তাই এটিকে বলেছেন ‘বৈপ্লবিক’। 

ফ্রান্সসহ বেশকিছু ক্লাবে আইবল সিস্টেম জায়গা করে নিয়েছে। এসব দেশের যুব ফুটবলে আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে লিগগুলোতে নজর রাখে আইবল। তাতে অন্য ক্লাবগুলো সহজেই সেসব যুব খেলোয়াড়কে বেছে নিতে পারে, যারা একাডেমি সিস্টেমের অংশ হতে পারেনি।

হিকস বলেছেন, ‘‌ভবিষ্যতে বিভিন্ন লিগের খেলোয়াড়দের মধ্যে তুলনা করা অপেক্ষাকৃত সহজ হবে। কাজেই কোনো দেশের একটি ক্লাব সহজেই দেখে নিতে পারে তার কোন জায়গায় উন্নতি  করা প্রয়োজন এবং বিশ্বের অন্য কোনো দেশের কোনো ক্লাব থেকে কাঙ্ক্ষিত খেলোয়াড়টিকেও তখন সই করিয়ে নিতে পারে।’ ফোর্বস।