বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের মেয়েরা হেড কোচ পিটার বাটলারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন। ইংলিশ কোচের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ অভিযোগ তুলে মেয়েরা দাবি তুলেছেন বাটলার কোচ থাকলে তারা আর খেলবেন না। এরই মধ্যে জানা গেল, গত বছরের শেষ দিকে নেপালের মাঠে সাফ জয়ের পর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের ঘোষণা করা দেড় কোটি টাকার অর্থ পুরস্কার এখনো হাতে পাননি খেলোয়াড়রা!

গত বছর ৩০ অক্টোবর কাঠমান্ডু ফাইনালে স্বাগতিক নেপালকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা জয় করে বাংলাদেশের মেয়েরা। ওই জয়ের পর অভিনন্দনের জোয়ারে ভেসেছেন সাবিনা খাতুন, ঋতুপর্ণা চাকমারা। সঙ্গে ছিল একের পর এক অর্থ পুরস্কারের ঘোষণা। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে), বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি), বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ), সেনাবাহিনী, প্রাইম ব্যাংকসহ বেশকিছু সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান মেয়েদের অর্থ পুরস্কারের ঘোষণা দেয়। এর বেশির ভাগ অর্থ পুরস্কার সাফজয়ী মেয়েরা হাতে পেলেও বাফুফে ঘোষিত দেড় কোটি টাকা এখনো তাদের দেয়া হয়নি।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাফজয়ী দলের একাধিক সদস্য। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাফজয়ী নারী দলের অন্যতম সদস্য কৃতী ডিফেন্ডার নিলুফা ইয়াসমিন নীলা বলেছেন, ‘না বাফুফে ওইটা এখনো দেয়নি। কবে দেবে জানি না। ঘোষণার সব অর্থই পেয়েছি বাফুফেরটা ছাড়া।’

পাশাপাশি বাফুফের সঙ্গে চুক্তি ও বেতন-ভাতা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নীলা বলেন, ‘গত নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারির জন্য আমাদের সঙ্গে বাফুফে চুক্তি নবায়ন করেননি, যার কারণে এ তিন মাস বেতন পাচ্ছি না আমরা। চুক্তি না থাকলে বেতন দেয় না এটাই চুক্তির শর্ত। তাছাড়া আগের সব বেতনের টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।’

বাফুফের চরম অবহেলা আর অপেশাদারির আরেকটি দৃষ্টান্তের কথাও জানা গেল। নীলা বলেন, ‘বেতন পরিশোধ হলেও ২০২৪ সালে খেলা ৮টা ম্যাচের ম্যাচ ফি পাইনি কেউই।’

কুষ্টিয়া থেকে উঠে আসা এ ফুটবলার বর্তমান পরিস্থিতির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘সবাই আছে আমাদের ট্রল করা নিয়ে ব্যস্ত। বাস্তবিক চিন্তা কেউ করে না আমাদের নিয়ে। আগেও করেননি, ভবিষ্যতেও করবে না।’

চুক্তি না থাকায় বেতনও পাননি। অথচ কারো সংসারের ব্যয় নির্বাহের খরচ, কারো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার খরচ আছে। এসব নিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হয় বলে জানান নীলা। তিনি বলেন, ‘সবার হাতের অবস্থা ভালো না। কেমনে চলি আমরা ছাড়া কেউ জানেও না, বুঝবেও না। কোচের ব্যপারটাও সেমই। আমরা ওঠাবসা করেছি এতদিন আমরাই জানি কে কেমন। আপনারা শুধু চেহারা আর সিভি দেখেন।’

এ বিষয় নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল সর্বশেষ সাফের সেরা খেলোয়াড় ঋতুপর্ণা চাকমার কাছে, ফাইনালে যার বাম পায়ের জাদুকরী এক গোলে সাফ মুকুট ধরা দেয় বাংলাদেশের কাছে। রাঙ্গামাটি থেকে উঠে আসা এ ফুটবল তারকা বোনাসের টাকা না পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেছেন, ‘হ্যাঁ, আমরা বাফুফের পুরস্কারের অর্থ এখনো পাইনি। আর আমাদের ৮ ম্যাচের ম্যাচ ফি-ও পাইনি।’

বাফুফের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে ঋতুপর্ণা বলেন, ‘আমাদের তো তিন মাস চুক্তি নেই। কাজেই চলতে তো সমস্যা হয়ই। সবারই তো হাতখরচ আছে, সংসার খরচ আছে।’ তিনি আশা করেন, কোচ পিটার বাটলারের ইস্যুতে তারা যে আন্দোলনের মধ্যে আছেন তা নিয়ে যখন সমাধান হবে, তারপর দ্রুতই যেন চুক্তিও হয়ে যায়।

ক্রিকেট বোর্ডের মতো বাফুফেও যদি ফুটবলারদের সারা বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ রাখে তাহলে সুবিধা হয় কিনা, এ নিয়ে ঋতুপর্ণা বলেন, ‘এটা ফেডারেশনই ভালো জানে। এখন যে অবস্থা কী হয় কে জানে। তবে আমরা এটুকু বুঝি, আমাদের নিয়মিত আয় প্রয়োজন। টাকা ছাড়া কি চলা যায়?’

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ১ কোটি টাকা দিয়েছে সাবিনাদের। সাফ চ্যাম্পিয়ন দলকে ছাদখোলা বাসে সংবর্ধনা দেয়ার দিনই কোটি টাকা বোনাসের ঘোষণা দিয়েছিলেন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ঘোষণার ১১ দিনের মাথায় নিজেদের টাকা বুঝে পান সাবিনা, মনিকারা। খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও অফিশিয়ালসহ মোট ৩২ জনের মধ্যে এই ১ কোটি টাকা সমবণ্টন হয়েছে। এতে সবাই ৩ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা করে পেয়েছেন। চেক হস্তান্তরের বিষয়টি আসিফ মাহমুদ নিজের অফিশিয়াল পেজে এক পোস্টে নিশ্চিত করেছেন। সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর সাবিনারা ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অর্থ সবার আগে পান। অথচ তিন মাস পেরিয়ে গেলেও বাফুফে ঘোষিত ১ কোটি টাকা পরিশোধ করেনি সাফ চ্যাম্পিয়নদের।

গত ৯ নভেম্বর বাফুফে ভবনে নতুন কমিটির প্রথম সভা শেষে নির্বাহী কমিটির সদস্য ও মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম বাবু বলছিলেন, ‘সাফ চ্যাম্পিয়ন নারী দলকে বাফুফের পক্ষ থেকে দেড় কোটি টাকা অর্থ পুরস্কার দেয়া হবে। আমরা শিগগিরই এক অনুষ্ঠানে তা ওদের হাতে তুলে দেব। যারা দলের সঙ্গে ছিলেন, প্রত্যেক সদস্য অর্থ পুরস্কার পাবেন।’

এ ব্যাপারে জানতে আমিরুল ইসলাম বাবুকে একাধিকবার সেলফোনে কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।